ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কারা ভোটার ও প্রার্থী হতে পারবেন সেটা ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এতে ভোটকেন্দ্র ও বয়সের বিষয়ে ছাত্রলীগের মতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ অন্য সংগঠনগুলোর। ছাত্রলীগ এই সিদ্ধান্তকে ‘নবদিগন্তের সূচনা’ বললেও অন্য সব ছাত্রসংগঠন ক্ষোভ জানিয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় গঠনতন্ত্রের এই সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়। সভা শেষে এ ঘোষণা দেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এনামুজ্জামান।
গঠনতন্ত্রের যেসব বিষয় সংশোধন করা হয়েছে সেটা হলো-
যে সকল শিক্ষার্থী ১ম বর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অনার্স/মাস্টার্স/এমফিল পর্যায়ে অধ্যয়নরত আছে এবং যারা বিভিন্ন আবাসিক হলে আবাসিক/অনাবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে সংযুক্ত রয়েছে এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখে যাদের বয়স কোনোক্রমেই ৩০ বছরের অধিক হবে না, কেবল তারাই ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার হতে পারবে। সকল ভোটারই প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
উপরিউক্ত শিক্ষার্থীরা ব্যতীত অন্য যারা সান্ধ্যকালীন বিভিন্ন কোর্স/ প্রোগ্রাম/প্রফেশনাল/এক্সিকিউটিভ/স্পেশাল মাস্টার্স/ডিপ্লোমা/এমএড/পিএইচডি/ডিবিএ/ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স/সার্টিফিকেট কোর্স অথবা এ ধরনের অন্যান্য কোর্সে অধ্যয়নরত আছে তারা ভোটার হতে পারবে না।
আর ৩০ বছরের ঊর্ধ্ব শিক্ষার্থীরা যে কোর্সেই অধ্যয়ন করুক না কেন তারা ভোটার হতে পারবে না।
সরকারি/বেসরকারি অথবা দেশে বা বিদেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো শিক্ষার্থী ভোটার হতে পারবে না। অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প কলেজের কোনো শিক্ষার্থী ভোটার হতে পারবে না।
গঠনতন্ত্রের/প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আবাসিক হলেই ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
সময়ের চাহিদা বিবেচনায় ডাকসু ও হল সংসদে কয়েকটি সম্পাদক ও সদস্য পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কতিপয় সংশোধনী ও পরিমার্জন সাপেক্ষে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধিও সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
লিফলেট বা হ্যান্ডবিলে শুধুমাত্র সাদাকালো ছবি ব্যবহার করা যাবে। হল সমূহে সিসিটিভির ব্যবস্থা আছে, প্রয়োজনবোধে হল প্রাধ্যক্ষ আরও সিসিটিভির ব্যবস্থা করবেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ মোবাইল নেটওয়ার্ক নিরবচ্ছিন্ন রাখা হবে।
ছাত্রসংগঠনগুলোর কোনো প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের ওপর হয়রানি করা হবে না। ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে সিসিটিভি বসানো আছে। প্রয়োজনে আরও বসানো হবে, রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তিরাই ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে।
এর আগে ২৩ জানুয়ারি ‘পরিবেশ পরিষদের’ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ছাত্র সংগঠনের নেতারা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। এসব দাবিগুলোর মধ্যে হলের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনগুলোতে ভোট কেন্দ্র করা, ভোট কেন্দ্রগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা দাবি জানানো হয়।
এছাড়া বয়সের বিষয়টি নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তি দেখা যায়। সভায় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা বয়সের বিষয়ে ৩০ বছরের মধ্যে যে কেউ প্রার্থী হতে পারবেন বলে দাবি জানান।
ওই সভায় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী দাবি জানান, যারা দ্বিতীয়বারের মতো মাস্টার্স করছে তারা ডাকসু এবং হল সংসদের ফি দেয়, এদেরকে ভোটার করা হোক। সান্ধ্যকালীন ছাত্রদেরও ভোটার করার দাবি জানান তিনি।
এসময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী তার দাবিকে সমর্থন জানিয়ে চাকরির বয়সের (৩০) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভোটার করার মত দেন। ছাত্রদল বয়সের ব্যাপারে সর্বজনীন করার পরামর্শ দেন।
ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে করার জন্য ছাত্রলীগ ছাড়া সকল ছাত্রসংগঠনের দাবি ছিল।
এবিষয়ে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডাকসুর নেওয়া সিদ্ধান্ত ছাত্রলীগকে সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। হলে ছাত্রলীগের আধিপত্য কারণে কোনো দলের কর্মীরা হলে থাকতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে হলের ভেতর ভোটকেন্দ্র দিয়ে প্রমাণ করল ঢাবি প্রশাসন ছাত্রলীগকে জয়ী করার জন্য নীলনকশা করছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই।
তবে ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগের সাদ্দাম হোসাইন বলেছেন, আজকের সিন্ডিকেটের সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। আমরা আশা করি, দ্রুত ভোটার তালিকা এবং তফসিল ঘোষণা করা হবে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাবি শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত একপক্ষীয়। আমরা পরিবেশ পরিষদের মিটিংয়ে আমাদের দাবিগুলো ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু প্রশাসন আমাদের দাবি রাখেনি। আমরা এটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই।
ছাত্রদল ঢাবি শাখার সভাপতি মেহেদী তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজকের ঢাবি সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত আমরা নিন্দা জানাচ্ছি। এটি সরকারি দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। ঢাবির হল গুলো ছাত্রলীগের দখলে। সেখানে অন্য কোনো দল যেতেই পারে না। সেখানে হলের ভেতর ভোটকেন্দ্র মানে একটি দলকে জেতানোর পাঁয়তারা।
তিনি বলেন, ভোটারের বিষয়ে আমরা বলেছিলাম- যেহেতু অনেকদিন ধরে নির্বাচন হচ্ছে না, সেহেতু ভোটারের বয়স বাড়ানো হোক। কারণ সবার প্রার্থী হওয়ার অধিকার আছে।
উল্লেখ্য, আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
