খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১১:৩৭ পিএম

দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিনিয়তই দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে। আরেক দিকে উল্টো বসতবাড়ি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নগরায়ণের কারণে প্রতি বছরই চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে আসছে। তবে সরকারিভাবে কৃষি উপকরণের সরবরাহ, প্রণোদনা, সার, বীজে সহায়তা অব্যাহত আছে। ফলে ঝড়, বৃষ্টি, আম্পান, ইয়াসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে দেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েই চলছে। মূলত দেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টায় কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, যান্ত্রিকীকরণ, উচ্চফলনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন

কৃষিতে অভাবনীয় সফলতা এনেছে। এমনকি বিশ্বে চাল উৎপাদনে শীর্ষে থাকা ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশকে টপকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) থেকে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ফুড আউটলুক-জুন ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারও ইন্দোনেশিয়াকে টপকে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে। উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টানা কয়েকটি দুর্যোগ মোকাবিলা করেও বাংলাদেশ ২০১৯ সালে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টন চাল উৎপাদন করে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ইন্দোনেশিয়াকে টপকে চাল উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে উঠে আসে। সে ধারাবাহিকতা ২০২০ সালেও বাংলাদেশ ধরে রেখেছিল। সংস্থাটি মনে করছে, ২০২১ সালেও বাংলাদেশ ৩ কোটি ৭৮ লাখ টন চাল উৎপাদন করে বিশ্বের তৃতীয় অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে চাষাবাদ করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশি^ক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাগরের লোনা পানি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঢুকে পড়ছে। এতে চাষাবাদের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যদিও লবণাক্ততার আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশের কৃষিকে বাঁচাতে দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা লবণসহিষ্ণু জাতের ধান উদ্ভাবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমরা আশাবাদী আমাদের দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা লবণসহিষ্ণু জাতের দানাদার খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে এবং বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে যে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেছে তা উত্তরোত্তর আরও বৃদ্ধি পাবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, এসব কারণে উচ্চফলনশীল জাতের ধান, গম ও সবজি উৎপাদনে গবেষণা বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য কৃষি গবেষণা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও বাড়াতে হবে। কারণ ছোট্ট ভূখ-ের বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। ফলে বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে চ্যালেঞ্জ তা মোকাবিলায় কৃষি গবেষণা খাতকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে খাদ্য আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। এ বছরও বিপুল পরিমাণ দানাদার খাদ্য আমদানি হয়েছে। এরমধ্যে ১৮ লাখ টন চাল ও ৬৪ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়েছে। যদিও গত বছর গম আমদানির পরিমাণ ছিল ৬০ লাখ টন। অর্থাৎ প্রতিনিয়তই আটা-ময়দার চাহিদা বাড়ছে। ফলে প্রতি বছরই গম আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু সে হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। অথচ গম আবাদের যথেষ্ট সুযোগ দেশে থাকার পরও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উপযুক্ত পদক্ষেপের অভাবে দেশে গমের আবাদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ দেশে প্রচুর পরিমাণ গম আবাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা বিদ্যমান আছে। মূলত দোঁ-আশ মাটিতে স্বল্প সেচে গমের ভালো ফলন হয়। আর আমাদের নদীমাতৃক দেশে এখন বিশাল বিশাল চরের সৃষ্টি হচ্ছে। এসব চরাঞ্চলে স্বল্প সেচে গমের ব্যাপক চাষাবাদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সুযোগ সুবিধার অভাবে চাষিরা এসব জমিতে আলু, ভুট্টা, কলার বাগানসহ নানা জাতের সবজি চাষাবাদ করছে। অথচ চরাঞ্চলে উচ্চ ফলনশীল জাতের গমের বীজ, সার ও নগদ অর্থ সহায়তা দিলে চাষিরা গম চাষের দিকেই ঝুঁকতেন। যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার পরও কেন সরকার গম আবাদের বদলে গম আমদানির দিকেই বেশি আগ্রহ দেখায় তা বোধগম্য নয়। তবে গমে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ ও অন্যান্য রোগের সংক্রমণের ভয়ে চাষিরা দিনে দিনে গম চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এ জন্য গবেষণা করতে হবে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন বীজ উদ্ভাবন করে কৃষক পর্যায়ে বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে।

উল্লেখ্য, উত্তরাঞ্চলের মধ্যে ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর জেলায় এখনো প্রচুর পরিমাণ গমের আবাদ হচ্ছে। এই দুই জেলার বাইরেও উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলায় গমের আবাদের প্রচুর সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমাদের গম চাষাবাদের দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে। যেখানে দানাদার নিত্যপণ্য হিসেবে গমের চাহিদা বাড়ছে, সেখানে আমরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে প্রতি বছরই বেশি পরিমাণ গম আমদানি করছি। এ প্রবণতা কোনোভাবেই আমাদের কৃষি অর্থনীতির জন্য শুভ হতে পারে না। যদি ধান ও অন্যান্য সবজি উৎপাদনে আমরা অভাবনীয় সফলতা অর্জন করতে পারি, তাহলে গম উৎপাদনে কেন পিছিয়ে যাচ্ছি?

তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরে ধানচাষিরা ধানের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন। ফলে ধানের আবাদ যথেষ্ট পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধান বেশি পরিমাণ আবাদ হওয়ায় চালের দাম কমে আসার কথা। কিন্তু এটাও সত্য, ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও চালের দাম ভরা মৌসুমেও কমছে না। বৈশ্বিক মহামারী করোনার বিরূপ প্রভাবে গোটা দুনিয়ায় খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কম-বেশি প্রতিটি দেশেই চালের দাম তুলনামূলক এখনো বেশি। যার প্রভাবে বাংলাদেশেও চালের দাম কমছে না। আবার সরকার আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে এ বছর বিপুল পরিমাণ ধান ও চাল সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। ফলে চালের বাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু এতে সাধারণ ভোক্তার কষ্ট বেড়েছে। এরপরও যদি সরকার অভ্যন্তরীণভাবে ধান চাল সংগ্রহ করে কাক্সিক্ষত পরিমাণ চালের মজুদ গড়ে তুলতে পারে, তাহলে যে কোনো পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সরকার ধান, চাল উৎপাদনের তুলনায় যৎসামান্যই অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে থাকে, তবুও সরকারের আপৎকালীন খাদ্য মজুদ সাধারণ ভোক্তার স্বার্থে বড় মাপের অবদান রাখে। কারণ চালের দাম বেড়ে গেলে সরকার খোলাবাজারে স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রি করাসহ বিভিন্ন চ্যানেলে খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

আশার খবর হচ্ছে, দেশে এ বছর বোরোর আবাদ ভালো হয়েছে। আউশ ও আমনেও ভালো আবাদের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ শুধু বোরো মৌসুমে ভালো উৎপাদন দিয়ে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তবে এখন দক্ষিণাঞ্চলসহ গোটা দেশেই আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক চাষাবাদ হচ্ছে। বোরোর পাশাপাশি আউশ ও আমনেও ধানের আবাদ ভালো হবে বলে আশা করা যায়। আর গোটা দেশে ধানের চাষাবাদ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকাংশেই সম্ভব হবে।

লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত