র‌্যাংকিংয়ের চেয়ে গুণগত মানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৯ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

বৈশ্বিক র‌্যাংকিং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, গবেষণা, শিক্ষার পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একটি মাধ্যম। তবে র‌্যাংকিংকে কখনোই শিক্ষার মানের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, গবেষণার মাধ্যমে কী ধরনের জ্ঞান তৈরি হচ্ছে এবং সেই জ্ঞান সমাজ ও দেশের উন্নয়নে কতটা কাজে লাগছে, তার ওপর। আমাদের কাছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্য, গবেষণার সুযোগ, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং আন্তঃর্জাতিক পরিসরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জন আমাদের মূল লক্ষ্য নয়। বর্তমান সমাজের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের চর্চাই আমাদের মূল অগ্রাধিকার।

র‌্যাংকিংয়ের জন্য কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি ও সূচকে পার্থক্য আছে। এসব সূচকের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত মান ও গবেষণার উৎকর্ষের সম্পর্ক কেমন?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়নে ভিন্ন ভিন্ন সূচক ও পদ্ধতি ব্যবহার করে।

কোথাও একাডেমিক সুনাম, নিয়োগদাতাদের  মূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবার কোথাও গবেষণার প্রভাব, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি, গবেষণার পরিবেশ ও জ্ঞান বিনিময়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পশ্চিমাদের প্রবর্তিত এই র‌্যাংকিং নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এসব সূচকের সঙ্গে শিক্ষার মান ও গবেষণার উৎকর্ষের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সব সূচক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থানীয় শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করতে পারে ও   শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু তার গবেষণার আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। আবার র‌্যাঙ্কিয়ে ভালো অবস্থান থাকলেই প্রতিটি বিভাগে সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত হয়েছে এমনটিও বলা যায় না।

বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কি গবেষণার মান, উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও র‌্যাংকিংয়ের অগ্রগতি নিয়ে পরিমাপযোগ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে?

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিআরডি) গবেষণা কার্যক্রম সমন্বয়, গবেষণা প্রকল্পে সহায়তা, প্রকাশনা এবং গবেষকদের সহযোগিতার কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম এবং গবেষণার ফলাফল এ সেন্টার যথাযথভাবে নথিভুক্ত করে। আমরা মনে করি, শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা দিয়ে গবেষণার মান বিচার করা যথেষ্ট নয়। গবেষণাটি কতটা মৌলিক, নির্ভরযোগ্য জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে কি না, অন্য গবেষকরা সেটি ব্যবহার করছেন কি না এবং বাস্তব কোনো সমস্যার সমাধানে অবদান রাখছে কি না এসব বিষয়ও বিবেচনা করা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের কত শতাংশ গবেষণায় ব্যয় হয়? গবেষণার জন্য ছুটি, তহবিল (সিড গ্রান্ট) ও পূর্ণকালীন গবেষণা-সহকারীর মতো ব্যবস্থা কী কী আছে?

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সিআরডির মাধ্যমে গবেষণা প্রকল্পের জন্য অভ্যন্তরীণ তহবিল বরাদ্দ, গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান এবং গবেষণার অগ্রগতি সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। গবেষণায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা এবং যোগ্য শিক্ষার্থীদের গবেষণা-সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়া আমাদের গবেষণা কার্যক্রমের অংশ। বর্তমানে গবেষণা খাতে ব্যয় আশাব্যঞ্জক না হলেও ভবিষ্যতে মোট ব্যয়ের ৫ শতাংশ, যাতে এ খাতে ব্যয় হয়, সে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পিএইচডি গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০ জন শিক্ষক পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন গবেষণা-সহকারী কাজ করছেন। 

মানসম্পন্ন গবেষণার জন্য আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কী সুবিধা আছে?

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের জন্য একাডেমিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং গবেষণা-সহায়ক সুবিধা রয়েছে। সব সুবিধা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একসঙ্গে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে আশুলিয়ার পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমন্বিতভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ও ম্যাচিং গ্রান্ট প্রকল্প তৈরি করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। একসঙ্গে যৌথ গবেষণার লক্ষ্যে ফান্ড ট্রান্সফারের পাশাপাশি টেকনোলজি ট্রান্সফার, ডাটাবেজ শেয়ারিং, লাইব্রেরি শেয়ারিংসহ গবেষণা-সংক্রান্ত অনেক কিছুই শেয়ার করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি গবেষণার উদাহরণ দিন, যেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ, নীতিগত প্রভাব এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আছে?

আমাদের শিক্ষার্থীরা আইওটি-ভিত্তিক স্মার্ট এনার্জি ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণার ধারণা উপস্থাপন করেছে। এ ধরনের প্রযুক্তি শিল্পকারখানায় জ্বালানির ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, অপচয় কমানো এবং উৎপাদন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করে।

একটি গবেষণা উদ্যোগে শিল্প ও শহরাঞ্চলের বর্জ্য পর্যবেক্ষণ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় আইওটি ও এআই ব্যবহারের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। প্রযুক্তিটি যথাযথভাবে উন্নয়ন ও পরীক্ষা করা গেলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং নগরসেবায় কাজে লাগতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বয়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূর্বাভাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিক্ষার্থীরা গবেষণা পোস্টার উপস্থাপন করেছে। এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ পরিকল্পনা ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় হতে পারে।

প্ল্যাজিয়ারিজম শনাক্ত করা এবং গবেষণার সততা যাচাইয়ের কী ব্যবস্থা আছে? এসব ব্যবস্থা কি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার মৌলিকত্ব ও সততা নিশ্চিত করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, টার্নিটিন সফটওয়্যারের মাধ্যমে সিমিলারিটি ইনডেক্স যাচাই এবং গবেষণার নৈতিকতা তদারকির জন্য এথিকস কমিটি রয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যায়নের মানদণ্ডে কিছু পার্থক্য থাকলেও গবেষণার সততার মৌলিক নীতিগুলো সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে গবেষণাপত্রে ভুয়া তথ্য-উপাত্ত তৈরি, ভুয়া জার্নালে প্রকাশের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন ঝুঁকি মোকাবিলায় আপনারা কী ব্যবস্থা নেন?

এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় এআইয়ের দায়িত্বশীল ও নৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করছে। পাশাপাশি এআই শনাক্তকরণ সফটওয়্যার এবং টার্নিটিনের মতো টুলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু এআই শনাক্তকরণ টুলের ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে গবেষণার তথ্য, সূত্র ও পদ্ধতির যথার্থতা যাচাই করাও জরুরি।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষাদানের দক্ষতা, গবেষণার মৌলিকত্ব এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হয়?

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের প্রধানত তিনটি দায়িত্ব রয়েছে জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণ এবং জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ। একজন ভালো শিক্ষকের মধ্যে এই তিনটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা জরুরি। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে শিক্ষাদানের দক্ষতা, গবেষণার মৌলিকত্ব এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসির নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যাতে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে আসতে পারে, সেজন্য সরকার, ইউজিসি বা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের কাছে কী ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে আসতে পারে, সেজন্য সরকার, ইউজিসি ও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। উচ্চতর গবেষণা, দক্ষ গবেষক তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান উৎপাদনের সুযোগ তৈরির জন্য মানসম্মত ও সক্ষম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর সুযোগ দেওয়া উচিত। গবেষণা অনুদান, যৌথ গবেষণা প্রকল্প, আধুনিক গবেষণাগার, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ডেটাবেসে প্রবেশাধিকারের সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং যৌথ ডিগ্রি কার্যক্রম সহজ করা উচিত। স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বলতা চিহ্নিত করে শিক্ষার মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো যায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত