চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

একটি হত্যার অমীমাংসিত বিচার এবং সেই সিরাজ উদ দৌলা

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:১৮ এএম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রক্টর থাকাকালীন অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে উঠেছিল ছাত্র হত্যায় মদদ দেওয়ার অভিযোগ। ছাত্রলীগের মধ্যে গ্রুপিং বাঁধিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এর আগে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে নানা অনিয়মে অভিযুক্ত প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলার পদত্যাগের দাবিতে দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে রেখেছিল ছাত্রলীগ।

২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ছাত্রলীগকর্মী ও শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক গ্রুপ সিএফসির তাপস সরকারকে চবি শাহ আমানত হলে গুলি করে হত্যা করে শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক আরেক গ্রুপের নেতাকর্মীরা।

অভিযোগ আছে, তৎকালীন প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলা ছিলেন ওই গ্রুপের নিয়ন্ত্রক।

এ ঘটনার পর প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে ছাত্রলীগ। ওই দিন উপাচার্য দপ্তরে ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করে তারা।

সেই বহুল বিতর্কিত শিক্ষক সিরাজ উদ দৌলা এবার হয়েছেন ছাত্র উপদেষ্টা।

ছাত্রলীগের একাংশের অভিযোগ নিয়োগ পাওয়ার পর ক্যাম্পাসে আধিপত্য কায়েমে তিনি আবার তার অংশের ছাত্রলীগকে দিয়ে মারধর ও সংঘাতের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। যাদের একজন তাপস হত্যায় অভিযুক্ত ‌ভিএক্স গ্রু‌পের নেতা মিজানুর রহমান বিপুল ও প্রদীপ চক্রবর্তী দূর্জয়। দুজনই তাপস সরকার হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি।

সিরাজ উদ দৌলা ছাত্র উপদেষ্টা হওয়ার পর তাদের অনুসারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ শাখা সভাপতির পক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

সর্বশেষ রবিবার সন্ধ্যায় সভাপতি পক্ষের দুই নেতাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এর সূত্র ধরে দুই পক্ষ ক্যাম্পাসে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। 

সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের পক্ষের ছাত্রলীগের অভিযোগ, ১৪ ডিসেম্বর তাপস হত্যার বার্ষিকী পালন বানচাল করতে সিরাজ উদ দৌলা তার বাহিনী দিয়ে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করতে চাইছে।

তবে মিজানুর রহমান বিপুল উল্টো ছাত্রলীগ সভাপতির পদত্যাগ চাইছেন। 

দুপক্ষের লাগাতার সংঘর্ষের জেরে রোববার থেকে থেকে সিরাজ উদ দৌলার পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে পু‌রো ক্যাম্পাস। সোমবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ ঘোষণা করে শাখা ছাত্রলীগের একাংশ।

ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার থেকে চলা শাখা ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ ও শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক সিএফসি গ্রুপের দুই নেতাকে মারধরের ঘটনায় রোববার সন্ধ্যা থেকে সিরাজ উদ দৌলাকে তাপস সরকার হত্যার মদদদাতা হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে মিছিল করে সভাপতির অনুসারী সিএফসি গ্রু‌পের কর্মীরা। গ্রুপটি চট্টগ্রা‌ম নগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত।

তারা ব‌লেন, ২০১৪ সালে প্রক্টর থাকাকালে সিরাজ উদ দৌলার প্রত্যক্ষ মদদে ছাত্রলীগকর্মী তাপসকে খুন করা হয়। ওই সিরাজকে বর্তমান প্রশাসন ছাত্র উপদেষ্টার পদে বসানোর পর থেকে আবারো তাপসের খুনীরা বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে। র‌বিবার  সিরাজ উদ দৌলার অনুসারী বিপুল ও দূর্জয়ের নের্তৃত্বে দুই ছাত্রলীগ নেতা নৃশংস হামলা চালিয়েছে।

ছাত্রলীগের এ অংশ সিরজ উদ দৌলার পদত্যাগ বা অপসারণসহ চার্জশিটভুক্ত তাপস সরকার হত্যা মামলার আসামি এবং হামলাকারী‌দের গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে রাখবেন বলে ঘোষণা দেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, রবিবার রাত ৮টার দিকে বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের শাহ আমানত হলের সামনে ছাত্রলীগের কয়েক শ নেতাকর্মী জড়ো হয়ে সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। ‘এক দফা এক দাবি সিরাজ তুই কবে যাবি’, ‘সিরাজের চামড়া তুলে নেব আমরা’, ‘গেলি কই গেলি, সিরাজ তুই গেলি কই’, ‘তাপসের খুনি সিরাজ, বিচার চাই বিচার চাই’সহ নানা স্লোগান তুলে মিছিল করেন।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জানান, বৃহস্প‌তিবার থে‌কে চলমান শাখা ছাত্রলী‌গের সভাপ‌তি রেজাউল হক রু‌বেল ও সিএফ‌সি গ্রু‌পের অনুসা‌রী এবং সা‌বেক উপদপ্তর সম্পাদক মিজানুর রহমান বিপু‌ল ও ভিএক্স গ্রুপের অনুসা‌রী‌দের ম‌ধ্যে অধিপত্য বিস্তার‌কে কেন্দ্র করে চলা সংঘ‌র্ষের জে‌রে র‌বিবার সন্ধ্যায় এ মারধরের ঘটনা ঘটে।

তারা জানান, প‌রে সন্ধ্যা ৭টার দিকে নি‌জে‌দের নেতাদের মারধ‌রের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হ‌য়ে শাহ আমানত হ‌লে থাকা সিএফ‌সি এবং সোহরাওয়ার্দী হ‌লে থাকা ভিএক্স গ্রু‌পের কর্মীরা রামদা, লোহার রড, পাইপ ও দেশীয় অস্ত্রসহ মহড়া দেয়। এতে উভয়প‌ক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং ইটপাট‌কেল নি‌ক্ষেপ শুরু হয়। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যাল‌য়ের জি‌রো প‌য়েন্টে থাকা চ‌বি প্রক্টর এবং চট্টগ্রাম জেলা (উত্তর) পু‌লি‌শের অ‌তি‌রিক্ত পু‌লিশ সুপারের গাড়িসহ পাঁচ‌টি গাড়ি ভাংচুর ক‌রে তারা। প‌রে প‌রি‌স্থি‌তি নিয়ন্ত্রণে আনতে পু‌লিশ চার রাউন্ড টিয়ার‌শেল ও জলকামান নি‌ক্ষেপ ক‌রে।

তারা আরো জানান, সিএফ‌সি গ্রু‌পের নেতাকর্মীরা শাহজালাল হ‌লের সাম‌নে টায়ারে আগুন জ্বা‌লি‌য়ে রাস্তা অব‌রোধ ক‌রে। তারা সংঘ‌র্ষে মদদদাতা হিসেবে চ‌বির ছাত্র উপ‌দেষ্টা অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলার নামে অভিযোগ জানিয়ে তার পদত্যাগ, মারধরকারী‌দের বিচার এবং ভিএক্স গ্রু‌পের নেতা বিপুল ও প্রদীপ চক্রবর্তী দূর্জ‌য়ের শা‌স্তির দাবি‌তে মি‌ছিল ক‌রেন।

ক্যাম্পাসজুড়ে চলমান উ‌ত্তেজনায় নিরাপত্তাজ‌নিত কার‌ণে রেলও‌য়ে কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম থে‌কে বিশ্ববিদ্যালয়গামী রাত সা‌ড়ে ৮টার শাটল ট্রেন বন্ধ ক‌রে দি‌য়ে‌ছে ব‌লে জা‌নি‌য়ে‌ছেন চট্টগ্রাম ষোলশহর স্টেশন মাস্টার তম্মন চৌধুরী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা তাপস হত্যার মদদদাতা সিরাজ উদ দৌলার প্রত্যক্ষ মদদে ও তাপস হত্যার আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আমাদের দুই নেতার ওপর হামলা চালিয়েছে। হামলাকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে। আমা‌দের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় অব‌রো‌ধের ডাক‌ দি‌চ্ছি।

ত‌বে অ‌ভি‌যোগ অস্বীকার ক‌রে ভিএক্স গ্রু‌পের নেতা বিপুল ব‌লেন, এই ঘটনা কে বা কারা ক‌রে‌ছে আমরা জা‌নি না। ত‌বে গত দুদি‌নের ঘটনায় সভাপ‌তি রু‌বে‌লের ব‌হিষ্কা‌রের জন্য ১২ ঘন্টার অ‌ল্টি‌মেটাম দি‌চ্ছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত