মদিনার আল-কোরআন জাদুঘর

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:৩০ এএম

মদিনার ‘আল-কোরআন জাদুঘর’ সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হজ-ওমরা পালনকারীদের কাছে একটি সুপরিচিত নাম। মসজিদের নববির আঙিনায় এই ‘আল-কোরআন জাদুঘর’ অবস্থিত। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় কোরআনে কারিমের সঙ্গে গভীর ভালোবাসা স্থাপনের লক্ষ্যে মদিনার গভর্নর ড. ফায়সাল বিন সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের সহযোগিতায়, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অনুদানে এবং স্থানীয় বহুমুখী প্রতিষ্ঠান সামায়া হো. কোম্পানির পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় কোরআনের এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

মসজিদে নববির দক্ষিণ পাশের ৫ নম্বর গেটসংলগ্ন ৩ এবং ৪ নম্বর কার পার্কিংয়ের পেছনে জাদুঘরটির অবস্থান। ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মদিনার গভর্নর এটি উদ্বোধন করেন। এর পরদিন থেকে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

আধুনিক জাদুঘরের আদলে, নতুন ধারায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের প্রকৃত পরিচয় মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রদর্শনীর অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ছাড়া কোরআন শিক্ষা ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, কোরআনের মহত্ত্ব, গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা হয়।

জাদুঘরটিতে পবিত্র কোরআনের ইতিহাস সম্পর্কে আলোকপাত করার পাশাপাশি কোরআন সম্পর্কিত আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে দর্শনার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেয়। পাশাপাশি কোরআনের খিদমতে সৌদি আরবের অবদান সম্পর্কে মানুষকে জানানো হয়।

প্রদর্শনীর সবকিছুই আরবিতে। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। তবে দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য আরও দশটি ভাষায় অনুবাদ করে দর্শনার্থীদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এতে বাংলা ভাষাও রয়েছে।

জাদুঘরে ১৩টি সুসজ্জিত কক্ষ ও গ্যালারি রয়েছে। প্রতিটি গ্যালারিতে রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক সুন্দর সংগ্রহ ও চমৎকার আয়োজন। জাদুঘরের চমৎকার, সুসজ্জিত অভ্যর্থনাকক্ষে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানো হয়। প্রদর্শনীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হয়। সেখানে প্রদর্শনীর পরিচিতিমূলক একটি ফিল্ম ও পুরো প্রদর্শনীর দিকনির্দেশনামূলক ম্যাপ রয়েছে। দর্শনার্থীরা এগুলোর সাহায্যে প্রদর্শনী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা পেয়ে থাকেন।

এ ছাড়া নির্বাচিত ও নির্দিষ্ট আলোচক-অনুবাদক রয়েছেন। তারা দর্শনার্থীদের সবকিছু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখান। জাদুঘরটিতে একটি বিশেষ প্রদর্শনীকক্ষ রয়েছে। সেখানে সৌদি আরবের প্রাচীন যুগের বিভিন্ন উপলক্ষ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। আরও আছে ‘নাবাউল আজিম’ কক্ষ। এখানে কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। সেই সঙ্গে পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থগুলোর পরিচিতি, সারসংক্ষেপ, মহাকাশ, চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন আয়াত ও সুরার ফজিলত সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়। অতীতের বিভিন্ন বিলুপ্ত ও অভিশপ্ত সম্প্রদায়ের করুণ পরিণতি সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়।

ওহি নাজিলের সূচনাকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোরআনের লিখন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে দর্শনার্থীদের অবগত করার ব্যবস্থা রয়েছে জাদুঘরে। কোরআন লেখার বিভিন্ন উপকরণ দেখার সুযোগও রয়েছে।

জাদুঘরটিতে তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.) কর্র্তৃক লিখিত পৃথিবীর সর্বপ্রথম কোরআনের পাণ্ডুলিপি ‘মুসহাফে উসমানি’র ফটোকপি রয়েছে। এ ছাড়া আছে আব্বাসীয় ও উসমানীয় শাসনামলে লিখিত ২৭টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। প্রতিটি পাণ্ডুলিপির পাশে লেখকের নাম, লেখার সন, তারিখ, লিখন পদ্ধতি, লেখার উপকরণসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতিমূলক বর্ণনা রয়েছে। হরিণের চামড়ায় লিখিত তিনটি পুরনো পাণ্ডুলিপিও আছে। আরও আছে, উনিশ শতকের প্রসিদ্ধ লিপিকর হাফেজ উসমান আততুরকির হাতে লেখা কোরআন। তিনি জীবনে একশ ছয়টি কোরআন নিজ হাতে লিখেছেন।

জাদুঘরটির অন্যতম আকর্ষণ ৬০ পৃষ্ঠায় লিখিত কোরআনের অতি দুর্লভ একটি পাণ্ডুলিপি। পাশাপাশি রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ হস্তলিখিত কোরআনের কপি। এর ওজন ১৫৪ কেজি (প্রায় চার মণ)। দুর্লভ সংগ্রহের তালিকায় আরও রয়েছে বেশ কিছু বড় আকারের স্বর্ণাক্ষরে লিখিত কোরআন, মিসরের প্রিন্সেস আমিনা হানম কারিমা কর্র্তৃক মসজিদে নববিতে দানকৃত হাতির দাঁত, রুপা ও মূল্যবান কারুকার্যে তৈরি কোরআন দ্বারা সুসজ্জিত একটি আলমারি।

জাদুঘরের তাফসির গ্যালারি, প্যানোরমা ডিসপ্লে হল, কোরআনের খেদমতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি হল, আল-কোরআন ও পরিবার হলগুলোতেও রয়েছে শিক্ষণীয় অনেক কিছু। বাদশাহ ফাহাদ কোরআন মুদ্রণ সংস্থা সম্পর্কে জানার ব্যবস্থা রয়েছে। কিং ফাহাদ কোরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স থেকে বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন (১ কোটি ২০ লাখ) কোরআন ছাপা ও বিতরণ করা হয়। মোদ্দাকথা, কোরআন সম্পর্কে জানতে এই জাদুঘরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখে যেকোনো দর্শনার্থীর জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে।

প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত