বাইরে বাগাড়ম্বর চললেও ভেতরে ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের বড় পরাজয়ের পর দুই দেশের আলোচনায় গতি এসেছে। ওপরে ওপরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর নানা কথা বললেও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাইকে চিঠি পাঠিয়ে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ইরানও এগিয়ে এসেছে। পরবর্তী বৈঠকের দিনক্ষণ নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল ঠিক তখনই যুদ্ধবিরতির জন্য পরমাণু চুক্তিসহ সাত দফা শর্ত দিয়েছে তেহরান। ইরান বলেছে, শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পরমাণু চুক্তি বা হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হবে না। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান বিন জাসিম আল থানির মধ্যস্থতায় শেষ দফায় এই শান্তি আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যেই তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন। সবশেষ তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানেও এ নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা কখনোই শতভাগ উপযুক্ত একটি শান্তিচুক্তি পাব না, কিন্তু সেই উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য আপনি অপেক্ষাও করতে পারেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পও আলোচনার কথা নিশ্চিত করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আমরা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছি। নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বিপর্যয়ের পর তেহরানের প্রতি আগের কড়া অবস্থান থেকে ট্রাম্প কিছুটা হলেও সরে এসেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শিগগিরই নেওয়া হবে। সম্ভব হলে আমি দেশটির বাকি অংশ ধ্বংস করতে চাই না, তবে হয়তো আমাকে তা করতে হতে পারে। আপনারা শিগগিরই তা জানতে পারবেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নেব, আমরা কি আরও অগ্রসর হতে চাই এবং বিষয়টিকে চিরতরে এমনভাবে সিলমোহর দিতে চাই, যাতে এমনটি আর কখনো না ঘটে?’
হামলার পরিণতির ইঙ্গিত দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ধ্বংসযজ্ঞ হলে দেশটি পুনর্গঠনে অন্তত ২৫ বছর সময় লাগবে।
ফক্স নিউজ লিখেছে, ইরানে ফের সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না, তা নিয়ে হোয়াইট হাউজে জাতীয় নিরাপত্তা টিমের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও করেছেন ট্রাম্প।
এদিকে ইরান সাত দফা নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছে। বলেছে প্রথমত, তাদের ওপর আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; দ্বিতীয়ত, অবরুদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা; তৃতীয়ত, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া; চতুর্থত, লেবানন-সহ পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাতের পুরোপুরি অবসান ঘটনো, পঞ্চমত, পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো; ষষ্ঠত, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং শেষ দাবি হচ্ছে ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন আক্রমণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। এদিকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা কমাতে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবির সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারত, চীন, ইরাক এবং কাতারের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে সমস্ত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা দিয়েছে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার। তার আগে কাতারের মধ্যস্থতায় দোহায় ইরান ও আমেরিকার প্রতিনিধিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে একটি খসড়া চুক্তির প্রস্তাব উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নতুন সাত দফার শর্ত দিল ইরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জবাবে ইসরায়েল এবং মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় তেহরান।
হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফের বিদায় এবং আরও ৪-৫ জনকে সরানো হচ্ছে: মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের শোচনীয় হারের পর হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসকে সরিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। তার জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা কট্টর অভিবাসনবিরোধী স্টিফেন মিলারকে। গুঞ্জন আছে পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পদত্যাগ করতে পারেন কিংবা তাদের অপসারণ করা হতে পারে। তবে হোয়াইট হাউজ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ খবর নাকচ করে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, সব মিলিয়ে চার থেকে পাঁচজন মন্ত্রী পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ট্রাম্প সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমি আমার মন্ত্রিসভার সদস্যদের ভালোবাসি। আমি মনে করি তারা ভালো করছেন। তবে আমি হয়তো কিছু পরিবর্তন আনব।’ এই সাক্ষাৎকারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের জায়গায় তিনি কট্টর অভিবাসনবিরোধী স্টিফেন মিলারকে নিয়োগ দিয়েছেন। সিবিএস নিউজের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, হেগসেথ আপাতত নিরাপদ আছেন। অন্যদিকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পদত্যাগ করছেন বলে যে দাবি উঠেছে, তা সরাসরি নাকচ করেছেন তিনি নিজেই। এক সাক্ষাৎকারে রুবিও জানান, ট্রাম্পের পুরো মেয়াদে দায়িত্ব পালন করাই তার পরিকল্পনা। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির এই হতাশাজনক ফলের পর ট্রাম্পের বর্তমান মন্ত্রিসভার মোট চার-পাঁচজন সদস্য পদত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সিএনএন জানিয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে তিন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্তের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই জ্যেষ্ঠ ফেডারেল প্রসিকিউটর। দক্ষিণ ফ্লোরিডার ইউএস অ্যাটর্নির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কিনোনেস। বিচার বিভাগের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডিভিশনের প্রধান জন আইজেনবার্গও শুক্রবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। বৃহস্পতিবার বিভাগের সিভিল রাইটস ডিভিশনের প্রধানের পদ ছেড়েছেন হারমিত ধিলন।