কেমন করে বিজ্ঞানবক্তা হয়ে উঠলেন আসিফ? কী তার দর্শন ও ভাবনা গড়ে দিল? কেন এলেন এই অনিশ্চিত, কোমলে-কঠোর গন্তব্যের জীবনে? ডিসকাশন প্রজেক্টের জন্ম? ১৯ মে এই সংগঠনের ২৭ বছর পূর্তিতে দেশের একমাত্র বিজ্ঞানবক্তা আসিফের মুখোমুখি হলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুললেন নূর
বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার শুরু?
খুব শৈশব থেকে বই পড়ে বিজ্ঞানের প্রতি আমার ভালোবাসার শুরু। ছোটবেলায় অনেক ধরনের ক্লাসিক পড়েছি জুল ভার্নের ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’, আলেকজান্দার দ্যুমার ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, ‘টুয়েন্টি ইয়ারস আফটার’; চার্লস ডিকেন্সের ‘অ্যা টেল অব টু সিটিজ’; ভিক্টর হুগোর ‘হাঞ্চ ব্যাক অব নটরদেম’, ‘লা মিজারেবল’ ইত্যাদি। জুল ভার্নের বইগুলো খুব উদ্দীপ্ত করেছে। বিশেষত সাগরতলে দুই হাজার লিগ (সাগরের পানির পরিমাপক হলো লিগ) পানির নিচে কীভাবে বিদ্যুতের শক্তিতে সাবমেরিন ছুটে চলেছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ক্যাপ্টেন নিমোর সাগরের তল দিয়ে পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর সেই কাহিনীটি ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে। কাজী আনোয়ার হোসেনের কুয়াশা সিরিজের কথাও বলতে পারি। এই বইগুলো স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ভাড়ার বিনিময়ে পড়তে নিয়ে আসতাম। বইপ্রতি ভাড়া ছিল আট আনা; পড়ে আবার ফেরত দিতাম। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির বিজ্ঞান পত্রিকা আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটি সংকলন প্রকাশ করে। তাতে আইনস্টাইনের ওপর বিস্তারিত, অনেকগুলো লেখা ছিল। সেই অনন্য সংখ্যাটিও বিজ্ঞানের প্রতি আমার ভেতরে ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছে। হয়তো নিয়মিত বই পড়ার কারণেই মানুষের অনাচার, বিভেদ, সম্ভাবনা সবসময় চোখের সামনে দেখতাম। সেগুলোর নানা সমাধানের কথা মনে আসত। তবে এও বুঝলাম, অমাদের বৈজ্ঞানিক ভাবনা ও আইডিয়াগুলোকে যদি খুব গভীরতর করা যায়, তাহলে আমরা এই সমস্যাগুলোর গভীরে যেতে পারি এবং সমাধানও করতে পারি। কারণ বিজ্ঞান তো মানুষের জন্য। ফলে বিজ্ঞানকে শক্তি অর্জনের উপায় হিসেবে দেখেছি। সায়েন্টিফিক সিভিলাইজেশনের (বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা) ধারণা তখন থেকেই আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে।
সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে?
খুব আকস্মিকভাবে নয়, ধীরে ধীরে। পড়া ও অসংখ্য মানুষের সঙ্গে মেশা তার অন্যতম কারণ। আমার ছোটবেলার জীবন কেটেছে মেরিনে, শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে। এমন সময়ও গেছেÑ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নৌকায় নদী পাড়ি দিতাম, স্টিমারের ছাদের ওপর থেকে নদীর জলে লাফিয়ে পড়তাম। কখনো জাহাজের রাডারের তলায় ডুবে যেতে গিয়েছি, কেউ উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। বয়ে যাওয়া নদী ও মেরিনের জল-হাওয়া আমাকে শৈশব-তারুণ্যকে দারুণ গতিশীল করে তুলেছে। কৈশোরে চারতলা ভবন রশি বেয়ে উঠে যেতাম। সেই জীবনেই আইনস্টাইনের সেই সংখ্যা, জুল ভার্নের সেই রহস্য কাহিনীগুলো; তার মিস্ট্রিরিয়াস আইল্যান্ড জড়িয়েছে, জড়িয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘কপোট্রনিক সুখঃদুখ’। এই কালজয়ী বইগুলো মানব সভ্যতার প্রতি আমার ভালোবাসার বোধ তৈরি করে দিয়েছে। তখন বিটিভিতে ইংরেজি সিরিয়াল প্রচার হতো। কলমকে ওয়্যারলেসের মতো ব্যবহার করে কথা বলার দৃশ্যে সিরিয়ালে ছিল; ওয়্যারলেস তো দূরের কথা, অপারেটরের সাহায্য ছাড়া তখন টেলিফোনে কথা বলাই কঠিন; ১৯৭৭-’৮১ সাল;‘ভয়েজ টু দি বটম অব দি সি’; (টিভি সিরিজ); ‘ফ্যান্টাস্টিক ভয়েস ছিল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে একজন অসুস্থ রোগীর রক্ত প্রবাহের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তার দেহের বিভিন্ন ত্রুটি সারানো। সেই তখুনি নব অভিজ্ঞতা হলো মৃত্যু। চার বন্ধু একত্রে বলল, আসিফ মাছ ধরতে যাবি? খুব সম্ভবত চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। বললাম, না, স্কুলে যাব। স্কুল থেকে ফিরছি, যে মাঠে ফুটবল খেলতাম; তাতে দেখি, অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে। এত মানুষ? কেন? আস্তে আস্তে গিয়ে দেখি, সাদা কাপড়ে মোড়ানো কী যেন। জানলাম, যাদের সঙ্গে আমার মাছ ধরতে যাওয়ার কথা ছিল, সে চারজনের একজন মারা গেছে। আমাদের বাড়ির পেছনে জলাশয় ছিল, তার নিচ দিয়ে চলে যাওয়া বৈদ্যুতিক তারের আবরণ খুলে গিয়ে এ অঘটন ঘটেছে, বিদ্যুতের স্পর্শে বন্ধুটি মারা গেছে। তার নাম আহ্মেদ; বেঁচে থাকা তার ভাইয়ের নামÑ ‘আল্লারাখা’। এই মৃত্যু আমাকে শেখালোÑ সময়ের ফের এই যে ফের, তাতে সকালে সবাইকে জীবিত দেখলাম, দুপুরে এসে একজনকে মৃত দেখতে হলো। ভীষণভাবে অসহায় বোধ করলাম। রোদেলা দুপুরের উজ্জ্বল আকাশের দিকে তাকিয়ে তা নিয়ে ভেবেছি: আশ্রয় খুঁজেছি। মনে হয়েছে, মানুষের অসহায়ত্বকে জয় করতে হবে। সেই প্রবণতা আমাকে এই পথে আসার ক্ষেত্রে বড় ধরনেদর প্রভাবক।
নিজেকে কীভাবে তৈরি করলেন?
শুধু বিজ্ঞান বা কল্পবিজ্ঞান নয়, আমি অনেক ধরনের গল্প-উপন্যাসও পড়তাম। তবে কল্পবিজ্ঞানের বই কোনো কিশোরের মানস জগতে কী যে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝি। একটির নাম বলি, ‘গ্রহান্তরের আগন্তুক’। সোভিয়েত রাশিয়ার প্রগতি প্রকাশনের বাংলা অনুবাদের সংকলন। বইটি নিয়মতান্ত্রিক জ্ঞান আহণের দিকে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। মানুষ খুব সহজে নিয়মতান্ত্রিক জ্ঞানের দিকে যেতে পারে না, অনেকে তা বুঝতেও পারে না। তখন পঞ্চম কী ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি (বন্দর শিশুবাগ স্কুল); এরপর নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল। কিশোরবেলায় মাঠা খাওয়ার সুবাদে সোনাকান্দা বন্দরে যেতাম। পাশেই ছিল ওই দোকানটি; প্রথমদিকে ক্লাসের বইয়ের জন্যই যাওয়া হতো। ক্লাসের বই-ই কিনতাম। একদিন দোকানদার বললেন, ‘গল্পের বই পড়?’ ‘হ্যাঁ, পড়ি’। ‘আমার কাছে দারুণ দারুণ বই আছে। ইচ্ছে করলে নিতে পার। কিনতেও পার, আবার তোমার নিজের কোনো ভালো লাগার বই দিয়ে বিনিময় করতে পার।’ ভীষণ অবাক ও খুশি হলাম। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। তিনি দুটি বই দিলেনÑ আলেক্সান্দর বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’ ও আলেক্সান্দর কাজানৎসেভের ‘গ্রহান্তরের আগন্তুক’। এ তো আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা! ‘উভচর মানুষ’ সেই সময় পড়লাম না, আরও বছর দেড়েক পরে পড়লাম, কিন্তু ‘গ্রহান্তরের আগন্তুক’ পড়ে ফেললাম। ডানপিটে হওয়ায় বাবা আমাকে একজন তরুণ শিক্ষককে আমাকে মানুষ করতে বলেছিলেন। শিক্ষকটি কেবল এইচএসসি পাস করেছেন, নাম রকিব বেলাল। ঠিকমতো পড়ালেখা না করায় তার বাবা শীতলক্ষ্যার তীরে মেরিন ডিজেলের কোনো এক টেকনিক্যাল বিষয় পড়ার জন্য তাকে আমার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন। তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। বিকেলে তিনি আসায় খেলতে যেতে পারতাম না। এই কথা বলেছিলামও তাকে। বিকেলটা তার সঙ্গে লেখাপড়া করা আমার জন্য হয়ে উঠেছিল খুব কষ্টের। একদিন বলে বসলাম, ‘আসুন, আমরা বরং গল্প করি।’ তিনি সাড়া দিয়েছিলেন। যখন জানলাম, ‘উভচর মানুষ’, ‘গ্রহান্তরের আগন্তুক’ তিনি পড়েছেন; তাকে বেশ ভালোভাবেই পছন্দ হয়ে গেল। গ্রহান্তরের আগন্তুকের প্রত্যেকটি গল্প বৈজ্ঞানিক, ভীষণ আকর্ষণীয়, কৌতূহল ও উদ্দীপনায় ভরা। একটা গল্প ছিল ভ সাভচেঙ্কোর ‘প্রফেসর বার্নের নিদ্রাভঙ্গ’। বার্ন নামে এক বিজ্ঞানী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ১৮ হাজার বছর পর পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনে গোবি মরুভূমি গভীর অরণ্যে পরিণত হবে। ভবিষ্যদ্বাণীটি সঠিক কি না তা তিনি নিজে পরখ করে দেখার জন্য হাইবারনেশন প্রক্রিয়া বা জীবনের গতি শ্লথ করার একটি উপায় উদ্ভাবন করলেন। এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে ১৮ হাজার বছর টিকিয়ে রাখার কথা তিনি ভেবেছিলেন। কৃষি বিজ্ঞান পড়ানোর আলো-আঁধারির এক সন্ধ্যায় আমার শিক্ষক মানুষটিকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, এ কি সম্ভব? সৌভাগ্যই বলতে হবে, তিনি আমাকে থামিয়ে দেননি, বরং কৌতূহল বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরও কিছু বইয়ের কথা বলেছিলেন। আমার চিন্তার ক্ষেত্রে এই কাজ খুব বড় টার্নিং পয়েন্ট। কারণ এই যে মানসিক সহযোগিতা, এটি তো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধুত্বের সহযোগিতা কেমন পেয়েছেন?
এরপর অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি; ঢাকার নতুন একজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়; সাহাবুদ্দিন আরেফীন; এখন পেশায় ডাক্তার, যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তখন সে ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ত। দুর্দান্ত ভালো ছাত্র ছিল। আমি ছিলাম সাধারণ ছাত্র। আমার সঙ্গে দেখা করতে সে নারায়নণগঞ্জে চলে এলো। তখন আমাদের বাসায় পাঁচ কি ছয়শ বইয়ের বিরাট এক সংগ্রহ আছে। সেগুলো ঘেঁটে বন্ধুটি একটি বই বের করল। রবার্ট রেজনিক ও ডেভিড হ্যালিডের ফিজিক্স পার্ট -১ ও ২। অবাক হয়ে বলল, এই বইগুলো তোর কাছে? পরে জেনেছি, ডিগ্রি ও অনার্স লেভেলের এই বই। পার্ট ২-তে হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেক্ট্রন ক্লাউডের দারুণ একটি ছবি ছিল। ছিল আলোর সঞ্চালন, প্রকৃতির ওপর অধ্যায়, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের কথাও ছিল। মনে আছে, বইটি নিয়ে আমরা আলাপ করতে করতে নারায়ণগঞ্জ পৌর পাঠাগারে চলে গিয়েছি। এখন ‘আলী আহম্মদ চুনকা পাঠাগার’ এটি নামে পরিচিত। তাতে শিশু বিভাগ আছে। এশিয়াটিক ফাউন্ডেশনের প্রচুর ইংরজি বই সেখানে ছিল। চাঁদ, গ্রহ, নক্ষত্রের বইগুলোর ছবি দেখতাম, কখনো পড়তাম। আমার পুরো স্কুল জীবনের বন্ধু বখতিয়ার হোসেন। এখন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। বখতিয়ার অসাধারণ দুটো বই পড়িয়েছিল। একটি হলোÑ আবু কায়সারের ‘রায়হানের রাজহাঁস’ আরেকটি চাঁদে অভিযানের ওপর উপন্যাস (নামটা ভুলে গেছি)। সেই গল্প কিন্তু মনে দাগ কেটে আছে এতকাল পরেওÑ একজন বিজ্ঞানী অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলো অগোচরে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপে মহাকাশ অভিযানের স্থাপনা গড়ে তুলেছিলেন, কিন্তু শক্তিধর দেশগুলোর মাধ্যমে পরমাণু যুগের সূচনার সময় হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে ওই দ্বীপটি উড়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি মারা গেলেন। একটি প্রশ্ন তো স্বাভাবিকভাবে উঠতেই পারে, বিজ্ঞান মানে তো এই মহাবিশ্বকে জানা, আমাদের প্রকৃতিকে বোঝা, এই মানুষের বিকাশকে অনুধাবন করা ও সেই নিরিখে ভবিষ্যতকে পরিকল্পনায় নিয়ে এসে কাজ করা। তাহলে সেই মানুষেরা যুদ্ধ করে কেন? বোমা ফেলে কেন? যারা বিজ্ঞানে এগিয়ে থাকবে তারা তো মানবিকতায়ও এগিয়ে যাবে, কিন্তু তা কেন ঘটেনি? এটি আমার মধ্যে বিজ্ঞানের বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। পরে জেনেছি, এমন অন্যায় কাজ মানুষের ইতিহাসে বারবার ঘটেছে। বিজ্ঞানকে সুবিধা লাভের হাতিয়ার বা ভোগের বস্তু হিসেবে সবসময় ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে বোঝা বা অনুধাবনের চেষ্টা তেমনভাবে করাই হয়নি। মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া হোক, জার্মানির গটিনজেন হোক অথবা ভারতের শিপ্রা নদীর তীরই হোক। সব জায়গায় এমনটি ঘটেছে। অনেক পরে বুঝেছি, আমাদের মস্তিষ্ক বিবর্তনে কিছু অসংগতি রয়ে গেছে। তা দূর না করতে পারলে এমন বিপর্যয় বাড়তেই থাকবে।
আপনার আগ্রহ কোন দিকে মৌলিক নাকি কল্পবিজ্ঞান?
সবসময় মৌলিক বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তা করেছি। সে জন্য বিজ্ঞানের বইগুলো ছাড়াও জুল ভার্ন, ইভান ইয়েফ্রেমভের বইগুলো অনেক বেশি এই আমাকে আকর্ষণ করেছে। কেননা তাতে নিয়মতান্ত্রিক ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ আছে; অন্যান্য কল্পকাহিনীর মতো নয়। কল্পবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান পরস্পরকে উদ্দীপ্ত করে। দুটোই জরুরি।
বিশ^বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো পড়ানো হয়, সেগুলোর সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে?
এগুলো সম্পর্কে আমার ধারণা আছে, যেমন রিচার্ড ফাইনম্যানের ‘লেকচারস অন ফিজিক্স’-এর তিন খ-ই আমার পড়া। বার্কলি ফিজিক্সের ২৬শ পৃষ্ঠার পাঁচ খ-ের বইও পড়েছি। আর্থার বেইজারের ‘কনসেপ্ট অব মডার্ন ফিজিক্স’, অ্যাকাডেমিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বইটিও ভালোভাবে পড়েছি। এগুলোর মধ্যে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স যথেষ্ট আছে। চাইলেই মাস্টার্সের নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়েও আমার পক্ষে আলোচনা সম্ভব। নিয়মতান্ত্রিক বিষয়গুলোকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে পারলে ভালোই হতো। পথে, ঘাটে, মাঠে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে আলোচনা হয়Ñ দারুণ হতো!
পারিবারিক জীবন?
আমার বাবা নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষার তীরের মেরিন ডিজেলের শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলায় স্পিডবোট, সি-ট্রাক নিয়েও আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। লবণের সাম্পানগুলোকে ফাঁকি দিয়ে ছোট নৌকা নিয়ে কতবার বের হয়ে গেছি। নাবিকদের সঙ্গে প্রচুর সময় কেটেছে। ১৯৮৫ সালের দিকে এরশাদের আমলে ‘মার্শাল ল’Ñ ৯’র ধারায় বাবাকে জোর করে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ানো হয়। এই ধারা থাকায় এমন অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে মামলাও করা যায় না। অবৈধ এই আইনগুলোর পরের প্রতিটি সরকার বৈধ করেছে। ১৯৯৪-’৯৫ সালে পরিবারের সেই অবস্থায় কর্তা, অবসরের পর ৫০-৬০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা, না পেয়ে বিনা টাকায় বাড়ি ফেরেন; তাদের পরিবার তো সেই অর্থে অসচ্ছল থেকে যাবে। মাকে এজন্য অপরিসীম কষ্ট করতে হয়েছে।
পেশাদার বিজ্ঞান বক্তৃতার জীবনে কীভাবে এলেন?
জীবনের এক পর্যায় এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম যে, অনেক কিছুর সঙ্গেই খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। সমাজের চলাফেরা, গল্প, আনন্দ কোনোকিছুর সঙ্গে মিলত না। সিদ্ধান্ত নিলাম, জীবনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করব, কিন্তু বেঁচে থাকতে গেলে তো পেশা দরকার। আমার কাছে অনেক ধরনের মানুষ আসতেন। তার অন্যতম কারণ হলো, আমার ঘরটি ম্যাপ, চার্ট ও কয়েক হাজার বইয়ে ঘেরা ছিল। অনেকেরই এসে বসে থাকতে ভালো লাগত। বড় ভাই কবি আরিফ বুলবুলের কারণেও অনেকে আসতেন। আলোচনা প্রসঙ্গে একসময় বলতাম, এত লোক আমার কাছে আসে, আমার কথা শোনে। তারা যদি বিষয়টি দর্শনীর মাধ্যমে করেন, তাহলে আমি এই জীবনে থাকতে পারি, পড়ালেখাও করতে পারি। বয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে আগের মতো হেঁটে বেড়াতে পারি।
এর আগে জীবন কেমন ছিল?
সকাল ১০টায় ঘুম থেকে উঠতাম। চা খেয়ে প্রায় প্রতিদিন দুপুর ১২টায় শীতলক্ষ্যার পাড়ের ৫ নম্বর ঘাটে এসে দাঁড়াতাম। কেউ না কেউ সঙ্গে থাকত। প্রায় ১০ বছর এমনভাবে জীবন চলেছে। নদী দেখতে ভীষণ ভালো লাগত। বলতাম, মানুষও নদীর মতো বয়ে যায়। সে কখনো এক জায়গায় থাকে না। তারপরও সে চিরস্থায়ী অবস্থানের জন্য এমন সব বিপর্যয়কর কাজ করে যায়! তখন আমি খুব বড় সম্ভাবনার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম বলে এখন মনে হয়। নদীর ধারে যখন দাঁড়াতাম, মনে হতোÑ আমার শরীরটা বাতাসের মিশে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। নদীই আমার লার্নিং সেন্টার। এরপর তো ১৯৮৬ সালে সব জায়গা থেকে বিযুক্ত হয়ে গেলাম। কেবল দুই বন্ধু ছিলÑ সাহাবুদ্দিন আরেফিন, রিয়াজ মাহমুদ টুটুল। এসএসসির পর টুটুলের বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘তুই বোধ হয় লেখাপড়া করবি না, কী যে করবি? তোকে ইলেকট্রিকের দোকান দিয়ে দিলাম।’ পরে সে প্যারিস চলে যায়, পরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক। ও থাকার সময় প্রতি ১৫ দিন পর পর শুক্রবারে শীতের দুপুরগুলোতে আমরা বের হয়ে যেতাম। খোলা মাঠে, ডাঙায় বসতাম। এমনভাবে বসতাম, যাতে কেউ দেখা করতে এলেও অন্তত পাঁচ মিনিট তাকে হাঁটতে হয়। তখন আমাদের দেশে এত কোলাহল ছিল না। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলোÑ বৈজ্ঞানিক ভাবনা ও ধারণার সঙ্গে ছোটবেলার সেই ইমোশনকে একত্রে জীবনে চালিত করতে পেরেছি। এটিই আমার জীবনের ব্যর্থতা, সফলতা বা সর্বনাশা এই পথের সূচনাকাল। নিজেদের জ্ঞানের উচ্চতর পর্যায়ের অনুসন্ধানে ব্যাপৃত রাখার চেষ্টা আমরা করেছি। টুটুল সংগীত নিয়ে, সাহাবুুদ্দিন নিউরোলজি ও আমি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে নতুন উদ্যমে পড়ালেখা শুরু করলাম। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের গ্রন্থাগার, ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান কালচারাল সেন্টার গ্রন্থাগার, জার্মান কালচারাল সেন্টার লাইব্রেরির সদস্য হয়েছিলাম। প্রতি ১৫ দিনে যেতাম, ১৫ থেকে ২০টি বই নিয়ে ফিরে আসতাম। তখনো বিশ্বের মানুষ গ্রন্থাগারকে গুরুত্ব দিত। এখন না দেওয়াটা আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগে। তবে সবাই বলেন, ইন্টারনেট তো আছে। একে আমার অধঃপতন মনে হয়। জার্মান লাইব্রেরিতে যাওয়ায় ১৯৮৬-’৮৭ সালে শিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। একত্রে মোজার্টের ম্যাজিক ফ্লুট, নাইন সিম্ফনি শুনেছি। আমিই পছন্দ করেছিলাম। তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। প্রথমে তো এই মহান শিল্পীকে চিনতাম না। লাইব্রেরিয়ান বললেন, তিনি সুলতান! চমকে গিয়েছি, আলোড়িত হয়েছি। সেই সময় তিনি স্বাস্থ্যবান কৃষকের ছবি এঁকে চলেছেন। তার ছবি আঁকার বেশ কিছু দৃশ্যও দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সংগীত, কৃষকদের নিয়ে তার কাজ, কথা মনে হলে আমার মধ্যে আচ্ছন্নতা তৈরি হয়- পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানীরা ছিলেন কৃষক, নাবিক ও তাঁতিদের সন্তান।
পেশাদার বিজ্ঞান বক্তার এই জীবন?
পেশাগতভাবে বিজ্ঞান বক্তৃতা শুরুর পর আমার কাছে আসা মানুষের মধ্যে স্কুলছাত্র থেকে আরম্ভ করে মসজিদের ইমাম সাহেবÑ সবাই ছিলেন। বয়ঃসন্ধির কিশোররাও আমার কাছে আসত; বলত, তারা এখন কী করবে? আমি তাদের পাশে দাঁড়ালাম। অসাধারণ সব অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই কাজগুলোর মাধ্যমেই আমার দৃষ্টি প্রসারিত হয়েছে। দেখেছি, বিকাশমান জীবনের উজ্জ্বল আলোকমালা। পেশাদার বিজ্ঞান বক্তৃতায় প্রথম যে দুজন এসেছিল, তারা এসএম জিয়া হায়দার ও নাজমুল সালেহীন সমিত। জিয়া ও সমিতই প্রথম বলেছিলÑ আসিফ ভাই, আপনি কাজ শুরু করুন। আমরা পাশে আছি। ২৩ শ বছর ধরে পৃথিবীকে নাড়া দেওয়া ইউক্লিডের জ্যামিতি ও তার ত্রুটি নিয়ে আমরা বসেছিলাম। ১৯৯২ সালের ১৯ মে পেশাদার বিজ্ঞান বক্তৃতার কাজ এভাবে শুরু হলো। প্রথম সম্মানী ছিল ৩০ টাকা। এরপর আমার কাছে অনেকেই এলেন। তাদের মধ্যে খালেদা ইয়াসমিন ইতি, ইকবাল প্রধান সুমন, মামুন, শরীফ উদ্দিন সবুজ, ফরহাদ আহমেদ জেনিথ, আনোয়ারুল ইসলাম মিটুলসহ অনেকেই ছিলেন। সমিত মায়ের অনুমতি নিয়ে টানা অনেকদিন জ্যামিতি নিয়ে ডিসকাশনগুলো করেছিল। বহির্জাগতিক প্রাণ আছে কি না এই বিষয়ে আলোচনা ‘দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধানে’; ‘কসমিক ক্যালেন্ডার’ (মহাজাগতিক বর্ষপঞ্জি) ভীষণভাবে ক্লিক করল। প্রত্যেকেই আগ্রহী হলেনÑ এর পরের ডিসকাশন কবে হবে? স্কুল, কলেজ ও সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্তরাও আমাদের আলোচনায় আসতেন। দুইজন থেকে ডিসকাশন প্রজেক্টকে আটজনে নিয়ে আসতে আমার একটি বছর লেগেছে। ৪৫ জনে আনতে আড়াই বছর সময় লেগেছে। ১৯৯২ সাল থেকে আজ ২০১৯ সাল পর্যন্ত দর্শনির বিনিময়ে আমি ৬০ হাজার শ্রোতার মুখোমুখি হয়েছি।
(২০ মে, ২০১৯, আজিজ সুপার মার্কেট, ঢাকা)

