বিদেশি বিনিয়োগে খরা বাড়ছে ঋণের বোঝা

দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) ভাটা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বাড়ছে বিদেশি ঋণের বোঝা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের তিন মাসের তুলনায় নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। একই সময়ে নতুন মূলধনী বিনিয়োগ কমেছে ১ দশমিক ০৭ শতাংশ।

আর আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে বিনিয়োগ কমেছে ৬৭ শতাংশ। বিপরীতে, গত জুনের শেষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় ঋণ বেড়েছে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকট, ব্যবসার অনুকূল পরিবেশের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমছে। বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিসহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে। এর পেছনে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিঘœ এবং জ্বালানি সংকটের প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরকারের নীতিমালা ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নেওয়া উদ্যোগগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় নিয়েছেন।

তিনি বলেন, যেকোনো দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে এসব জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিঘœ ঘটলে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থাও চাপে পড়ে। এসব কারণে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগের গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে।

আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, নতুন সরকারের নীতিমালা সম্পর্কে ধারণা নিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সময় নিয়েছেন। তবে সরকার ইতিমধ্যে ছয় মাস পার করেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বেশ কিছু নতুন নীতিমালা ও উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের সুফল আগামী দিনগুলোতে পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানো এবং বিদেশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। নতুন বিনিয়োগ না এলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প সম্প্রসারণ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিবর্তে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।