খেলাপি কমাতে ব্যাংকঋণ বিতরণে নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং (আইসিআরআর) নামে এই নির্দেশিকার নিয়মাবলি অনুসরণ করে ঋণ দেবে ব্যাংকগুলো। নির্দেশিকা অনুযায়ী ঋণগ্রহীতাদের সক্ষমতা অনুযায়ী চার শ্রেণিতে বিভাজন করা হবে, যার মাধ্যমে গ্রাহক তার যোগ্যতা অনুযায়ী ঋণ পাবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট অডিটরিয়ামে গতকাল এক অনুষ্ঠানে নির্দেশিকাটি উন্মোচন করা হয়।
আইসিআরআর নির্দেশিকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল রহিমসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন নির্দেশিকার আলোকে ব্যাংকগুলো এখন থেকে প্রত্যেক ঋণগ্রহীতার জন্য একটি রেটিং করবে এবং এ সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার তৈরি করবে। এ রেটিংয়ে পরিমাণ ও গুণগত উভয় ধরনের সক্ষমতার মূল্যায়ন থাকবে। এর আগে ২০০৫ সালে ঋণঝুঁকি নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা ক্রেডিট রিস্ক গাইডলাইন ম্যানুয়াল (সিআরজিএম) অনুযায়ী ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নির্ণয় করে ঋণ বিতরণ করত। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সিআরজিএম ও আইসিআরআর একসঙ্গে অনুসরণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। আগামী জুলাই থেকে কেবল আইসিআরআরএস অনুসরণ করতে হবে বলে গভর্নর ফজলে কবির জানান।
অনুষ্ঠানে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, খেলাপি ঋণ একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এটা নিয়ে সমালোচনা করেন। প্রতিবছরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোতে খেলাপির পরিমাণ বাড়ে, যা ডিসেম্বরে কমে আসে। যে গাইড লাইন করা হয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন হলে খেলাপি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় কমে আসবে। এ গাইড লাইনের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পাবে ব্যাংকগুলো। সরকারও চায় খেলাপি কমাতে, যা অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যেও বলেছেন। আমরাও সে লক্ষেই কাজ করছি। গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা যায়। আর খেলাপি কমলে ব্যাংকগুলোর মুনাফাও বাড়বে।
গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা ছিল বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। মূলত খেলাপি কমিয়ে আনতে নতুন নির্দেশিকার প্রচলন করল বাংলাদেশ ব্যাংক।
আইসিআরআর নির্দেশিকাটি উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক হুসনে আরা শিখা ও বিআইবিএম পরিচালক প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জী। অনুষ্ঠানে তারা জানান, ২০ শিল্প ও খাতের জন্য রেটিংয়ের ২০টি মডেল নির্ধারণ করা হয়েছে নতুন আইসিআরআর নির্দেশিকায়। আগে ক্রেডিট রিস্ক গ্র্যাডিং (সিআরজি) মডেলে একটি মানদ-ের ভিত্তিতে সব খাতে ঋণ দেওয়া হতো।
আইসিআরআর নির্দেশিকার মূল্যায়নের ভিত্তিতে গ্রাহককে চার শ্রেণিতে বিভাজন করবে ব্যাংকগুলো। কোনো গ্রাহক ‘চমৎকার’ (এক্সিলেন্ট) বা ‘ভালো’ (গুড) রেটিং পেলে ব্যাংক তাকে অর্থায়ন করতে পারবে। ‘প্রান্তিক’ (মার্জিনাল) রেটিংধারী গ্রাহককে পুরনো ঋণ নবায়ন বা নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তবে ‘অগ্রহণযোগ্য’ রেটিংধারীকে কোনো পরিস্থিতিতেই নতুন ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো, যদি না আগের ঋণ শতভাগ নগদ পরিশোধ হয় অথবা নির্ভরযোগ্য জামানত দিয়ে ঋণটি আচ্ছাদন করা হয়। তবে ‘অগ্রহণযোগ্য’ (আনএকসেপ্টেবল) রেটিংভুক্ত গ্রাহকের আগের ঋণ সর্বোচ্চ দুবার নবায়ন বা বর্ধিত করা যাবে।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, রেটিং করার ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের মধ্যে একটি পার্টি বা গ্রাহকের পরিমাণগত সক্ষমতায় ৬০ শতাংশ নম্বর এবং গুণগত সক্ষমতায় ৪০ শতাংশ নম্বর থাকবে। রেটিংয়ে কোনো গ্রাহক ৮০’র বেশি নম্বর পেলে তাকে ‘চমৎকার’, ৭০-এর বেশি এবং ৮০’র কম নম্বর পেলে ‘ভালো’, ৬০-এর বেশি এবং ৭০-এর কম পেলে ‘প্রান্তিক’ এবং ৬০-এর নিচে নম্বর পেলে ‘অগ্রহণযোগ্য’ রেটিং দেওয়া হবে। তবে কোনো গ্রাহক গুণগত রেটিংয়ে যত নম্বরই পাক না কেন, পরিমাণগত রেটিংয়ে ৫০ শতাংশ নম্বর না পেলে তাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ রেটিং দেওয়া হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী এখন থেকে নতুন ঋণ, ঋণ নবায়ন ও বিদ্যমান ঋণ বর্ধিতকরণের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে অবশ্যই এ রেটিং সম্পন্ন করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এ রেটিং পদ্ধতিটিকে ফলপ্রসূ করার জন্য কোন কোন খাতের গ্রাহকের রেটিং করতে হবে, তার কিছু খাত-উপখাত নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ভোক্তাঋণ ৫০ লাখ টাকার কম ঋণ আছেÑ এমন ক্ষুদ্রশিল্প প্রতিষ্ঠান, স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ, ক্ষুদ্রঋণ, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ রেটিং অনুসরণ করতে হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, বিভিন্ন ফার্ম ও কোম্পানির তিন বছরের ২২০টি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে খাতগুলোর জন্য মূল্যায়নের মানদ- নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আর্থিক প্রতিবেদনগুলো ২২টি ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
মানদণ্ড নির্ধারক কমিটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহিম আরও জানান, নির্দেশিকা তৈরির জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৪ কোম্পানির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন থেকে তথ্য নেওয়া হয়। এছাড়া চার ব্যাংক থেকে বর্তমান প্রতিবেদন বিশ্লেষণ সাপেক্ষে নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে।
