বসন্তের শহর থেকে

আমার মধুর বাংলা ভাষা

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:১৪ পিএম

‘আমি যত দূরে যাই, আমার জন্মভূমি তত বেশি বড় হতে থাকে’ কবি রাজু আলাউদ্দিনের ‘তুমি আমার পৃথিবী’ কবিতার চরণগুলো মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম চীন দেশে গিয়ে। বিশেষ করে যখন আমার বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠে শুনি সোনার তরী, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, শহীদ সালাম-রফিক-বরকতের নাম। চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা বিভাগের শিক্ষক আমি। আমার বিভাগের পঁয়ত্রিশ চীনা ছাত্রছাত্রী শিখছে বাংলা ভাষা। তারা দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষা বিষয়কে ‘মেজর’ নিয়ে স্নাতক পর্যায়ে লেখাপড়া করছে। আমার কাজ শুধু বাংলা ভাষাই নয়, সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, বাংলাসাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে ওদের শিক্ষাদান।

চীনে বাংলা ভাষার চর্চা নতুন নয়। আধুনিককালে রবীন্দ্রনাথের চীন ভ্রমণের পর সে দেশে বাংলা ভাষা বিষয়ে পণ্ডিতমহলে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথ চীন ভ্রমণ করেন ১৯২৪ সালের এপ্রিলে। সে যাত্রায় তার সঙ্গে ছিলেন পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন, শিল্পী নন্দলাল বসু, ড. কালিদাস নাগ, কবির সচিব এলমহার্স্ট এবং মার্কিন নাগরিক শ্রীমতী গ্রিন। তারপর থেকে চীনে রবীন্দ্রনাথ ক্রমেই জনপ্রিয় হয়েছেন। সমগ্র রবীন্দ্র রচনাবলি বাংলা থেকে চীনা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। যে চীনা পণ্ডিতরা রবীন্দ্রচর্চা করছেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক দং ইউচেন ও অধ্যাপক পাই খাই ইউয়ান স্বনামখ্যাত।

আমার সাবেক সহকর্মী পাই খাই ইউয়ান শুধু রবীন্দ্র রচনাই নয়, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্্দীন, শামসুর রাহমানসহ অনেক বাঙালি লেখকের রচনা চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। তিনি অত্যন্ত ভালো বাংলা জানেন। বাঙালিদের মতোই বাংলা বলেন। চীন আন্তর্জাতিক বেতারে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার হচ্ছে ১৯৬৯ সাল থেকে। সেখানকার প্রবীণ-নবীন চীনা কর্মীরা সবাই বাংলা বেশ ভালো জানেন। বাংলা বিভাগের পরিচালক ইয়ু কুয়াং ইউয়ে আনন্দীও বেশ ভালো বাংলা জানেন। বাংলা বিভাগের কর্মীদের মধ্যে অনেকেই বাংলা ভাষা শিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে। নবীনদের মধ্যে অনেকে শিখেছেন বেইজিংয়ে চীন যোগাযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখানেও ২০১১-১২ সালে আমি একাধিক সেমিস্টারে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি। বর্তমানে চীনে পাঁচ-ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ রয়েছে। আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন চীন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ রয়েছে বা চীনের তরুণ শিক্ষার্থীরা কেন বাংলা ভাষা শিখছে। জবাবে বলা যায়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বা বাঙালির সম্পর্ক তো আজকে নতুন নয়। সেই ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং, মীননাথ, কাহ্নপা, অতীশ দীপঙ্করের সময় থেকে চীন ও বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বেড়েছে। চীনের অনেক নাগরিক চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। দুদেশের সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার জন্যই প্রয়োজন পরস্পরের ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানা। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ রয়েছে। ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করার লক্ষ্যেই বাংলা ভাষা শিখছে।

চীন বিশাল দেশ। সেই তুলনায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তন খুবই কম। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় বিশাল। আতিথেয়তার যে ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে, বিদেশি বন্ধুর প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা আমাদের রয়েছে, তাতে চীন দেশের মানুষের মধ্যে যারাই বাঙালির সংস্পর্শে এসেছেন, তারাই মুগ্ধ হয়েছেন।

আমার ছেলেমেয়েদের কাছে যখন আমি বাংলাদেশের সংস্কৃতির কথা বলি, যখন ওদের শোনাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর জীবনী, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, জীবনানন্দের কবিতা, চর্যাপদের কথা, তখন ওরা বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়। ওদের কাছে রবীন্দ্রনাথ এক রাজপুত্র, নজরুল বিদ্রোহীপ্রেমিক আর জীবনানন্দ চিরবিরহী। ওরা বাংলাদেশের প্রকৃতি আর সংস্কৃতির কথা শুনে ও চলচ্চিত্র দেখে মুগ্ধ। সুন্দরবন, শ্রীমঙ্গল, কক্সবাজার, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, লালবাগের কেল্লা, কুয়াকাটা, সেন্ট মার্টিনের কথা জেনে তারা এসব দেখতে চায়। ওরা ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে গায়, ‘আমার পরাণ যাহা চায়’, ‘এসো হে বৈশাখ, ‘আলো আমার আলো’, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ ও ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’।

কুনমিং শহরে বাংলাদেশের কনস্যুলেট রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আমার ছেলেমেয়েরা সেখানে গান ও কবিতা পরিবেশন করে। ওরা বাংলাদেশকে ভালোবাসে, ভালোবাসে বাংলা ভাষাকে। বিশ্বে বাংলাই একমাত্র ভাষা যার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছে বাংলা মায়ের সন্তানরা। কে বলে আমার বর্ণমালা দুঃখিনী? বাংলার মতো সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংগ্রামী ইতিহাস আর কোনো ভাষার রয়েছে? যতই শাসকের রাজভাষা হোক সংস্কৃত, ফারসি, ইংরেজি ও উর্দু। ব্রাত্যজনের ভাষা, প্রাকৃতজনের ভাষা বাংলাকে কি গণমানুষের কবিরা অমর করে রাখেননি? এ ভূখণ্ডের মানুষ যুগে যুগে বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছে, মুখের ভাষায়, সাহিত্যে ও লোকসাহিত্যে তাকে অমর করে রেখেছে। মাতৃভাষার প্রতি এত ভালোবাসা আর কাদের রয়েছে? বাংলা ভাষা বিশ্বের মধুরতম ভাষা। এ ভাষার ধ্বনি ঝংকারে বিদেশিরাও মুগ্ধ।

এই ইতিহাসে এবং বাংলা ভাষার মধুর ধ্বনিতে চীনা তরুণ-তরুণীরাও মুগ্ধ হচ্ছে। সেই সুদূর প্রবাসে আমি যখন ওদের বাংলা ভাষায় পাঠ দিই, তখন অদ্ভুত ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। মনে হয়, শ্রেণিকক্ষে যেন অদৃশ্য হয়ে উপস্থিত আছেন ভাষাশহীদ ও ভাষাসৈনিকরা। পিতা, পিতামহ আরও দূর পূর্ব প্রজন্মের মানুষদের কণ্ঠে শুনতে পাই পুঁথিপাঠ, মনসার গীত, লক্ষ্মীর পাঁচালি, গাজন, গম্ভীরা, ভেলুয়া, মলুয়ার কাহিনীকাব্য। আমার সুজলা, সুফলা সোনার বাংলার রূপ যখন ওদের তরুণ দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে, তখন আমিও নিজের চিরচেনা দেশকে দেখি নতুন দর্পণে। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধের ছবির দিকে তাকিয়ে আমারও চোখ সজল হয়ে ওঠে। আমার মাতৃভাষা, মাতৃভূমি তখন প্রসারিত হতে থাকে বিদেশির হৃদয়ে।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও শিক্ষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত