যে কবি জনতার

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি মাখিয়ে বিকৃত করার চেষ্টার প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। গতকাল বিকেল ৫টায় শিল্পকলা একাডেমির পাদদেশে ‘যে কবি জনতার’ শিরোনামে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সহসভাপতি শিবানী ভট্টাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম। বক্তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি বিকৃত করার চেষ্টার নিন্দা জানান এবং এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি করেন। তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথকে অসম্মানকারী ব্যক্তিরা বাংলাদেশ চান না। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি বিকৃতি তাকে বাঙালির জীবন থেকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। 

উদীচীর এ অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। সমাবেশে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন উদীচীর শিল্পীরা। এ সময় ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘আমরা সবাই রাজা’, ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে’, ‘তোমার খোলা হাওয়া’ ও ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ গানগুলো পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যনাট্য ‘বিসর্জন’-এর অংশবিশেষ মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির নির্দেশনা দেন নাজমুল হক বাবু। এতে অভিনয় করেন ম ফারুক ও নাজমুল হক বাবু। অনুষ্ঠানে কাকলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ‘দুঃসময়’ আবৃত্তি করেন।

প্রতিবাদী সমাবেশে শিবানী ভট্টাচার্য বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাঙালির জীবন থেকে মুছে ফেলার চক্রান্ত কেন বারবার ফিরে আসে? আমরা কোন বর্বর দেশে বাস করছি? যারা এই বর্বরতা করেছে, তাদের উপযুক্ত শাস্তি চাই।’ প্রশাসনের কাছে ঘটনার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, আপনারা বিচার করবেন না। তবু আমরা রাস্তায় নেমে লড়াই করব, প্রতিবাদ করব। এই প্রতিবাদ কেউ আটকে রাখতে পারবে না।’

রবীন্দ্রনাথের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদ জানিয়ে সঙ্গীতা ইমাম বলেন, ‘রবীন্দ্রচর্চায় বাধা সৃষ্টি করা বাংলাদেশের চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিপন্থী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীর কবি নন, তিনি বিশ্বকবি। তার সাহিত্য পড়ার জন্য চীন ও জাপানের অনেক মানুষ বাংলা ভাষা শিখেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত যার লেখা, তার প্রতি সম্মান না দেখালে এই দেশকে ভালোবাসব কী করে? দেশমাতৃকাকে রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। রবীন্দ্রনাথের চেতনা ধারণ করে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

গত ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর সংলগ্ন দেয়ালে দেশের সংস্কৃতি ও শিল্পকলায় অবদান রাখা ১০ জন বরেণ্য ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। তারা  হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন শাহ, ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শিল্পী এস এম সুলতান, চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম ও অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী। গত ১০ অক্টোবর দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি মাখিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করেন কয়েকজন ব্যক্তি। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্য সচিব আ ন ম আয়াস। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আয়াসসহ চারজনকে আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় আটক চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যে তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।