বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ইতিহাস শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, পুনর্গঠন ও উন্নয়ন সহযোগিতা তিনটিরই সন্ধানে ছিল। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়; পরদিন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ঘনীভূত হয়। এরও আগে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফর সম্পর্ককে রাজনৈতিক সৌহার্দ্য থেকে উন্নয়ন সহযোগিতার পথে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী পাঁচ দশকে বাংলাদেশে সরকার বদলেছে, জাপানেও নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বৈশিষ্ট্য প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে স্থিতি, আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা। ওই শুরুর সময়টিও মনে রাখার মতো। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের মুখ্য প্রয়োজন ছিল পুনর্গঠন ও খাদ্যনিরাপত্তা। আজকের বাংলাদেশ একই সম্পর্কে গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও উচ্চদক্ষ কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা করছে। এই পরিবর্তনই পাঁচ দশকের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিবর্তন। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্য অনেক ইতিবাচক বার্তা এসেছে।
সম্পর্কের চরিত্র অবশ্য এক জায়গায় স্থির থাকেনি। প্রথম পর্যায়ে জাপান ছিল প্রধানত সহায়তাদাতা। খাদ্যপণ্য, অবকাঠামো ও কারিগরি সহায়তা ছিল সম্পর্কের কেন্দ্র। পরে সেতু, বিদ্যুৎ, নগর পরিবহন, বিমানবন্দর ও বন্দর উন্নয়নের মতো বড় অবকাঠামো সামনে আসে। ২০১৪ সালে বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি উদ্যোগ সম্পর্ককে নতুন অর্থনৈতিক মাত্রা দেয়। ২০২৩ সালে সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি বা ইপিএ স্বাক্ষর বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় পরিবর্তন এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। পরিসংখ্যান চিত্রে বোঝা যায়, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপানের উপস্থিতি কতটা গভীর। টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের হিসাবে, স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশকে ঋণ, অনুদান ও কারিগরি সহায়তাসহ প্রায় ৩৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৮০টি জাপান-সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোরেল, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথ উন্নয়ন এবং আড়াইহাজারে বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে উন্নয়ন সহায়তার বিপুল অঙ্কের পাশে বেসরকারি জাপানি বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট। জেট্রোর হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশে ৩৩৮টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সম্পর্কের রাজনৈতিক আস্থা ও সরকারি অর্থায়ন অনেক দূর এগোলেও বেসরকারি বিনিয়োগে সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের গুরুত্ব মূলত এখানেই।
বেসরকারি বিনিয়োগের ছবিও একটু সতর্কভাবে পড়া দরকার। এক বছরে বিনিয়োগ কম হলেই জাপানি উপস্থিতি ছোট এমন নয়। ২০১৮ সালে জাপান টোব্যাকোর একটি বড় অধিগ্রহণই প্রায় ১ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ছিল। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক বিনিয়োগ প্রবাহ অনেক কম। অর্থাৎ বড় এককালীন বিনিয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত নতুন উৎপাদন বিনিয়োগ বাড়ানোই এখন আসল চ্যালেঞ্জ। নতুন এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের লক্ষ্য তাই শুধু অঙ্কের দিক থেকে নয়, বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা তৈরির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরটির সময়ও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, শুল্ক সুবিধার কাঠামো বদলাবে এবং বিনিয়োগের নতুন উৎস দরকার হবে। একই সময়ে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো সরবরাহশৃঙ্খলকে একক দেশের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান, বড় শ্রমবাজার এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা অর্থনীতি জাপানি শিল্পের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্ভরযোগ্য জ¦ালানি, দ্রুত কাস্টমস, করনীতির পূর্বানুমেয়তা এবং চুক্তির নিরাপত্তা বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে টোকিওতে ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের ফলাফল ইতিবাচক। দুই দেশ বিগ-বিকে ‘বিগ বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে নতুন কৌশলগত কাঠামোয় উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে। নতুন কাঠামোর চারটি স্তম্ভ হলো সংযোগ জোরদার,প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রস্তুতি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহযোগিতা। সবচেয়ে আলোচিত ঘোষণা হলো, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং তাতে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এই অঙ্ককে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত, কারণ বর্তমান জাপানি বিনিয়োগের ভিত্তির তুলনায় এটি বড় অগ্রগতি। তবে এটিকে সরকারি অনুদান বা নিশ্চিত নগদ প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। জাপানের সরকারি বিবৃতিতেও এটিকে সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগের প্রক্ষেপণ বলা হয়েছে।
সাফল্যের আসল পরীক্ষা হবে কত দ্রুত জাপানি কোম্পানি প্রকল্প বেছে নেয়, অর্থ ছাড় করে এবং উৎপাদন শুরু করে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠানোর কথাও বলেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কোম্পানিই নেয়। সফরে অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে আরও কয়েকটি বাস্তব ফল এসেছে। দুই প্রধানমন্ত্রী ইপিএ দ্রুত কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন। ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন,কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ নিয়ে চারটি সহযোগিতা স্মারক ও একটি লেটার অব ইনটেন্ট হয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে জাপান বাংলাদেশকে একটি টহল জাহাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েন অনুদানের ব্যবস্থাও হয়েছে। এর আগে জুনে অর্থনৈতিক স্থিতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ চুক্তি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সেই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। সফরের কৌশলগত দিকটিও উপেক্ষার নয়। বঙ্গোপসাগর এখন বাণিজ্য, জ¦ালানি ও আঞ্চলিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণায় বাংলাদেশের অবস্থান তাই অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি ভূকৌশলগত গুরুত্বও বহন করে। মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতা কথা বলেছেন। বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়ন সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এখন ক্রমেই একই নীতিগত কাঠামোর অংশ হয়ে যাচ্ছে। আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন, মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা ও শ্রমঘাটতি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু শুধু শ্রমিক পাঠানোর চিন্তা যথেষ্ট নয়। ভাষা, কারিগরি সনদ, পেশাগত শৃঙ্খলা এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণকে এখন থেকেই বিনিয়োগের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা মানে শুধু চাকরি নয়; ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও মাননিয়ন্ত্রণ শেখার সুযোগও। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত কোনো একক ঋণ বা প্রকল্প নয়; বরং সম্পর্কের ব্যাকরণ বদলানোর চেষ্টা। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন জাপানের কাছে সফল উন্নয়ন সহযোগিতার একটি ক্ষেত্র ছিল। এখন লক্ষ্য হচ্ছে সেই সম্পর্ককে বিনিয়োগ, উৎপাদন, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খলের অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া। তবে টোকিওর বার্তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। জাপানি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি, স্বচ্ছ নিয়ম, নির্ভরযোগ্য জ¦ালানি ও দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেন। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকর করা, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, কর ও শুল্কে হঠাৎ পরিবর্তন কমানো, মুনাফা প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্ভাবনা বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও জাপানি পক্ষকে স্বচ্ছভাবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন এর সাফল্যনির্ভর করবে ঘোষণাগুলো কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় তার ওপর। পাঁচ দশকের উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক এখন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের অংশীদারত্বে রূপ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। টোকিওর ঘোষণা ইতিবাচক; কিন্তু এর প্রকৃত পরীক্ষা হবে যথাযথ বাস্তবায়নে। বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ের প্রকৃত মূল্য সেখানেই নিহিত।
লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির বিশ্লেষক। গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফেলিসিয়ানো স্কুল অব বিজনেস, মন্টক্লেয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুুক্তরাষ্ট্র।