স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অদৃশ্য ঝুঁকি

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮ এএম

ওষুধ না থাকাকে ছোটখাটো প্রশাসনিক সমস্যা মনে হতে পারে। বাস্তবে এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর নিরাপত্তা ঝুঁকি। হাসপাতাল আছে, চিকিৎসক আছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই সংকট নতুন নয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ ছিল। দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পর্যালোচনা করে পরিচালিত গবেষণায় তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য রোগী ও পরিবারের দুর্ভোগ। আরও উদ্বেগের বিষয়, একই গবেষণা অনুযায়ী, সরকারি ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) প্রায় ৬২ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করে। সময়মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওষুধের প্রাপ্যতা প্রায় ৯০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। অর্থাৎ সমস্যাটি সব সময় অর্থের অভাব নয়; এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে ক্রয়, সরবরাহ, প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এখানেই সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে। দেশের ওষুধ শিল্প নিয়ে আমরা গর্ব করি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। অর্থাৎ ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। অথচ সরকারি হাসপাতালের ফার্মেসিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। এই বৈপরীত্য নিছক দুর্ভাগ্য নয়; এটি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। উৎপাদন আছে, কিন্তু রোগীর হাতে নেই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ওষুধের নিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। একটি ওষুধ রোগীর হাতে পৌঁছাতে প্রয়োজন সঠিক চাহিদা নিরূপণ, সময়মতো ক্রয়, মান যাচাই, মজুদ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যথাযথ বণ্টন। এই শৃঙ্খলের যেকোনো একটি জায়গায় সমস্যা হলে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন নথিতেও বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতে ওষুধের চাহিদা নির্ধারণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় মেডিকেল স্টোরস ডিপো এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে কোনো হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ জমে থাকতে পারে, আবার অন্য হাসপাতালে একই ওষুধের সংকট দেখা দিতে পারে। কোন হাসপাতালে কোন ওষুধ কত প্রয়োজন, কোন রোগের প্রকোপ বাড়ছে, কোন মৌসুমে কোন ওষুধের চাহিদা বাড়বে এসব তথ্য সময়মতো সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা জরুরি। তা না হলে বরাদ্দ ও সরবরাহ বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মিলবে না। ফলে কোথাও ওষুধ পড়ে থাকবে, কোথাও রোগী ওষুধের জন্য ঘুরে বেড়াবেন। এই অদক্ষতা শুধু অর্থের অপচয় নয়; এটি চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত ওষুধের চাহিদা নিরূপণ ও সরবরাহব্যবস্থাকে ডিজিটাল এবং তথ্যনির্ভর করা। কোন হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সে কোন ওষুধ কত আছে, মাসে কত ব্যবহার হচ্ছে এবং কত দিনের মজুদ রয়েছে এসব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে দৃশ্যমান করা প্রয়োজন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের মজুদ নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে পারে। কোথাও অতিরিক্ত মজুদ থাকলে দ্রুত ঘাটতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তা পাঠানোর ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সংস্কারও জরুরি। ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া যদি এত দীর্ঘ হয় যে রোগীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর ওষুধ আসে, তাহলে সেই ক্রয়ব্যবস্থা কার্যকর বলা যায় না। জরুরি ওষুধের জন্য দ্রুত ক্রয় এবং বিকল্প সরবরাহকারীর ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, মান যাচাই ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দ্রুততার অজুহাতে অনিয়মের সুযোগ  তৈরি না হয়। জাতীয় প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় এ তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তালিকা তৈরি করাই শেষ কথা নয়। তালিকাভুক্ত ওষুধ প্রতিটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মাপকাঠি। সরকারি হাসপাতালে কম দামে ওষুধ বিক্রির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে বহুল ব্যবহৃত ২৫০ ধরনের ওষুধ বাজার মূল্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দামে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। উদ্যোগটি কার্যকর হলে অনেক রোগী উপকৃত হতে পারেন। তবে এটি যেন বিনামূল্যে বা বরাদ্দের ওষুধের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। দরিদ্র রোগীর অধিকার হলো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া, তাকে কম দামের ওষুধ কিনতেও বাধ্য করা নয়।

সবচেয়ে জরুরি হলো জবাবদিহি। কোনো হাসপাতালে ওষুধ নেই কেন তার উত্তর শুধু ‘সরবরাহ আসেনি’ বললে চলবে না। চাহিদা কখন পাঠানো হয়েছিল, কত বরাদ্দ হয়েছিল, সরবরাহ কোথায় আটকে ছিল এবং মজুদ ব্যবস্থাপনায় কোনো ভুল হয়েছিল কি না এসব তথ্য যাচাইযোগ্য হতে হবে। হাসপাতালের ওয়েবসাইট, ডিজিটাল পর্দা বা নোটিস বোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের প্রাপ্যতা নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে রোগী ও স্বজনরা যেমন তথ্য পাবেন, তেমনি কর্তৃপক্ষের ওপরও সামাজিক জবাবদিহি বাড়বে। ওষুধের সংকট কেবল ফার্মেসির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার অংশ। দেশের ওষুধশিল্প উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, হাসপাতালের অবকাঠামো সম্প্রসারিত হচ্ছে। এখন প্রয়োজন এসব সক্ষমতার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা সুচারু করা। উৎপাদন থেকে রোগীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ হতে হবে স্বচ্ছ, দ্রুত, তথ্যনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক।

লেখক : কলাম লেখক, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী

 [email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত