সবচেয়ে ঠান্ডা রাতেও দিল্লির রাস্তায় বিক্ষুব্ধ নারীরা

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২০, ০৯:৩৭ এএম

দিল্লিতে একশো বছরের মধ্যে সবচেয়ে ঠান্ডা রাত ছিল ৩১ ডিসেম্বর। কিন্তু বৈরী প্রকৃতি নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ)-বিরোধী শাহিনবাগের নারীদের দমাতে পারেনি। নতুন বছরের সূচনা হয় যখন, তখনো তারা ভারতের জাতীয় সংগীত গাইছিলেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ ডিসেম্বর থেকে মোটা কম্বল, হাতে গরম চায়ের মগ আর প্রতিরোধের গান গেয়ে গেয়ে সড়কে তাঁবুর নিচে অবস্থান নিয়েছিলেন তারা।

আন্দোলনকারীদের একজন ফিরদাউস শাফিক বলেন, “আমি খুব কমই একা বাসার বাইরে বের হয়েছি। সব সময়ে আমার ছেলে বা স্বামী সঙ্গে থেকেছে, এমনকি যখন আমি কাছাকাছি মার্কেটেও গিয়েছি। সুতরাং প্রথম এখানে যখন এলাম, সেটা একটু কষ্টকরই ছিল। কিন্তু আমি এটা বোধ করছিলাম যে, আমার প্রতিবাদ করা উচিত।”

দিল্লি-ভিত্তিক মুসলমান নারী ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সায়েদা হামিদ জানান, এই নারীরা অ্যাকটিভিস্ট নন। তারা সাধারণ মুসলমান নারী। তাদের অনেকেই গৃহিণী, যারা এই আন্দোলনের একেবারে মাঝে দাঁড়িয়ে গেছেন।

তিনি বলেন, “এই প্রথমবারের মতো তারা জাতীয় কোন ইস্যুতে সামনে এগিয়ে এলেন, যা ধর্মীয় বাধা ভেঙে দিয়েছে। আমি মনে করি এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এর সঙ্গে মুসলমানদের শিকার বানানোর একটা বিষয় জড়িত আছে, কিন্তু তারপরেও ইস্যুটি আসলে উদার দৃষ্টিভঙ্গির একটা বিষয়।”

তারা প্রথম বাইরে বেরিয়ে আসেন ১৫ ডিসেম্বর রাতে, যে দিন দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ পুলিশের সঙ্গে সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, পরে পুলিশ অনুমতি ছাড়াই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করেছে। ওই রাতের পর বিক্ষোভ সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।

১১ ডিসেম্বর থেকে সিএএ কার্যকর হয়, যেখানে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার বলছে, এ আইন সেসব দেশ থেকে পালিয়ে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেবে।

কিন্তু সরকারি এসব বক্তব্য ভারতীয় মুসলমানদের কমই আশ্বস্ত করতে পারছে, অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, আইনটি তাদের জন্য বৈষম্যমূলক হবে। এমনকি হয়তো তাদেরকে সেসব দেশে ফেরত পাঠানো বা আটক কেন্দ্রে পাঠানোর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

নাগরিক তালিকা বা এনআরসি নিয়েও বিক্ষোভকারীদের মতামত রয়েছে। তাদের মতে, এর কারণে বাসিন্দাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হয়। কিন্তু অমুসলিমদের কাগজপত্র না থাকলেও তারা অন্য দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে নিজেদের দাবি করতে পারবেন। কিন্তু কাগজপত্র না থাকলে একজন মুসলমান সেই সুযোগ পাবেন না। ফলে তাকে আটক করা হতে পারে বা অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে।

তবে ভারত সরকার বলছে এখনই দেশজুড়ে এনআরসির কোন পরিকল্পনা নেই, কিন্তু বিক্ষোভ চলছে। অনেক নারী এই আন্দোলনে এতটাই নিবেদিত যে, তারা তাদের কাজকর্মও বাদ দিয়ে দিয়েছেন।

দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন রিজওয়ানা বানি। তিনি বলেন, এখানে দিন-রাত থাকার কারণে তার আয় রোজগার হচ্ছে না, কিন্তু তিনি তার চেয়েও বেশি ভয় পাচ্ছেন আইনটি তার নিজের এবং পরিবারের কতটা ক্ষতি করতে পারে, সে জন্য।

রিজওয়ানা বলেন, “আমরা জানি না কোথায় এবং কার কাছে ওসব কাগজপত্র পাওয়া যাবে, যা আমাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে। শুধুমাত্র ধর্মের কারণে আমাদের আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। আমরা তো আসলে প্রথমে ভারতীয়, তারপরে হিন্দু অথবা মুসলমান।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হুমাইরা সায়েদ বলছেন, “আইনটি সংবিধানের লঙ্ঘন। এটার মাধ্যমে হয়তো এখন মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, কিন্তু আমরা নিশ্চিত, পর্যায়ক্রমে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদেরও লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে।”

এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন সব বয়সী নারী। তাদের মতে, মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু করে এই আইনটিকে তারা দেখছেন, কিন্তু এটা আসলে সবার জন্যই হুমকি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত