তালেবান কি যুক্তরাষ্ট্রকে ভুল প্রমাণ করবে

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২১, ০৯:৩৫ পিএম

সপ্তাহ তিনেক আগে আফগানিস্তানের চতুর্থ বৃহত্তম শহর মাজার-ই-শরিফের ফটকের কাছে লাল টুপি পরা এক রাইফেলধারী তালেবান যোদ্ধাকে দেখা গেল খোশমেজাজে সেলফি তুলতে। এর আগে তালেবান এই শহরটির নিয়ন্ত্রণে ছিল দীর্ঘ ২০ বছর আগে। সে সময় তারা কয়েকশ বন্দিকে ট্রাকে বহন করা কনটেইনারে আটকে রেখে শহর ছেড়ে পালায়। মরুভূমির প্রচণ্ড গরমে আর দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল ওই বন্দিরা।

আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে জোরেশোরে আক্রমণের অংশ হিসেবে তালেবান জঙ্গিরা ফিরে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ ওই শহরের তোরণে। কাবুল থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত শঙ্কার ঘণ্টা বাজিয়েছে তাদের সাম্প্রতিক এই অগ্রাভিযান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তালেবান একের পর এক উত্তর আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি প্রদেশের বিভিন্ন অংশ দখল করে নিয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারাই জানিয়েছেন। তালেবান বলেছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে তারা সারা দেশের ৯০টির বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কিছু এলাকা দখলে একটি গুলিও খরচ করতে হয়নি। কিছুদিন আগে আফগানিস্তানে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ডেবোরা লিওনের দেওয়া হিসাবে তালেবানের দখলে চলে যাওয়া এলাকার সংখ্যা তাদের দাবির চেয়ে কিছু কম, ৩২০টি জেলার মধ্যে ৫০টি। তবে এরপর সম্প্রতি ডেবোরা লিওন নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, তার আশঙ্কা সামনে আরও খারাপ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। ‘তালেবানের দখল করা বেশির ভাগ জেলা প্রাদেশিক রাজধানীগুলো ঘিরে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিদেশি বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়ে গেলে তালেবান বাহিনী ওই রাজধানীগুলোকে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার মাস দু-এক পরই এই সতর্কতা এলো। পশ্চিমা সেনাদের আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার সময়টা খুব সুন্দর হবে না তা জানাই ছিল। তবে ঘটনার সাম্প্রতিকতম মোড় আগে যা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক খারাপ। সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা বিগত ট্রাম্প প্রশাসন করলেও প্রত্যাহার শুরু হওয়ার আগেই এর অপ্রত্যাশিত পরিণতির ধাক্কা খেতে শুরু করেছেন নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।

আফগানিস্তানের একটি মানচিত্র নিয়ে ভালো করে নজর করলেই জাতিসংঘ কর্মকর্তা ডেবোরা লিয়নের কথাটা সহজ হয়ে যাবে। তার হুঁশিয়ারির এক জ্বলজ্বলে উদাহরণ হলো গুরুত্বপূর্ণ শহর মাজার-ই-শরিফ। এটি আফগানিস্তানের উত্তরের বৃহত্তম শহর। এককভাবেই এটি একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষমতার কেন্দ্র। উত্তরের মাজার-ই-শরিফের আশপাশে তালেবান বাহিনী যে এলাকাগুলো একে একে দখল করে নিয়েছে সেগুলো মানচিত্রে একবার দেখুন : জায়গাগুলো হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমে ফারিয়াব প্রদেশে; (বালখ প্রদেশে) শহরের উত্তরের ঘিরে থাকা বিভিন্ন এলাকা আর উত্তর-পশ্চিম এবং পশ্চিমে কুন্দুজ এবং তাখার প্রদেশে। সত্যি বলতে, তালেবান জঙ্গিরা সিংহের মতো শহরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছে। পরিস্থিতি দেখে আফগান সরকারি বাহিনীর একজন কমান্ডার সম্প্রতি মাজার-ই-শরিফে প্রবেশের সবগুলো পথ সুরক্ষার জন্য বেশ কয়েকশ সেনা পাঠান। বস্তুত, তালেবান বাহিনী এখন যে কৌশল নিয়েছে তা হচ্ছে আফগান জনগণের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া, সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল করা আর রাষ্ট্রীয় শক্তিকে ধীরে ধীরে নাজুক করে শেষপর্যায়ে একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া।

ইতিমধ্যে বহুজাতিসত্তার দক্ষিণ এশীয় দেশটির বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী (হাজারা থেকে শুরু করে উজবেক ও তাজিক পর্যন্ত) তালেবান বাহিনীর সম্ভাব্য হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করার উপায় খুঁজছে। সাবেক যুদ্ধবাজ নেতা এবং বালখ প্রদেশের প্রাক্তন গভর্নর আতা মোহাম্মদ নূর তার তাজিকপ্রধান গোষ্ঠী জমিয়তে-ই-ইসলামীকে আহ্বান জানিয়েছেন আবার অস্ত্র হাতে নিতে। ১৯৯০-এর দশকে উত্তরাঞ্চলীয় জোটের অংশ হিসেবে তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল আতা মোহাম্মদের বাহিনী। সপ্তাহ দু-এক আগে আতা টুইট করে বলেন, ‘আমি দেশব্যাপী জমিয়তে ইসলামীর সব কমান্ডার এবং অনুগত সৈনিককে তাদের দেশ ও জনগণকে রক্ষার জন্য আফগান প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’ তালেবানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে সমর্থন করার জন্য ২৩ জুন হেরাত প্রদেশের গুজারা জেলায় একদল লোককে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হতে দেখা যায়।

নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যাপার বাদ দিলেও তালেবানের বর্তমান আক্রমণগুলো আফগান সরকারের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনাকে যেন ব্যঙ্গ করছে। আফগান সরকারের একজন আলোচক কাতারের দোহার সংলাপস্থল থেকে বলেছেন, তালেবানের আক্রমণ সরকারকে অবাক করে দিয়েছে এবং অনেকের মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শান্তি আলোচক হাবিবা সরাবি সিএনএনকে বলেন, ‘তালেবান বাহিনী দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এতে করে নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। উত্তরাঞ্চলে সরকার পক্ষের বিপর্যয়ের মাত্রা ও আওতা আমাদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তালেবান ওই অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণের গতি জোরদার করার জন্য ভয়কে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। অবলম্বন করছে সন্ত্রাসবাদ। প্রাদেশিক রাজধানীগুলোতে তাদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা আমার দেশের জন্য এক সংকটময় মুহূর্তের সৃষ্টি করেছে।’

আমি ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে তালেবান বাহিনী কাবুল দখলে নেওয়া থেকে ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ নিজেদের পতন ডেকে আনা পর্যন্ত ক্রমেই তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছিলাম। আল-কায়েদার সদস্যরাই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার ধ্বংস করেছিল। আর তাদের আদর্শিক নেতারা আফগানিস্তানে তালেবানের অতিথি হিসেবে ছিলেন নিরাপদে। আমি টুইন টাওয়ার হামলার রাতে আফগান রাজধানীর রাজপথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। উত্তরাঞ্চলীয় জোটের কমান্ডাররা কাবুল বিমানবন্দরে দুঃসাহসী অভিযান চালাচ্ছিলেন সে রাতে। তারাই ছিলেন তালেবানের বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধ। এ কারণেই এটি লক্ষ করার মতো বিষয় যে, তালেবানরা নিজেদের শক্ত ঘাঁটি দক্ষিণ এবং পূর্বে নয়, আক্রমণ শুরু করল উত্তরে হামলা চালিয়ে। গতবার তাদের জন্য উত্তরাঞ্চল ছিল দেশের সবচেয়ে শক্ত এলাকা। এবার তালেবানের প্রত্যাশা, যদি তারা উত্তরে জয়ী হয়, দক্ষিণে সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই আসবে। উত্তরাঞ্চলকে বশে আনার কৌশলটির পেছনে কাজ করছে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য রুট থেকে লাভবান হওয়ার চিন্তা। সম্প্রতি এক রাতে তালেবান যোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত শহর শির খান বন্দর নিয়ন্ত্রণে নেয়। এটি আফগানিস্তান থেকে তাজিকিস্তানে প্রবেশের মূল পথ। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই উচ্চপদস্থ তাজিক সরকারি কর্মকর্তারা পাশের দেশের ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করতে বৈঠকে বসেন। তালেবানরা তাদের যুদ্ধোত্তর সীমান্ত পেরিয়ে নিতে চায় এ রকম ইঙ্গিত দিচ্ছে না। তবে অতীতে তাজিকিস্তান এ জঙ্গিবাহিনীর উত্তরাঞ্চলীয় শত্রুদের কাছে অস্ত্র-রসদ সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণই যুদ্ধের দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার জন্য দায়ী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তালেবানকে কয়েকবার পরাস্ত করা হয়েছিল, বিশেষ করে ২০১৫ সালে কুন্দুজ থেকে। তালেবানরা অল্পসময়ের জন্য এটি দখল করেছিল। তবে পরে মার্কিন বিমান হামলায় তারা কাবু হয়ে পড়ে। বেসামরিক লোকজনের হতাহতের সংখ্যা বেশি হলেও তালেবান জঙ্গিদের তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তালেবান বাহিনী আফগান স্থলবাহিনীর সমর্থনে চালানো মার্কিন ও ন্যাটোর ভারী বিমান হামলার ধাক্কা কখনোই সামলাতে পারেনি। কিন্তু এখন মার্কিন সেনা ও ন্যাটো চলে যাচ্ছে বলে অত্যাধুনিক ও টানা বিমান হামলার হুমকি অনেকটাই কমে গেল তাদের জন্য। আর তালেবান তা ভালো করেই জানে। তালেবানের প্রচার করা সাম্প্রতিক কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে তারা কোনো গোলাগুলি ছাড়াই জিতেছে। মোবাইল ফোনে করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘হামভি’ সাঁজোয়া গাড়ির একটি বহরের আফগান সেনাদের আত্মসমর্পণ। আফগান সেনারা তারপর নিজেদের বন্দুক ছুড়ে ফেলে দেয়। তাদের একজনকে গাড়ি থেকে জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলতেও দেখা যায়। এরপর তালেবান যোদ্ধারা এগিয়ে আসে তাদের ‘পুরস্কার’ বুঝে নিতে। আর তা হচ্ছে দ্রুত চলার উপযোগী ও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ গোলাবর্ষণের অস্ত্রসম্ভার। কোনো দেশই সম্ভবত তাদের কাছে এসব বিক্রি করতে চাইবে না।

জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তালেবানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তাদের সামরিক বিজয়কে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। বস্তুত, তালেবান জঙ্গিরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রত্যাশী এটাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানের পেছনের মূলমন্ত্র। মার্কিনিদের যুক্তিটি সোজাসাপ্টা : তালেবান তাদের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো উপেক্ষা করবে না, কারণ তারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে আগ্রহী। গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সেই আশার বেলুন কার্যত ফুটো করে দিয়েছে।

লেখক : সিএনএনের আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিষয়ক সম্পাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত