দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১২টি গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আশুড়ার বিলে কয়েক হাজার পরিবারের ধান চাষ বন্ধ করে ক্রস ড্যাম নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
ক্রস ড্যাম নির্মাণের প্রতিবাদে রবিবার দুপুরে নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপঞ্জ ইউনিয়নের প্রায় ৭ শতাধিক মানুষ আশুড়ার বিলে মানববন্ধন করে।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘আশুড়ার বিলে ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা হলে ব্যক্তি মালিকানার জমিও সেখানে তলিয়ে যাবে। এ ছাড়া আশুড়ার বিলে প্রায় ছয় হাজার পরিবার ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বিলের মধ্যে ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা হলে প্রায় ছয় হাজার পরিবারের ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ অনাহারে দিন কাটাবে।
গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদারা যুদ্ধের আগে আশুড়ার বিলের চারপাশে বসতি স্থাপন করে। বিলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ধান চাষ হয়। আমরা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ এই ধানের ওপর দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করি। তিনি বলেন, এখানে ক্রস ড্যাম নির্মাণ করে মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানে মাছ চাষ করলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’
নবাবগঞ্জের আশুড়ার বিলটি মূলত হরিপুর মৌজার খলিসপাড়া, কাইদাঘোনা, লোটোপাড়া, ফুলছড়ি, তালতলা, বাসটেক, বুড়ি মণ্ডপ, কামারপাড়া, দ্বীপপাড়া, বস্তাপাড়া,পীরদাও, সেনাজুড়ি, নেটাশন পাড়া, রাজবাড়ী, গোয়াল পাড়া, রামভদ্রপুর এলাকা ছাড়াও আরও কয়েকটি গ্রামের মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় এই আশুড়ার বিলে ধান চাষ করে।
এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক বরাবর ক্রস ড্যাম নির্মাণ বন্ধের দাবিতে অভিযোগ দিলেও বন্ধ হয়নি ক্রস ড্যামের কাজ। ক্রস ড্যাম বন্ধকরণ বিষয়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রেভিনিউ কালেক্টরেট) সাথি দাস স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে দেখা যায়, ক্রস ড্যাম নির্মাণ কাজ বন্ধের বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি অনুলিপি পত্র পাঠান।
জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘আশুড়ার বিলে সরকারি জমিতে ক্রস ড্যাম নির্মাণ করে পর্যটন কেন্দ্র করা হচ্ছে। ক্রস ড্যাম নির্মাণের কাজটি বিএডিসি করছে। এখানে দেশীয় মাছ, শাপলা ফুল, বিলের পাশেই শাল বাগান এসব কিছুই এই এলাকার চিত্র পাল্টে দিবে।
ধান চাষ করে কয়েক হাজার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে ধান চাষ করে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন সম্ভব তার থেকে যদি এই বিলটিকে পর্যটন কেন্দ্র করে দেওয়া হয় তাহলে বেশি লাভ হবে। যারা বর্তমানে জমিগুলো চাষাবাদ করছেন তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো সরকারি জমি। সরকারি জমিতে সরকার ক্রস ড্যাম নির্মাণ করে পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করছে।’
কাজ বন্ধ করার বিষয়ে তিনি চিঠি পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘একটি চিঠি পেয়েছি। এবিষয়ে এখনও পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও বিষয়টি দেখবেন বলে তিনি জানান।’
বিএডিসি দিনাজপুর রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) সৈয়দা সাদিয়া জামাল বলেন, ‘এই প্রকল্পটি বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের আওতায়। নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাদের কাছে চাহিদাপত্র দিয়েছিলেন, প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মহোদয়সহ আমরা সরেজমিনে দেখেই সেখানে ক্রস ড্যাম নির্মাণে অনুমোদন দিয়েছি। তিনি বলেন, এটি মূলত বগুড়া অফিসের দায়িত্বে আছে। আমরা শুধু দেখাশোনা করি।
তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড দিনাজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফইজুর রহমান বলেন, ‘আমাকে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কয়েকবার এই বিলে ক্রস ড্যাম নির্মাণে বিষয়ে বলেছিলেন। কিন্তু আমি এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেইনি। সেখানে ক্রস ড্যাম নির্মাণের কাজ হচ্ছে এটা আমরা জানিও না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এত বড় বিলে ক্রস ড্যাম নির্মাণ করাটা ঠিক হবে না। আমি বিষয়টি সচিব মহোদয়কে জানিয়েছিলাম, তিনি এসে দেখেও গেছেন। তবে আজকে শুনলাম ওখানে ক্রস ড্যাম নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।’
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বলেন, প্রায় দেড় দুই মাস পূর্বে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হচ্ছে। তবে নকশার পরিবর্তন অনুযায়ী ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় এমপির চাহিদাপত্র অনুযায়ী আমরা কাজটি করছি।’
