গ্রামের স্বপ্ন থেকে বিশ্বমানের অবিরাম যাত্রায় আইইউবিএটি

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩২ এএম

বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মানদণ্ডে (যেমন কিউএস বা টাইমস হায়ার এডুকেশন) বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

এক দশক আগেও বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানক্রমে বাংলাদেশের  বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। আজ কিউএস, টাইমস হায়ার এডুকেশন কিংবা ইউআই গ্রিনমেট্রিকের মতো  বৈশ্বিক মানদন্ডে আমাদের একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত স্থান করে নিচ্ছে; কোনো কোনো সূচকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও এগিয়ে থাকছে। এ এক বড় পরিবর্তন। একসময় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন না পাওয়া শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিকল্প হিসেবে দেখতেন। এখন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রথম পছন্দ হিসেবেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিচ্ছেন। তবে এই অগ্রগতিকে আমি কেবল শুরু হিসেবেই দেখি। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আমাদের দূরত্ব এখনো অনেক, বিশেষ করে গবেষণার মান, পরিমাণ ও প্রভাবে।

আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানজনক অবস্থানে আসার পেছনে মূল চালিকাশক্তি বা কৌশলগুলো কী ছিল?

টাইমস হায়ার এডুকেশনের ২০২৭ সালের বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় মানক্রমে আইইউবিএটি দেশে যৌথভাবে দ্বিতীয় এবং বিশ্বে ১০০১ থেকে ১২০০-এর মধ্যে অবস্থান করছে। ইউআই গ্রিনমেট্রিকের ২০২৬ সালের বিশ্ব মানক্রমে আমরা দেশে প্রথম, এশিয়ায় ১১৩তম এবং বিশ্বে১৯৭তম। কিউএস এশিয়া মানক্রম ২০২৬-এ এশিয়ায় আমাদের অবস্থান ৬৪৪তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ১৮৬তম। নৈতিক মূল্যবোধের সূচকে আমরা বিশ্বে ৩৯তম। এই অর্জনের পেছনে তিনটি বিষয় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

প্রথমত, মানের প্রশ্নে কোনো আপস না করা। আমাদের প্রকৌশল শিক্ষাক্রমগুলো ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের আওতায় বাংলাদেশ প্রকৌশল শিক্ষা মান-স্বীকৃতি বোর্ডের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আর ব্যবসায় অনুষদ যুক্তরাষ্ট্রের এসিবিএসপি আন্তর্জাতিক মান-স্বীকৃতি সংস্থার স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব শিক্ষাঙ্গন ব্যবস্থাপনা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্র্জ ব্যবস্থাপনা আর সবুজ শিক্ষাঙ্গনের জন্যই পরিবেশবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়ের মানক্রমে আমরা দেশে শীর্ষে। তৃতীয়ত, গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃৃতিতে পরিণত করা।

আইইউবিএটিতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের স্কোপাস ইনডেক্সড জার্নালে প্রকাশনা বাড়াতে কী ধরনের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

বৈজ্বাক মানক্রমের সবচেয়ে বড় মানদন্ড গবেষণা। এজন্য প্রতিষ্ঠাতার নামে আমরা ‘মিয়ান গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ গড়ে তুলেছি, যা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। কৃষি উৎপাদনশীলতা ও জনস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়ন পর্যন্ত জাতীয় সমস্যা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সেখানে একসঙ্গে কাজ করেন। গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশনার জন্য প্রণোদনা এবং তরুণ শিক্ষকদের জন্য গবেষণা পদ্ধতি ও গবেষণাপত্র রচনার প্রশিক্ষণ নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। ফলও আসছে। স্কোপাসের ২০২৫ সালের সূচক অনুযায়ী গবেষণা প্রকাশনায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আইইউবিএটি চতুর্থ। ২০২৬ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এলসেভিয়ের প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় আমাদের ১২ জন গবেষকের নাম এসেছে। 

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক করপোরেট বা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আপনাদের যৌথ উদ্যোগগুলো কেমন ভূমিকা রাখছে?

বিশ্ব মানক্রম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি নিয়োগকর্তা ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা বাড়ায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শ্রেণিকক্ষের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য বিদেশে আবেদন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শিক্ষার্থীর জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, গ্রহণযোগ্যতার আসল ভিত্তি হলো স্নাতকদের দক্ষতা। তাই আমাদের পাঠ্যক্রমে হাতে-কলমে শিক্ষা ও বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের স্নাতকরা আজ দেশে-বিদেশে, যুক্তরাজ্য থেকে কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ পর্যন্ত, ইন্টেল, নাসা ও জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।

বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আপনাদের ফ্যাকাল্টি ও স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ বা যৌথ ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা আছে কি না?

আন্তর্জাতিক পরিসরে চীন, মালয়েশিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্ব আইইউবিএটিকে একটি আঞ্চলিক শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করছে। বর্তমানে ২১টি দেশের ১৭১ জন বিদেশি শিক্ষার্থী আমাদের শিক্ষাঙ্গনে পড়াশোনা করছেন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে একই শ্রেণিকক্ষে পড়ে, যৌথ প্রকল্পে কাজ করে এবং দেশ না ছেড়েই একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে ওঠে।

আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আপনাদের পাঠ্যক্রমে সাম্প্রতিক সময়ে কী ধরনের যুগোপযোগী পরিবর্তন বা ‘আউটকাম বেসড এডুকেশন’ মডেল যুক্ত করা হয়েছে?

আমাদের পাঠ্যক্রম ‘আউটকাম বেসড এডুকেশন’ শিক্ষা পদ্ধতিতে সাজানো। প্রতিটি পাঠের শুরুতেই নির্ধারণ করা থাকে শিক্ষার্থী কী শিখবে এবং কী করতে পারবে আর মূল্যায়নও হয় সেই অনুযায়ী। পাঠ্যক্রমে ক্রিটিক্যাল থিংকিং, প্রবলেম সলভিং, ক্রিয়েটিভিটি ও ইনোভেশনে গুরুত্ব দেওয়া হয়; আন্তর্জাতিক মান-স্বীকৃতির শর্ত মেনে শিল্পখাত ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে আমরা নিয়মিত পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপাত্ত বিশ্লেষণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মতো বিষযয় বিভিন্ন শিক্ষাক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে আরও সহজে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে যেতে পারে, সেজন্য সরকার, ইউজিসি বা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের কাছ থেকে কী ধরনের নীতিগত ও কাঠামোগত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্ব মানক্রমে আরও এগিয়ে নিতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের কাছে আমার কয়েকটি প্রত্যাশা রয়েছে। গবেষণার জন্য জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক তহবিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান অধিকার প্রয়োজন। বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশানুমতি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। নতুন শিক্ষাক্রম অনুমোদন ও পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হওয়া উচিত, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিবর্তনশীল চাকরির বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে। একই সঙ্গে মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ স্বীকৃতি ও প্রণোদনা দিলে পুরো খাতে মানোনয়নের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।

বৈশ্বিক শিক্ষাঙ্গনে শীর্ষ কাতারে নিতে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা ভিশন কী?

আমাদের লক্ষ্য আইইউবিএটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা। আগামী কয়েক বছরে আমাদের অগ্রাধিকার হলো গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা আরও বাড়ানো, ডক্টরেট ডিগ্রিধারী শিক্ষকের অনুপাত বাড়ানো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়ের পরিসর বাড়ানো, এশিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাতারে জায়গা করে নেওয়া এবং বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে আরও এগিয়ে যাওয়া। তবে পরিবেশবান্ধব শিক্ষাঙ্গনে আমাদের নেতৃত্বও আমরা ধরে রাখতে চাই। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতার মূল স্বপ্ন থেকে আমরা সরে আসব না। দেশের প্রতিটি গ্রাম, ওয়ার্র্ড ও মহল্লা থেকে অন্তত একজন স্নাতক  তৈরি করা এখনো আমাদের পথনির্দেশ। শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষা বেতন মওকুফের মাধ্যমে মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য দরজা খোলা রাখাই আমাদের অঙ্গীকার। মানক্রম একটি আয়না, যা আমাদের অবস্থান দেখায়। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল সাফল্য তার স্নাতকদের মধ্যে, যারা দক্ষ, নৈতিক ও সমাজের সেবায় প্রস্তুত।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত