রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গ্রাহকের ওপর বাড়তি মূল্যের বোঝা না চাপানোর পরামর্শ সিপিডির

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ০৯:১৯ পিএম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনায় নানারকম অনিয়ম ও অদক্ষতার পাশাপাশি রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে গ্যাস খাত। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উৎপাদন ব্যয় বেশি। এসব অদক্ষতার ফল গ্রাহকের ওপর যেন বাড়তি মূল্যের বোঝা চাপানো না হয় সেদিকে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। 

রোববার ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সংলাপে সিপিডির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বক্তারা এসব বলেন। ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: সাম্প্রতিক বিতর্ক’ শীর্ষক এ সংলাপে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সংলাপে অংশ নিয়ে বক্তারা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান উন্নতি, শিল্প ও আবাসিক খাতে চাহিদার বৃদ্ধি, গ্রাহক সেবার মান ও মূল্য নির্ধারণ, এবং টেকসই ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিতকরণে ভবিষ্যতের পরামর্শ তুলে ধরেন।

তবে বক্তাদের এসব সমালোচনার জবাবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় আমাদের জ্বালানি খরচ অনেক কম। যারা ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ জ্বালানির অভিযোগ করেন তারা অপপ্রচার করছেন। মূল্য সমন্বয়ের পরেও ভর্তুকির মাধ্যমে জ্বালানিকে ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে হচ্ছে।

নসরুল হামিদ বলেন, সাশ্রয়ী জ্বালানিকে গুরুত্ব দিয়েই আমাদের মাস্টার প্ল্যান করা হয়েছে। ফলে এটা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। জমি ও অর্থায়নের কারণে আমাদের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু হতে বিলম্ব হচ্ছে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিতে হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরনের কারণে শীত মৌসুমে আমাদের চাহিদা কমে যায়। এ বিষয়টি কিভাবে সমাধান করা যায় আমরা সে বিষয়ে কাজ করছি।

নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির বিষয়ে নসরুল হামিদ বলেন, আমরা মাত্র উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পেরেছি। তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করত হলে আরও সময় লাগবে। কোরিয়াতে কোয়ালিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে ৩০ বছর সময় লেগেছে।

ভোক্তাদের বাড়তি খরচ ও দুর্নীতির প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিএনপির শাসন আমলে বিদ্যুতের সিস্টেম লস ছিল ৪৪ শতাংশ। এখন সেই সিস্টেম লস ১১ শতাংশের ঘরে। শিল্প উদ্যোক্তাদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেতে আরও অনেক বছর লাগবে।

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্যে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মেয়াজ্জেম বলেন, প্রকল্প গ্রহণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ আইন এখনই বাতিল করা দরকার। এই খাতের কার্যক্রম ধীরে ধীরে সরকারি ক্রয় আইনে নিয়ে আসতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বেশ কিছু অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা রয়েছে। এগুলো দূর করার জন্য ইউন ইউন শর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি খেয়াল করতে হবে। এছাড়া অস্বচ্ছতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি হচ্ছে। এসব অদক্ষতার ফল গ্রাহকের ওপর যেন বাড়তি মূল্যের বোঝা চাপানো হচ্ছে। এগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে দূর করার পরামর্শ দেন তিনি।

এর আগে আলোচনা অংশ নিয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, ২০০৯ সালে উৎপাদন ক্ষমতার ৪৯ শতাংশ ব্যবহার হতো। এখন ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৪০ শতাংশ।  ভারত ৬ ডলার দিয়ে এলএনজি কিনতে পারলে বাংলাদেশ কেন ১০ ডলার দিয়ে কিনবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ঘাটে ঘাটে দুর্নীতি হচ্ছে।  ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানির বাবদ ঘাটতি দেখিয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। অথচ এখন মাত্র ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানি হচ্ছে। কবে নাগাদ বাকি গ্যাস আমদানি হবে তার নিশ্চয়তা ভোক্তারা জানে না। কিন্তু দাম বৃদ্ধি করা হবে খুব শিগগিরই।

দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে ড. শামসুল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দুর্নীতে ছেয়ে গেছে। এরপর আর কিছু বলার নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটা যুদ্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের সারা দিয়ে আমাদের নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিন না হয় পদত্যাগ করুণ।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ তামীম বলেন, আমার পরামর্শ হবে, আমাদের স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান করা। একই সঙ্গে নিজেদের কয়লা ব্যবহারের চিন্তা করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার নিউমারি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, স্থলভাগের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রে ন্যূনতম অনুসন্ধান করা হয়নি। সারা বিশ্বে গত দশ বছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস অনুসন্ধান কাজ হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ সমুদ্রকে তাদের জ্বালানির রক্ষা কবচ হিসেবে ব্যবহার করছে, কিন্তু বাংলাদেশে তার বিপরীত।

পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, পেট্রোবাংলার কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাই বিদেশি কোম্পানিগুলো জ্বালানি খাতের অনুসন্ধানে আগ্রহী হয় না।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সংলাপে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান সংলাপটি সঞ্চালনা করেন। সংলাপে অন্যান্যের মধ্যে বেসরকারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকসহ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন অংশীজন ও বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও কানাডার রাষ্ট্রদূত বক্তব্য রাখেন।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত