 ডিজিটাল ব্যাংক

সবার আগে জরুরি সাইবার নিরাপত্তা

শুরুতেই ডিজিটাল ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বারবার আলোচনায় আসে। এখনো যে সেই ঝুঁকি রয়েছে এর সাক্ষ্য মিলেছে ২৯ অক্টোবর দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। ‘ডিজিটাল ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ সাইবার নিরাপত্তা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে সাইবার নিরাপত্তা। গ্রাহকের তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়ে হিসাব খোলা ও অননুমোদিত লেনদেনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে না পারলে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি কঠিন হবে। মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষজনদের এ নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় আশঙ্কা-আশাবাদ দুইয়েরই চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তারা নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণসহ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াগত কিছু সুপারিশও করেছেন। আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবার সঙ্গে আরও আলোচনাক্রমে সরকারের এ ব্যাপারে দূরদর্শী পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।

আমরা জানি, প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও বিকাশের এই যুগে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যান্য খাতের মতো আর্থিক খাতেও এর উন্নত পদ্ধতি-প্রক্রিয়া অনুসরণ-বাস্তবায়ন সময়ের দাবির বাইরে নয়। কিন্তু আর্থিক খাত অন্য আর ১০টি খাতের মতো নয়। এক্ষেত্রে প্রতারণা ও ঝুঁকির মাত্রা বেশি। আমরা জানি, ২০২৩ সালে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও নীতিমালা সংশোধনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে প্রক্রিয়া। ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক সম্মতিপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু এই ব্যাংকগুলো নির্ধারিত শর্ত পূরণ ও চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার পর ডিজিটাল ব্যাংক সেবা চালু করতে পারবে। আমরা মনে করি, এই প্রেক্ষাপটে এক্ষেত্রে আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কাজ করার অবকাশ রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশে^র বিভিন্ন দেশেই রয়েছে, কিন্তু আমাদের পরিস্থিতি অনেকটা ভিন্ন তাও অসত্য নয়। প্রযুক্তি জ্ঞানের পাশাপাশি এর পদ্ধতি-প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো এড়ানোর অবকাশ নেই। একই সঙ্গে অসচেতনতা-অসাবধানতার প্রসঙ্গও সমান্তরালেই বিদ্যমান।

এই ব্যবস্থায় প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে ও কম খরচে ব্যাংকিং সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে তা অনস্বীকার্য। কিন্তু শুধু অ্যাপ তৈরি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুললেই এ উদ্যোগ সফল হবে না, এই বক্তব্য অমূলক নয়। যদি গ্রাহকের অর্থ ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং প্রতারণার ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে প্রতারক ও প্রযুক্তি-দুর্বৃত্তদের জাল ছড়ানোর সুযোগ থেকে যাবে। ঝুঁকির সব পথ রুদ্ধ করেই পূর্ণ কার্যক্রম শুরু করা বাঞ্ছনীয়। মূলধন সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে দক্ষ জনবল, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই এবং ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমভাবেই জরুরি। নিরাপদ প্রযুক্তি-অবকাঠামো তৈরিও সম-গুরুত্বের বিষয়। সার্বক্ষণিক তদারকির ব্যবস্থাও করতে হবে জোরদার। দেশে আর্থিক খাতে প্রতারকরা ইতিমধ্যে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। এ কারণে গ্রাহকদের নানাভাবে সতর্ক-সচেতন করার কার্যক্রম দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার অংশ করে নিয়েছে অনেক ব্যাংক। আমরা তাদের এই উদ্যোগের জন্য সাধুবাদ জানাই। কিন্তু যে সমাজে অপরাধী চক্রের শাখা-প্রশাখা এত বিস্তৃত সেই সমাজে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ ও এর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

ব্যবস্থার কোনো দুর্বলতার সুযোগে প্রতারক কিংবা অপরাধীরা যাতে ব্যাংকের নেটওয়ার্কে থাবা বসাতে না পারে নজর গভীর করতে হবে সেদিকে। ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রম যেসব ব্যাংক পরিচালনা করবে তাদের সাইবার হুমকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখতেই হবে। সরকারের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রত্যেকটি বিভাগকেও নিতে হবে আরও জোরদার ব্যবস্থা। আমরা জানি, বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার চেষ্টা এবং এ কারণে বাংলাদেশে সতর্কতা জারির বিষয়টি দূর অতীতের নয়। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার যে বড় সুযোগ রয়েছে তা যেন যেকোনো সক্ষমতার ঘাটতিতে হুমকির মুখে না থাকে তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির মাধ্যমে কম খরচে দেশের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যাতে মানুষের সেবাপ্রাপ্তির পথ সুগম হয় এটা এখন সময়ের দাবি।