আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং প্রকাশের সময় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিচিত কিছু আক্ষেপ ফিরে আসে। কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বসেরাদের কাতারে পৌঁছাতে পারছে না? গবেষণায় কেন পিছিয়ে? আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই বা এত সীমিত কেন? এসব আলোচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায়ই দুর্বল অবস্থানে দেখা হয়। অথচ বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে ভিন্ন এক বাস্তবতা চোখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি দীর্ঘদিন ধরে কিউএস ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ের শীর্ষে। আর বিশ্বসেরা দশের ভেতরে হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড ও ক্যালটেকের মতো নামগুলোও প্রাইভেট। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইভেট না পাবলিক, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, গবেষণায় কতটা বিনিয়োগ করছে এবং শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারছে কি না।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। আঞ্চলিক ও টেকসই উন্নয়নভিত্তিক মূল্যায়নে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেও ছাড়িযে গেছে। মাত্র তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে গড়ে ওঠা একটি খাতের জন্য এটি কম বড় অর্জন নয়। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য পুরো খাতের ছবি নয়। দেশের অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এখনো আন্তর্জাতিক তালিকায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি গড়তে পারেনি। সম্ভাবনা ও বাস্তবতার এই ব্যবধানের কারণ খোঁজা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখন আর একটিমাত্র তালিকার ওপর নির্ভরশীল নয়। আর এই বৈচিত্র্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই কাজ করে। কিউএস ওয়ার্ল্ড ও কিউএস এশিয়া একাডেমিক সুনাম, গবেষণার প্রভাব ও আন্তর্জাতিকীকরণ বিবেচনা করে। টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) গবেষণা, পাঠদান ও গবেষণার মানকে গুরুত্ব দেয়। এই দুই তালিকাতেই একাডেমিক ও নিয়োগকর্তাদের মতামতভিত্তিক জরিপ বড় ভূমিকা রাখে। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠানের স্নাতকরা কর্মবাজারে সুনাম অর্জন করেছেন, তারা এখানে বাড়তি সুবিধা পান। বিষয়ভিত্তিক তালিকায় একটি নির্দিষ্ট বিভাগের সক্ষমতা আলাদা করে মূল্যায়নের সুযোগ থাকে। ফলে পুরো প্রতিষ্ঠান সামনের সারিতে না থেকেও একটি শক্তিশালী বিভাগ আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে পারে। টিএইচই’র টেকসই উন্নয়নভিত্তিক মূল্যায়নে গবেষণার পাশাপাশি সমাজকল্যাণ ও পরিবেশে প্রতিষ্ঠানের অবদানের প্রমাণ বিবেচিত হয়। আর ইউআই গ্রিনমেট্রিক দেখে পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস ও টেকসই ব্যবস্থাপনা। ওয়েব-উপস্থিতিনির্ভর ওয়েবোমেট্রিক্স’র মতো তালিকায় ঢোকা তুলনায় সহজ ও দ্রুত। এসব তালিকার পদ্ধতি এক নয়, তাই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী উপযুক্ত দরজা বেছে নিতে পারে।
পরিসংখ্যান সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা দুটোই দেখায়। কিউএস এশিয়া ২০২৬-এ বাংলাদেশের ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২১টি প্রাইভেট। কিন্তু দেশের মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই-তৃতীয়াংশ প্রাইভেট হওয়ার বিষয়টি ধরলে বোঝা যায়, নিজেদের মোট সংখ্যার তুলনায় আন্তর্জাতিক তালিকায় প্রাইভেট খাতের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। বৈশ্বিক কিউএস ওয়ার্ল্ড তালিকায় বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও কম, তাই আঞ্চলিক কিউএস এশিয়া-ই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথম বাস্তব ধাপ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক অগ্রগতি প্রমাণ করে প্রতিযোগিতায় টেকা সম্ভব। অন্যদিকে, এই সূচকে বিপুল অনুপস্থিতি জানায় এই সক্ষমতা এখনো ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠেনি।
এই ব্যবধানের প্রধান কারণ হিসেবে অর্থসংকটের কথা বলা হয় এবং যুক্তিটি অমূলক নয়। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, দক্ষ শিক্ষক ও গবেষণা তহবিল গড়তে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ লাগে। কিন্তু সব দুর্বলতার ব্যাখ্যা অর্থ দিয়ে হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠানে গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ, প্রকাশনার হিসাব আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলাফল ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থেকে যায়। সেই সঙ্গে র্যাংকিং নিয়ে ধারণাটাও প্রায়ই অসম্পূর্ণ। ভাবা হয় সংস্থার কাছে নিবন্ধন করে তথ্য পাঠালেই তালিকায় স্থান মেলে। বাস্তবে প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব শর্ত ও পদ্ধতি আছে। কিউএস প্রয়োজনে প্রকাশ্য উৎস থেকেও তথ্য নেয়। আর কিছু তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশনা বা স্বীকৃতির শর্ত পূরণ করতে হয়। আবার তথ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্বহীন ভাবারও সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশ করলেও প্রতিষ্ঠানের নাম ভিন্ন বানানে লেখায় স্কোপাসয়ে সেই কাজ প্রতিষ্ঠানের নামে ঠিকমতো ওঠে না; ফলে প্রকৃত গবেষণা-উৎপাদনই কম দেখায়। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন একটি কেন্দ্রীয় তথ্যকোষ গড়ছে, যেখানে শিক্ষকদের প্রকাশনা, উদ্ধৃতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার হিসাব এক জায়গায় রাখা হয় এবং স্কোপাস ও ওআরসিআইডিতে প্রতিষ্ঠানের নাম অভিন্ন রাখা নিশ্চিত করা হয়। এগুলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগের চেয়ে বেশি নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা ও ধারাবাহিকতার ওপর।
প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা এখানে শিক্ষণীয়। ভারতের ও পি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান হয়েও অল্প সময়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছে, বিশেষত আইনশিক্ষায় এর অবস্থান বিষয়ভিত্তিক তালিকায় ভারতের শীর্ষে। পাকিস্তানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে থাকলেও প্রাইভেট এলইউএমএস ব্যবসায় শিক্ষায় ও আগা খান বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা শিক্ষায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। আর মালয়েশিয়ার প্রাইভেট ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি কিউএস ওয়ার্ল্ডর প্রথম ৩০০’র মধ্যে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাস, অর্থায়ন ও পরিচালনা আলাদা; তবু একটি শিক্ষা স্পষ্ট সব বিষয়ে একসঙ্গে শ্রেষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা না করে নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গড়াও আন্তর্জাতিক পরিচিতির কার্যকর পথ।
আন্তর্জাতিকীকরণের কিছু সূচকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক সুবিধা রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মাধ্যম ইংরেজি, যা বিদেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আকর্ষণে এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা-সহযোগিতায় সহায়ক। র্যাংকিংয়ে বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত এবং আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণা আলাদা সূচক হিসেবে গণ্য হয়। এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে বড় অবকাঠামোগত ব্যয় ছাড়াই অগ্রগতি সম্ভব। বিদেশি সহলেখকের সঙ্গে করা গবেষণা সাধারণত বেশি উদ্ধৃত হয়; ফলে সাইটেশন-নির্ভর সূচকেও এর সুফল মেলে। একইভাবে স্বল্পমেয়াদি বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ ডিগ্রি ও অতিথি শিক্ষক আনার উদ্যোগ তুলনামূলক দ্রুত ফল দিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিল্পসংযোগ একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বিশেষত তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবায় শিল্পের বাস্তব সমস্যাকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ আছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেদের মধ্যেও সক্ষমতার বড় পার্থক্য আছে। কয়েকটিতে গবেষণার অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক তুলনামূলক ভালো। অনেকে আবার মূলত টিউশন ফির ওপর নির্ভরশীল বলে গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। নীতিনির্ধারকদের এই পার্থক্য মাথায় রেখে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের মৌলিক সক্ষমতা বাড়ানো দুটোই দরকার।
সরকারি উদ্যোগও এখন আগের চেয়ে সহায়ক। বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত হিট (এইচইএটি) প্রকল্পের গবেষণা তহবিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পিএইচডিধারী শিক্ষক ও স্কোপাস প্রকাশনার সংখ্যা দেখে আলাদা স্তরে ভাগ করেছে। আর সেই শ্রেণির সর্বোচ্চ ধাপে পাবলিক নামগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। ইউজিসি এ বছর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল অফিস গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে, যার কাজ বিদেশি সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক তহবিলের পথ খোলা, বিনিময় কর্মসূচি ও যৌথ গবেষণার সমন্বয় এবং র্যাংকিং সংস্থার কাছে প্রতিষ্ঠানের তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন। খসড়া জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় আগামী ৫ বছরে দেশের গবেষণা-প্রকাশনা ও পেটেন্ট দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে হিট’র মতো তহবিল মূলত প্রকল্পভিত্তিক ও সীমিত মেয়াদের। প্রাইভেট খাতের গবেষণা-সক্ষমতা টেকসই করতে হলে প্রতিযোগিতামূলকভিত্তিতে উন্মুক্ত একটি স্থায়ী জাতীয় গবেষণা তহবিলের কথা ভাবা যেতে পারে, যেখানে পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় প্রতিষ্ঠান মানের ভিত্তিতে আবেদন করতে পারবে। তহবিলের সঙ্গে অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা, ফলাফল মূল্যায়ন আর গবেষণার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য হলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও শিক্ষকদের জন্য প্রকাশনা-প্রণোদনা, গবেষণাছুটি ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের ধারাবাহিক সুযোগ গবেষণাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসে পরিণত করতে পারে।
প্রতিযোগিতার একটা ঝুঁকিও আছে। প্রকাশনার সংখ্যা যখন মানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন অর্থের বিনিময়ে নিম্নমানের সাময়িকীতে প্রকাশ, অপ্রয়োজনীয় সহলেখক যুক্ত করা কিংবা একটি গবেষণাকে একাধিক দুর্বল প্রবন্ধে ভাগ করার প্রবণতা বাড়ে। এতে সাময়িকভাবে হিসাব বাড়লেও প্রতিষ্ঠানের গবেষণা-সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। র্যাংকিংকে তাই শিক্ষার মানের একমাত্র মাপকাঠি ভাবা ঠিক নয়। শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা, কর্মসংস্থান, গবেষণার সামাজিক উপযোগিতা আর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই একটি বাস্তবসম্মত পথ আছে। যাদের গবেষণা-সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো, তারা কিউএস এশিয়া ও গবেষণানির্ভর তালিকার দিকে এগোতে পারে। নির্দিষ্ট বিষয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়নের, আর পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় সক্রিয় প্রতিষ্ঠান টেকসই উন্নয়নভিত্তিক তালিকার প্রস্তুতি নিতে পারে। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে, নতুন হয়েও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগোনো যায়। এই সাফল্যকে পুরো খাতের অর্জনে পরিণত করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, গবেষণা, শিক্ষার মান ও প্রশাসনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ দরকার। শিক্ষার্থীর জন্যও এর প্রভাব হবে সরাসরি; কারণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ডিগ্রি দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বাড়তি সুযোগ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক তালিকায় অবস্থান সেই চেষ্টার একটি ফল হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দেশের শিক্ষা, গবেষণা ও সমাজে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান কতটা স্থায়ী হয় তার ওপর।