রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

৩ তীর্থে

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০১:১০ এএম

প্রাণিবিজ্ঞানের তিন তীর্থস্থান আন্দিজ, আমাজন ও গ্যালাপোগাসে গিয়েছেন। সেসব জায়গায় গবেষণা করেছেন। আশীষ দত্তের বিরল সেই অভিজ্ঞতা ও হরেক প্রাণী দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা  লিখেছেন শারমিন আক্তার সেজ্যেতি

ইউরোপে আশীষ দত্তের পা পড়ল ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট। ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব পোরচেতে ভর্তি হলেন তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শতভাগ বৃত্তি পেয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার্স ইন অ্যাপ্লাইড ইকোলজি (ফলিত বাস্তুসংস্থানে আন্তর্জাতিক স্নাতকোত্তর) বিভাগের ছাত্র হলেন। টানা ছয় মাস পাঠ্যবই, ক্লাস, ল্যাব চলতে থাকল। ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি গবেষণার জন্য দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে গেলেন। চিরবসন্তের রাজধানী কিটোতে পা রাখলেন তারা ১৬টি দেশের ২০ জন গবেষক। এক মাস থাকলেন শহরের ইউনিভার্সিটি অব কিটোর ইউনিভার্সিদাদ সান ফ্রান্সিসকো দে কিটোতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অনার্স ও মাস্টার্সের এই সেরা ছাত্রটি

image

এরপর বিশে^র সবচেয়ে বড় মহাদেশীয় পর্বতমালা আন্দিজে গেলেন। ৭ হাজার কিলোমিটার লম্বা এই পর্বতমালার মধ্যে পড়েছে ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া ও চিলি। তিনি ইকুয়েডরের অংশে গিয়েছেন। প্রথমে আন্টিসানা ইকোলজিক্যাল রিজার্ভে গেলেন। বিলুপ্তপ্রায় মাউন্টেইন টাপির ও আন্ডিয়ান বিয়ারের দেখা না পেলেও নানা জাতের পাখি, বুনো খরগোশ, হোয়াইট টেইল্ড ডিয়ারসহ বিভিন্ন প্রাণী দেখেছেন। এরপর কায়াম্বে কোকা ইকোলজিক্যাল রিজার্ভে গেলেন। বিশে^র সবচেয়ে ছোট পাখি হামিংবার্ড দেখলেন। পাখিগুলোর বেশিরভাগই ৩ থেকে পাঁচ ইঞ্চি লম্বা, সবচেয়ে ছোটগুলো ২ ইঞ্চি! ওজন গড়ে ২ গ্রাম। পাখিগুলোর আট থেকে ১০টি প্রজাতি দেখা হলো। প্রায় বিলুপ্ত শকুন প্রজাতির একমাত্র পাখি আন্ড্রিয়ান কন্ডোর। পাখিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাদের বসবাসস্থলকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে, মানুষকে তাদের সম্পর্কে সচেতন করতে পাখির নামে রেস্তোরাঁ আছে। পাশেই পাখিগুলোর জীবন পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র আছে। ফলে পর্যটকরা রেস্তোরাঁয় খেতে খেতে টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাখিগুলো দেখছেন। আশীষও আটটি  আন্ড্রিয়ান কন্ডোর দেখলেন। সেই দেশের পিচিঞ্চা প্রদেশের ‘মিডল অব দি ওয়ার্ল্ড সিটি’তে গেলেন। এখান দিয়েই একুয়েটর লাইন গিয়েছে। এই লাইনের জন্যই এ দেশের নাম ইকুয়েডর।

ইকুয়েডরের সীমানায় আমাজনে তার পা পড়ল পাঁচ ফেব্রুয়ারি। আমাজন বন আমাজন নদীর অববাহিকায় বিশে^র সবচেয়ে বড় রেইন ফরেস্ট। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর দিকের নয়টি দেশজুড়ে বিশাল বনটি আছে। আশীষ দেখলেন, আমাজনে যখন-তখন বৃষ্টি হয়। তাই এটি ‘রেইন ফরেস্ট’। বনের ইয়াশুনি ন্যাশনাল পার্কের তিপুতিনি বায়ো ডাইভারসিটি (জীববৈচিত্র্য) স্টেশনে তারা ছিলেন। ১৯৯৫ সালে ইউনিভার্সিটি সান ফ্রান্সিসকো দে কিটো বোস্টন বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একে শিক্ষা, গবেষণা ও সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। এই স্টেশন দক্ষিণ আমেরিকা তো বটেই, সম্ভবত বিশে^র সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ সরীসৃপ, উভচর, পোকামাকড়, পাখি ও বাদুরের আবাস স্থল। বনের  ভেতরের কাঠের বাড়িতে তিনি থেকেছেন। রাত-দিন বনে হেঁটেছেন। নানা জাতের সাপ, পাখি দেখেছেন। রাতে নৌকায় ঘোরার সময় ছোট জাতের কুমির প্রজাতির কাইম্যান দেখেছেন। এগুলো ৬ থেকে ৪০ কেজি ওজনের, পাঁচ থেকে ১৬ ফিট লম্বা। স্বভাবও কুমিরের। বিষাক্ত ব্যাঙ দেখেছেন,  কাপিবারা নামের সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচা ইঁদুর জাতীয় প্রাণী দেখেছেন। এক একটি কাপিবারা আট থেকে ১০ বছর বাঁচে। কয়েক ধরনের সরীসৃপ, রাতে চষে বেড়ানো প্রাণী দেখেছেন। আমাদের সুন্দরবনের মতো এই বনেরও হৃদপি- অনেকগুলো নদীর শাখা-প্রশাখা। একদিন গোসলের সময় জানলেন, কয়েক মাস আগে সেখানেই বিশে^র সবচেয়ে বড় সাপ অ্যানাকোন্ডা এসেছিল। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে গাছের আঁশ দিয়ে তৈরি মালা, ব্যাগ, হাতের বন্ধনী কিনেছেন। দেখেছেন বনের মধ্যে তেল কোম্পানিগুলো রাস্তা বানাচ্ছে, জনবসতি তৈরি করছে; গাছ উজাড় করছে।

প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে তার পা পড়ল ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ। এটিই তার শেষ গন্তব্য। ২১টি দ্বীপের এই রাজ্যে চার্লস ডারউইন গবেষণা করেছিলেন। এটি বিশে^র সবচেয়ে পুরনো ভূতাত্ত্বিক স্থান। সান ক্রিস্টোবাল দ্বীপে তারা ছিলেন। সাগর তীরে দাঁড়িয়ে মহাসাগরে নানা জাতের সাগরের পাখি উড়ে বেড়াতে দেখলেন। প্রাণিবিজ্ঞানীদের চিরকালের শখ গ্যালাপাগোস কাছিম দেখলেন। এটিই বিশে^র সবচেয়ে বড় কচ্ছপের প্রজাতি। এক একটির ওজন ৪শ কেজির বেশি, প্রতিটি শত বছরের বেশি বাঁচে। এই দ্বীপে তারা স্বাভাবিকভাবেই জন্মে। একে বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণের জন্মের সাফল্য হিসেবে দেখেন। পুরো দ্বীপপুঞ্জে এককালে ১৫ জাতের বড় আকারের কচ্ছপ ছিল। চারটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, ১১টি এখনো আছে। চিরযৌবনা জেলি ফিশ দেখেছেন। পানিতে বেড়াতে বেড়াতে পরিণত বয়সে পৌঁছালেও ওরা আবার শৈশবে ফিরে আসে। শরীরের পুরনো অংশ ঝেড়ে ফেলে আবার জন্মানো নতুন অংশে চলে যায়। ফলে ওদের আয়ুর খোঁজ এখনো বিজ্ঞানীরা পাননি। তবে গবেষণা চলছে। তারা ধারণা করছেন, জেলি ফিশগুলো হয়তো মৃত্যুকে এড়ানোর কোনো বিশেষ কৌশল রপ্ত করেছে।

image

ডারউইনের গবেষণার ফিঞ্চ পাখিও দেখলেন। তিনি গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে এই জাতের প্রায় ১৪  প্রজাতির পাখি শনাক্ত করেছিলেন। এগুলো তার প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের বড় প্রমাণ ছিল। ফিঞ্চগুলোকে বিজ্ঞানীরা স্ট্রেঞ্জ ট্যানেজার পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করেন। তবে ডারউইনের মতো বিবর্তনবাদীদের অনেকে এখনো তাদের ফিঞ্চ নামে ডাকেন। সামুদ্রিক পাখি ফ্রিগেড বার্ড, বুবি, পেলিক্যান ছাড়াও সি লায়ন নামের বিশেষ জাতের সিল মাছ, লাভা লিজার্ডসহ হরেক সাগরের পাখি দেখেছেন। সাগরের নীলাভ, পরিষ্কার পানিতে ডুবুরি হয়ে ঘুরেছেন হাঙর, রে ফিস, সামুদ্রিক কচ্ছপ, হাজার হাজার নাম জানা-অজানা মাছের পাশে। নিয়মানুসারে প্রতিটি ডুবুরিকে প্রতিটি প্রাণী থেকে ৯ ফিট দূরে থাকতে হয়, যাতে প্রাণীগুলোর ক্ষতি না হয়। সান ক্রিস্টোবাল দ্বীপে ইউনিভার্সিটি অব কিটোর শাখা আছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়েও আশীষ গিয়েছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক গবেষকরা দ্বীপপুঞ্জের উৎপত্তি, আবহাওয়া, জলবায়ু,  উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষের আগমনের প্রভাব, দ্বীপ দূষণ নিয়ে গবেষণা করেন।

আশীষ দত্ত ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত বাস্তুসংস্থানের মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারের ছাত্র। এখন হোয়াইট স্ট্রক (সাদা সারস) নিয়ে যুক্তরাজ্যের ইস্ট অ্যাংলিয়া ও পর্তুগালের লিসবন বিশ^বিদ্যালয়ের যৌথ পরিচালিত গবেষণা দলের সদস্য। পরিযায়ী এই পাখির পিঠে জিপিএস বসিয়ে তাদের পরিযায়নের ধরন, স্বভাব, খাবার, বাসস্থান ইত্যাদি নিয়ে তারা গবেষণা করবেন। এই সারস পর্তুগাল থেকে বহু মাইল পাড়ি দিয়ে আফ্রিকাতে গিয়ে বাঁচে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত