বিলুপ্তির পথে মোঘল আমলের ঐতিহ্য শাহী মসজিদ

আপডেট : ১৩ মে ২০১৯, ০৯:৪৯ এএম

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে স্থাপিত মোগল সম্রাজ্যের নিদর্শন শাহী মসজিদ কালের আবর্তে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। দেশের এ সকল আদি কীর্তিসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় যাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তব্যে অবহেলা ও কাণ্ডজ্ঞানহীন ভূমিকার কারণে বছরের পর বছর ধরে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হতে চলেছে সাড়ে ৫শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জের বন্দর শাহী মসজিদ। এ সকল নিদর্শন রক্ষণাবেক্ষণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও তা মানছে না কেউ-ই।

বিশেষ করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে থাকা যেকোনো পূরাকীর্তির সৌন্দর্য বর্ধন বা উন্নয়নমূলক কোনো কাজ দাপ্তরিকভাবেই হয়ে থাকে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ব্যাতীত কোনো দানবীর বা সামাজিকভাবে উন্নয়ন বা সৌন্দর্যবর্ধন করার কোনো এখতিয়ার নেই। কিন্তু গত ১০ বছর ধরে কিছু অতিউৎসাহী মানুষ ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের চারপাশে সীমানা প্রাচীর ও মসজিদ সম্প্রসারণের নামে মাদ্রাসা স্থাপন করে সৌন্দর্যহানি ঘটিয়েছে।

মসজিদ সংলগ্ন পুকুরটিও দিনে দিনে ভরাট হয়ে ময়লা পানির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কোনো অনুমোদন ছাড়াই মূল শাহী মসজিদের চারপাশে স্থাপনা ও দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে জানানো হলেও তেমন কোনো সাড়া মেলেনি।

জানা গেছে, ১৪৮২ খ্রীস্টাব্দে (৮৮৬ হিজরি) মোতাবেক এ মসজিদের বয়স প্রায় সাড়ে ৫শ’ বছর। মুঘল আমলের মুসলমানদের অত্যন্ত পুরনো একটি এবাদতের স্থান। এ মসজিদে প্রতিদিন শত শত মুসল্লি নামাজ পড়তে আসেন। এই প্রাচীন মসজিদের স্থপতি হাজী বাবা সালেহ ইয়ামেনী (র.)।

তিনি ছিলেন মক্কা’র উচ্চ বংশীয় একজন মহাজের। সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহশাহ’র রাজত্বকালে তিনি রাজপদ’স্থ কর্মচারী ছিলেন। বন্দরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। হাজী সালেহ বাবার মাজার এখানেই অবস্থিত। এই মহান ব্যক্তির নামে সালেহনগর নামে একটি এলাকার নামকরণ করা হয়েছে। এই সালেহ নগরের পাশেই গড়ে ওঠা শাহী মসজিদটি মোঘল আমলে ইট চুনা সুরকি দিয়ে বানানো।

এরই দক্ষিণে রয়েছে চতুর্ভূজী একটা ঐতিহ্যবাহী পুকুর যা মসজিদের আওতাধীন। পুকুরটিতে চতুর্দিকে সিঁড়িঘাট বেষ্টিত রয়েছে। এখন সেই ঐতিহ্যবাহী মসজিদের অস্তিত্ব যেন ক্রমেই বিলুপ্তির পথে। অযত্নে অবহেলায় এখন তার ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে।

ইতোপূর্বে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বছরপূর্তির এক অনুষ্ঠানে মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের এক খসড়ায় ২১নং ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ ও পুকুরটি আধুনিকায়নের কথাও লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি মুঘল আমলের এ শাহী মসজিদের প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষা এবং পুকুর খনন করে এর চতুর্দিকে লেক করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

বন্দর শাহী মসজিদ কমিটির সভাপতি  ও জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আবুল জাহের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হান্নান সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, “ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ যেহেতু সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতাধীন তাই এখানে সিটি করপোরেশনের কাজ করার কোনো এখতিয়ার নেই। তবে সিটি করপোরেশন থেকে মসজিদ সংলগ্ন পুকুরটি বাঁধাই করে লেক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যাপারে মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে অচীরেই আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে সালেহনগর এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, মোঘল আমলের ঐতিহ্য বন্দর শাহী মসজিদ হাজী সালেহ বাবা সাড়ে ৫শ’ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই শাহী মসজিদ এখন বিলীন হওয়ার পথে। পুকুরের সিমানা ঘেঁষা বাড়ির কতিপয় মালিকরাও এ সুযোগে পুকুর আংশিক দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নজর না দিলে অচীরেই বিলীন হয়ে যাবে এই মোগল আমলের স্থাপনাটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত