সরকারি কাজে কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে গাড়ি পান না। প্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ অনেক দপ্তরের কর্মকর্তারাও জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি চেয়ে পাচ্ছেন না। উচ্ছেদ অভিযান ও খাদ্যপণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা যাচ্ছে না গাড়ি সংকটের কারণে। এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠকে সরকারের গাড়ি সংকটের কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে এ ব্যাপারে জবাব চেয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষভাগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই চিঠির জবাবে লিখেছে, সরকারি গাড়ির পুরো হিসাব তাদের কাছে নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাছে নিজ নিজ দপ্তরগুলোর আওতাধীন সংস্থা ও অধিদপ্তরের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকশ গাড়ির হিসাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বারবার চেয়েও পায়নি। সর্বশেষ মন্ত্রিসভা গাড়ির তথ্য জানতে চাওয়ার পর জনপ্রশাসন থেকে ২০-২১টি মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট গাড়ির সংখ্যা চেয়ে জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) লেটার ইস্যু করা হয়েছে। ওই ‘জবাব’ আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠকে উত্থাপন করার কথাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এবার যদি কাজ হয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট গাড়ির তথ্য চেয়ে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। কেউ তথ্য দেয়নি।’ জনপ্রশাসন সূত্র জানায়, সরকারের প্রশাসনিক কাজে প্রয়োজনের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা কম। গত ১০-১২ বছর কোনো নতুন গাড়ি কেনা হয়নি। এরই মধ্যে নতুন কিছু প্রশাসনিক এলাকা (যেমন থানা ও উপজেলা) সৃষ্টি হয়েছে। তাদেরও গাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাস্তবায়িত ও বাস্তবায়নাধীন সহস্রাধিক প্রকল্পের নিজস্ব প্রয়োজনে গাড়ি ক্রয় করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ওইসব গাড়ির তথ্য সরকারি পরিবহন অধিদপ্তরকে জানানোর কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। বিশেষ করে এলজিইডি, সড়ক ও মহাসড়ক অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও গণপূর্ত অধিদপ্তর সর্বাধিক সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ওইসব দপ্তর থেকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সচল কিংবা অচল গাড়ির কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অভিযোগ আছে, ওইসব দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী থেকে শুরু করে অতিরিক্ত ও নির্বাহী প্রকৌশলীরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনে একাধিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে কারও কারও ৩-৪টি গাড়ি ব্যবহারের নজিরও রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অন্তর্বর্তী সরকার হিসাবের বাইরে থাকা গাড়িগুলোকে সরকারি পরিবহন অধিদপ্তরের আওতায় আনতে উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। ওই সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) এ কে এম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারী ও কর্মকর্তারা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। এ গাড়িগুলো সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা, ব্যাংক-বীমা, কোম্পানি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত ছিল। সরকারি কর্মচারীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার বন্ধে অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর হওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি।
চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিবহন পুল হিসেবে পরিচিত সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের অধীনে থাকা গাড়ির সংখ্যা বর্তমানে ২ হাজার ৬০টি। এসব গাড়ির বেশিরভাগই ১৫ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি পুরনো। গাড়িগুলোর বডি ও ইঞ্জিন দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারপরও সেগুলোই মেরামত করে সচল রাখা হয়েছে। এ কারণে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকা সরকারের বাড়তি ব্যয় বা অপচয় হচ্ছে। অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১২-১৩ সালের পর আর কোনো গাড়ি ক্রয় করা হয়নি। প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত সরকারি গাড়ির ৯০ শতাংশই আয়ুষ্কাল বা লাইফটাইম হারিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গাড়ির বয়স ১০ বছর অতিক্রম করলে গাড়ির কন্ডিশন বা অবস্থা বিবেচনায় প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে এটি একটি গাড়ির চূড়ান্ত আয়ুষ্কাল নয়। এটি নির্ভর করে গাড়ির ব্যবহার ও মেইনটেন্যান্স, দুর্ঘটনা বা অগ্নিকা-জনিত ক্ষতির ওপর। পরিবহন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) রাজা মুহম্মদ আব্দুল হাই গত ১১ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরকে পুরনো গাড়ির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এ কারণে মেইনটেন্যান্স ব্যয় বর্তমানে একটু বেশিই হচ্ছে।
জানা যায়, সরকারি কাজে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত গাড়ি ও নৌযানের সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কোনো দপ্তরে নেই। পরিবহন পুলের কাছে যে হিসাব রয়েছে তা সরকারের সব গাড়ির মোট হিসাবকে প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইক্যুইপমেন্ট (টিওঅ্যান্ডই) অনুযায়ী, প্রত্যেক মন্ত্রণালয় বা অধীনস্থ সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ আয় বা বাজেট বরাদ্দ থেকে গাড়িসহ প্রয়োজনীয় সব ক্রয় করার সুবিধা পায়। ওইসব গাড়ির হিসাব পরিবহন পুলে নেই। এর বাইরে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প বা এডিপির আওতাধীন ক্রয় করা কয়েকশ গাড়ির হিসাবও পরিবহন পুলে নেই। এই দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গাড়ির তথ্য চেয়েও পায় না সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর।
গাড়ি ক্রয়ে প্রতি অর্থবছরেই প্রায় ৬-৭শ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১০-১১ বছর কোনো গাড়ি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন হয়নি। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও দুইবার গাড়ি ক্রয় প্রস্তাব ফেরত দেয়। সর্বশেষ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে নতুন গাড়ি ক্রয়ের প্রস্তাব দিলে তাও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বর্তমানে পরিবহন পুলের অধীনে থাকা ২ হাজার ৬০টি সচল গাড়ির মধ্যে রয়েছে ১৯৬টি কার, ১ হাজার ১৯৬টি জিপ, ১৩০টি মাইক্রোবাস, ১৫৪টি পিকআপ, ৩৭৪টি মোটরসাইকেল, ৬টি মিনিবাস, ১টি রেকার, ২টি ফ্রিজিং ভ্যান ও ১টি অ্যাম্বুলেন্স। এসব গাড়ির মধ্যে কেমরি, ল্যান্সার, বিএমডব্লিউ ও পাজেরোর মতো বিলাসবহুল দামি গাড়িও রয়েছে। এর বাইরে নৌযান হিসেবে ৬০টির মতো স্পিডবোট রয়েছে। অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, এ-গ্রেডের জেলা ১২-১৪টি, বি-গ্রেডের জেলা ১০টি ও সি-গ্রেডের জেলা ৮টির মতো সরকারি গাড়ি পেয়ে থাকে।
পুলিশেও গাড়ি সংকট : বর্তমানে ৬৩৯টি থানায় মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি যানবাহন রয়েছে। গড়ে থানাপ্রতি ২টিরও কম। এসব যানবাহন দিয়ে টহলসহ পুলিশের অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা অত্যন্ত দুষ্কর। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এসব যানবাহনের ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে পুলিশের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত টহল গাড়ি থাকলে জনশৃঙ্খলা রক্ষা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও আলামত সংরক্ষণ সহজ হয়। এ ছাড়া জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বড় কোনো অনুষ্ঠানে থানায় একযোগে অতিরিক্ত গাড়ির প্রয়োজন হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশি কার্যক্রমের গতি বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর দফায় দফায় বৈঠক করে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যানবাহনের সংকট কাটাতে পুলিশের জন্য জিপ, ডাবল ও সিঙ্গেল কেবিন পিকআপসহ ৪৩১টি যানবাহন কেনা হবে। এর জন্য বাজেট ধরা হয় ২৭৫ কোটি টাকা। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবশ্য পুলিশের যানবাহন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।