ঢাবিতে টর্চার সেল নেই: বিবৃতির স্বাক্ষরকারীই জানেন না

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১৩ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে মারা যাওয়ার পর থেকে আলোচনায় আসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং হলে হলে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের ‘টর্চার সেল’ এর বিষয়টি। ইতোমধ্যে অনুসন্ধান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম।

বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর বিপাকে পড়ে যায় ছাত্রলীগ। দায় এড়ানোর জন্য ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় আবাসিক হলে ‘টর্চার সেল’ নেই এমন বিবৃতি দিয়েছে ঢাবির সাতটি হল সংসদ।

এসব হলের ছাত্র প্রতিনিধিদের সবাই ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন অথবা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো- হল সংসদের বিবৃতিতে অনেকের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। 

ছাত্রলীগের নির্দেশনার পর বিভিন্ন হল এ সংক্রান্ত বিবৃতি দিতে শুরু করে। এসব বিবৃতিতে ‘টর্চার সেল’ নেই উল্লেখ করা হলেও ‘গেস্টরুম’-এ শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। পাশাপাশি কেউ কোনো নির্যাতনের শিকার হলে হল প্রশাসন ও হল সংসদকে অবহিত করার আহ্বানও ছিল সেসব বিবৃতিতে।

এসব বিবৃতিতে যাদের স্বাক্ষর রয়েছে তাদের অনেকের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের এলাকা ও হলের ক্যানটিনে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বিবৃতিতে যাদের স্বাক্ষর রয়েছে তাদের কয়েকজন পূজার ছুটিতে বাড়িতে অবস্থান করছেন, যারা বিবৃতির বিষয়ে কিছুই জানেন না।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়- সূর্যসেন হল সংসদের বহিরঙ্গণ ও অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া সম্পাদক, বিজয় একাত্তর হল সংসদের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া সম্পাদক, জসিম উদ্দীন হল সংসদের সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে বিবৃতি দেয়া হয়েছে।

সূর্যসেন হল সংসদের বহিরঙ্গণ ক্রীড়া সম্পাদক মো. জুলহাস সুজন বলেন, আমি গত দশদিন ধরে বাড়িতে। টর্চার সেল সম্পর্কিত হল সংসদের কোনো বিবৃতি সম্পর্কে জানেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সম্পর্কিত কোনো বিবৃতি সম্পর্কে আমি জানি না। আর আমার স্বাক্ষর কে দিয়েছে সেটা সম্পর্কেও অবগত নই।

একই হল সংসদের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া সম্পাদক সাব্বির হাসান সৌরভ বলেন, আমি গত ৭ অক্টোবর বাড়িতে এসেছি। এখনও বাড়িতে অবস্থান করছি।

এ বিষয়ে সূর্যসেন হল সংসদের ভিপি মারিয়াম জামান খান সোহান বলেন, এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। হল সংসদের সকল সম্পাদক এবং সদস্য থেকে স্বাক্ষর সাধারণত জিএস নিয়ে থাকে। তবে বিবৃতিটি তড়িঘড়ি করে দেয়ার কারণে স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজটি হলের পিয়নদের দিয়ে করানো হয়েছে। তারাই এটি সংগ্রহ করেছে। তবে আমি জানি হল সংসদের সকলে এই বিষয়ে একমত। কেউ ভিন্নমত পোষণ করার কথা না।

বিজয় একাত্তর হল সংসদের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া সম্পাদক মো. সুজন শেখ বলেন, পূজার বন্ধে বাড়িতে আসার পর আমার আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই গত ১০ দিন যাবত হল সংসদের কোন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমার জানা নেই। এর মধ্যে কোন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাকলেও এ ব্যাপারে আমি জানি না।

স্বাক্ষরের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। হল সংসদের কেউ হয়তো দিয়ে থাকবে।

জসিম উদ্দীন হল সংসদের সদস্য আহসানুল হক শিমুলকে কোথায় আছেন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, পূজার ছুটিতে আমি বাড়ি এসেছি। স্বাক্ষরের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।  

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৮টি আলোচিত নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে ভুক্তভোগী দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর হল ছাড়তে হয়েছে।

‘ছাত্রদল-শিবির’ করার অভিযোগে এদের অধিকাংশকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে তাদের অনেককে থানা থেকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অনেকে আবার বিভিন্ন মামলায় জেলে গিয়েছেন। গ্রুপিংয়ের কারণে স্যার এএফ রহমান হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্রলীগের পদধারী নেতাকেও ‘ছাত্রদল-শিবির’ অভিযোগে পিটিয়ে হলছাড়া করার অভিযোগ রয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে ৬ শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতনের শিকার হন, ১০ এপ্রিল একই হলে ৮ শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হন, ১২ জুন মধুর ক্যানটিনে ১ জন, ২৩ জুলাই স্যার এএফ রহমান হলে ৩ জন ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ৩ জন, ১৬ জুলাই হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ১ জন, ২৫ আগস্ট কবি জসীমউদ্দীন হলে ১ জন, ৬ সেপ্টেম্বর হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৩ জন, ১ অক্টোবর মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ১ জন, ২০ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হলে ১ জন, ২৫ অক্টোবর মধুর ক্যানটিনে ২ জন, ২৬ নভেম্বর মুহসীন হলে ১ জন, ১১ ডিসেম্বর এসএম হলে ৪ জন, ১৬ ডিসেম্বর একই হলে আরও ৪ জন, ২১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ১ জন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হন।

গত ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ৫ জন ও কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ১ জন, ৩ মার্চ অমর একুশে হলের সামনে ৪ জন, ৫ মে কলাভবনের সামনে ৩ জন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ১ জন, ২০ অক্টোবর স্যার এএফ রহমান হলে ৮ জন নির্যাতনের শিকার হন।

২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জহুরুল হক হলে ৭ জন, ৪ ফেব্রুয়ারি একই হলে ১ জন এবং ফজলুল হক মুসলিম (এফএইচ) হলে ১ জন, ২১ ফেব্রুয়ারি এসএম হলে ২ জন, ২ আগস্ট বিজয় একাত্তর হলে ৩ জন নির্যাতনের শিকার হন।

২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চারু কলায় ১ জন, ১ মার্চ এসএম হলে ১ জন, ২২ অক্টোবর একই হলে ২ জন শিক্ষার্থী নির্যাতিত হন। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই জিয়াউর রহমান হলে ২ জন, ১০ আগস্ট এসএম হলে ১ জন, ১২ আগস্ট বিজয় একাত্তর হলে ১ জন ও জিয়াউর রহমান হলে ১ জন, ১৭ আগস্ট মুহসীন হলে ৫ জন, ১১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ১ জন এবং ২৪ অক্টোবর টিএসসিতে ১ জন নির্যাতনের শিকার হন।

২০১৮ সালে ছাত্রলীগ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হন- ১৬ জানুয়ারি বিজয় একাত্তর হলে ১ জন, ৬ ফেব্রুয়ারি এসএম হলে ১ জন, ২৭ ফেব্রুয়ারি বিজয় একাত্তর হলে ১ জন, ১ মার্চ ফুলার রোডে ১ জন, ৮ মার্চ এফএইচ হলে ১ জন, ২৩ মার্চ বিজয় একাত্তর হলে ২ জন, ২৪ মার্চ স্যার এএফ রহমান হলে ১ জন, ১০ এপ্রিল কবি সুফিয়া কামাল হলে ১ জন, ২৪ মে জিয়াউর রহমান হলের গেস্টরুমে অন্তত ৩ জন, ৬ আগস্ট এফএইচ হলে ৬ জন, ৩০ সেপ্টেম্বর এসএম হলে ২ জন, ১০ অক্টোবর মুহসীন হলে ১ জন, ২৫ অক্টোবর টিএসসিতে ২ জন, ১ নভেম্বর টিএসসিতে ১ জন, ২১ নভেম্বর এসএম হলে ১ জন, ২৩ ডিসেম্বর বিজয় একাত্তর হলে ১ জন, ২৪ ডিসেম্বর জহুরুল হক হলে ১ জন। চলতি বছর ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হন- ৩০ জানুয়ারি মল চত্বরে ১ জন, ১ মার্চ এসএম হলে ১ জন, ২২ এপ্রিল বিজয় একাত্তর হলে ১ জন, ১৩ জুলাই জিয়াউর রহমান হলের গেস্টরুমে ২৫ জনকে মারধর ও গালাগালের ঘটনা ঘটে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব ঘটনার বাইরেও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী হয়রানির খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিট দখলের মাধ্যমে হলে আধিপত্য বিস্তার করেই এ ধরনের অন্যায় কাজে জড়াচ্ছে ছাত্রলীগ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত