তবুও ডিজিটাল বাংলাদেশ

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৪৬ পিএম

এক-এগারোর সরকারের সময়ে নবম সংসদ নির্বাচন হয়, যাতে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে খুব জোরেশোরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কথাটি ব্যবহার করে। দলটির ধারণা এই শব্দবন্ধটি অনেক মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে সক্ষম হয়েছিল। সে কারণেই বোধ করি, ক্ষমতাসীন দলটির সকল পর্যায় থেকে ক্রমাগত শোনা গেছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর কথা, যা এখনো শোনা যাচ্ছে । দীর্ঘ ১৩ বছর এক নাগাড়ে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ তার প্রোপাগান্ডায় যতগুলো শব্দ ব্যবহার করেছে তার মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সম্ভবত দ্বিতীয়। প্রথমটি বুঝে গেছেন নিশ্চয়ই ‘উন্নয়ন’।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় আর অবকাঠামো তৈরিকে সামনে এনে যে উন্নয়নের প্রচারণা চালানো হয়েছে তার মধ্যে আছে মারাত্মক ডেটা ম্যানিপুলেশন আর আছে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে হরিলুট। সেটা এমন পর্যায়ে গেছে যে, বিশ্বব্যাংকও কয়েক বছর আগে সংবাদ সম্মেলন করে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছে বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যয় হয়ে গেছে ইউরোপ-আমেরিকার কয়েক গুণ, চীন-ভারতের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। অবকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে ব্যাপক। এই দেশের জনগণের সামনে তাই তথাকথিত উন্নয়নের চরিত্র এখন প্রকাশিত। 

আসা যাক, আলোচনার মূল প্রসঙ্গে। এই দেশে যেখানেই সরকারি দলের কেউ কথা বলুক, হোক সেটা জনসভা, ঘরোয়া কর্মিসভা কিংবা টিভি টকশো, তাদের পক্ষ থেকে ক্রমাগত ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া হয়। এই করোনার সময় যখন অনেকগুলো টিভি চ্যানেল তাদের স্টুডিওতে অনুষ্ঠান করেনি, বাসা থেকে সংযুক্ত হতে হয়েছে আলোচকদের, তখন প্রতিপক্ষের নেতাদের খুব জোর গলায় বলতে শোনা গেছে তাদের দল ডিজিটাল বাংলাদেশ না করলে নাকি এসব টকশোও হতো না! হতো না কোনো ওয়েবেনিয়ার এমনকি শিক্ষাকার্যক্রমও থমকে যেত। বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীর প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়া একটা অনিবার্য প্রযুক্তি নিয়ে ক্ষমতাসীনদের এমন দাবি শুনতে যেমনই লাগুক বলাতে কোনো ক্লান্তি ছিল না তাদের।

সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ যে একটা ফাঁকা বুলি, সেটা জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ খুব ভালোভাবেই জানত। এ দেশে বসবাস করে এমনকি ঢাকা শহরে ঠিকমতো মোবাইল নেটওয়ার্ক না পাওয়া, মোবাইল ডেটার স্পিড না পাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের সবার আছে। আর জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে এই তথাকথিত ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিস্থিতি কী সেখানকার ভুক্তভোগীরা সেটা খুব ভালোভাবেই জানেন। করোনার সময়ে যখন কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইনে ক্লাস হয়েছে, তখন ঢাকার বাইরে থেকে সংযুক্ত অসংখ্য শিক্ষার্থী ঠিকমতো ক্লাস করতে পারেনি ইন্টারনেটের গতির সমস্যার কারণে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সার্ফশার্কের ‘ডিজিটাল কোয়ালিটি অব লাইফ ইনডেক্স ২০২১’-এর জরিপের ফল প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। ডিজিটাল মান, ইন্টারনেট কেনার সামর্থ্য, ইন্টারনেটের মান, ই-অবকাঠামো, ই-নিরাপত্তা ও ই-সরকারকে মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এই জরিপ করা হয়েছে। দেখা যাক, এই সূচকে আমাদের এবং আমাদের আশপাশের দেশের অবস্থান কেমন।

ডিজিটাল জীবনমান সূচকে ১১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে। এশিয়ার ৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০। বাংলাদেশের পরে রয়েছে কেবল তাজিকিস্তান (১০৪) ও কম্বোডিয়া (১০৯)। বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে নেপালের অবস্থান ৮৭তম এবং এর ঠিক পরের অবস্থানেই রয়েছে শ্রীলঙ্কা। বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে ভারত ৫৯তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ৯৭।

এর মাসখানেক আগে প্রকাশিত আরেকটি রিপোর্ট দেখা যাক। ইন্টারনেট অ্যাকসেস ও পারফরম্যান্স অ্যানালিসিস কোম্পানি, ওকলা ইন্টারনেটের স্পিডের ওপরে ভিত্তি করে পৃথিবীর দেশগুলোর র‌্যাংকিং করেছে। মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৭টি দেশের মধ্যে ১৩৫তম। বাংলাদেশের পেছনে আছে মাত্র দুটি দেশ আফগানিস্তান ও ভেনেজুয়েলা। দুটি দেশই গৃহযুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ চরম অস্থিরতায় আক্রান্ত। অবাক হওয়ার ব্যাপার হলো, ভয়ংকর গৃহযুদ্ধপীড়িত সিরিয়া এই তালিকায় আমাদের ওপরে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশের মধ্যে ভিয়েতনাম ৫৮, কম্বোডিয়া ৯১, নেপাল ১০৫, মিয়ানমার ১০৯, পাকিস্তান ১১৪, ভারত ১২২ এবং শ্রীলঙ্কা ১২৯তম অবস্থানে রয়েছে। ওকলার রিপোর্টে বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের স্পিড তুলনামূলক ভালো থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা কে না জানি, এই ইন্টারনেট আছে একেবারে হাতেগোনা কিছু মানুষের হাতে। এ দেশের আপামর জনগণ নির্ভর করে মোবাইল ডেটার ওপরে। মোবাইল ডেটার অতি নিম্নগতির জন্য এ দেশের মানুষ তার জীবনকে অভিযোজন করার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমাদের গ্রামগঞ্জে কলিং অ্যাপ হিসেবে ‘শহুরে’ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহৃত হয় না, ব্যবহৃত হয় ইমো। এর প্রধান কারণ ইমো অ্যাপটি অনেক কম ইন্টারনেট স্পিডে কাজ করতে পারে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে আকারে-ইঙ্গিতে নয় রীতিমতো সরাসরি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ক্রমাগত বলা হয় আওয়ামী লীগ না থাকলে নাকি এ দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ঠিকমতো আসত না। তাহলে প্রশ্ন ওঠে ইউরোপ-আমেরিকার কথা বাদ দিই, আমাদের সমপর্যায়ের কিংবা নানা মানদণ্ডে আমাদের চেয়ে অনেক নিচে অবস্থানকারী অনেক দেশ কীভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকে? কীভাবে সুদান, লিবিয়া, সিরিয়া, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া ও উগান্ডার মতো দেশের অবস্থান হয় আমাদের ওপরে?

বাংলাদেশ তার আয় এবং অবকাঠামো অনুযায়ী বৈশ্বিক অবস্থানে ঠিকঠাক জায়গাতেই আছে। তবুও কি এটা নিয়ে ঢাকঢোল পেটানোর মতো বিষয় ছিল? কোনো দেশে ক্ষমতাসীন কোনো সরকারকে যদি কোনো বিষয়ে কৃতিত্ব দাবি করতে হয় তবে সেই বিষয়ে স্বাভাবিক ক্ষেত্রে যা হতে পারত তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করে দেখাতে হবে। স্বাভাবিক গতিতে, সাধারণভাবে গ্লোবাল ভিলেজে বসে বিশ্বের আর সব দেশের মতো একই ধরনের অগ্রগতির জন্য আলাদাভাবে কোনো কৃতিত্ব দাবি করা যায় না। এটি সময়ের স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে থাকে আর তাই এগুলো নিয়ে বাড়তি উচ্ছ্বাস কেবল হাস্যরসই তৈরি করে। 

সরকার কী কী করেছে, সেই কথাগুলো শুনতে এমনি মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। একটা দেশের সরকারকে জনগণ তার করের টাকায় পোষে, কারণ জনগণের সেবা নিশ্চিত করাই সরকারগুলোর কাজ। সেখানে কোনো সরকার যদি এমন কোনো বিষয় নিয়ে ক্রমাগত বড়াই করে যেই ক্ষেত্রে তারা পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর তুলনায় পড়ে আছে প্রায় সর্বনিম্ন স্থানে, তাহলে বিষয়টা কেমন দাঁড়ায়? 

দেশে একটা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি যদি বিরাজ করত, মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচনব্যবস্থা যদি থাকত তাহলে এটা নিশ্চিত, জনগণের সামনে এত অদ্ভুত কথা বলে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সরকার যাচ্ছে তাই বলে যায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে জনগণ যতই ক্ষুব্ধ হোক না কেন, তারা তাদের ক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ম্যান্ডেট দিয়ে তাকে ক্ষমতা থেকে নামাতে পারবে না। খুব চমৎকার কোনো কথাও অতি ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যায়। আর একেবারে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে ক্রমাগত একই কথা বলা মানুষকে কতটা বিরক্ত করে সেটি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে মানুষের ট্রল দেখলেই বোঝা যায়।

মানুষ দীর্ঘদিন থেকেই নিজের অভিজ্ঞতায় জানত আর এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক রিপোর্টের পর সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নামের ফাঁকি একেবারে প্রকাশ্য হয়ে গেছে। অবাধ তথ্য-প্রবাহের যুগে মানুষের কাছে সেই তথ্য পৌঁছেও গেছে। আওয়ামী লীগের বোঝা উচিত যতবার এই কথাগুলো তারা বলবেন, ততবারই মানুষকে তারা মনে করিয়ে দেবেন, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এই দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ তো বটেই আমাদের বিদ্রুপের শিকারদের উগান্ডা কিংবা একেবারে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়ার চেয়েও আমরা খারাপ অবস্থায় আছি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এ দেশের জনগণের কাছে এখন এক ব্যর্থতার নাম।

লেখক আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত