করোনা: বেতন নেই গৃহশিক্ষকদের, ভোগান্তি চরমে

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ০২:৫৮ পিএম

কোতোয়ালি এলাকায় দুই রুমের ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন গৃহশিক্ষক রুমিতা ইসলাম। মা ও অসুস্থ বাবা এবং স্কুল ছাত্র ছোট ভাইকে নিয়ে তার টানাপোড়নের সংসার। উপার্জনকারী হিসেবে রুমিতা নগরীতে ৪টি টিউশন করান। যা পান তা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা।

এর মধ্যে করেনায় সরকার নির্দেশিত ছুটির কারণে গত মাসের শেষে দিক থেকে টিউশনে যাওয়া বন্ধ। এখন চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরু হলেও টিউশনের বাসা থেকে টাকা দেয়নি।

রুমিতা এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাড়ির মালিক বলেছে, যদি ভাড়া দিতে না পারি আগামী মাসে বাসা ছেড়ে দিতে। এদিকে বাবার ওষুধ শেষ, কেনার টাকাও নেই। এক আত্মীয় বাজার দিয়েছে তাই কোনমতে চলছি। এদিকে টিউশন থেকে কোনো ছাত্রীর বাবা টাকা দিচ্ছে না, অভিযোগ তাদের পুরো মাস পড়াইনি। মানুষ এত অমানবিক কেন?’

বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের ছেলেমেয়েদের পড়াতে নগরী এবং আশপাশের জেলা এবং মফস্বল হতে আসা ছাত্রছাত্রী এবং ফুল টাইম পেশা হিসেবে নেয়া গৃহশিক্ষকরা চরম অভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

নগরীতে প্রায় লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রী এই টিউশনের সঙ্গে জড়িত। আর নগরীর প্রায় ১০ হাজারের ওপর পরিবার চলে টিউশনের উর্পাজনে। অনেক নারী-পুরুষ সরাসরি টিউশনকে পেশাকে হিসেবে নিয়েছেন।

বক্সিরহাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নেছার ৭ বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তার শেষ করেই টিউশনকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমি চাকরি করি না ৬টা টিউশন করি সপ্তাহে বিভিন্ন সময় নির্ধারণ করে। একটা টিউশনের বাসা থেকেও টাকা দেয়নি। ফোন দিয়েছিলাম ৩ শিক্ষার্থীর অভিভাবক কল ধরেনি। অপর দুইজন আজ দিচ্ছি-কাল দিচ্ছি বলে আমাকে ঘুরাচ্ছে। অথচ তারা জানে এই টিউশন করে সংসারের খরচ মেটায়।

এদিকে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন মফস্বল শহর থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজের খরচ মেটানোর তাগিদে ছাত্র-ছাত্রীদের বাসায় গিয়ে টিউশন করান। অভিভাবকের কাছ থেকে আনা এসব সম্মানী মাসিক খরচে ব্যয় করেন।

এসব শিক্ষার্থীরা নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর, নিউমার্কেট, আলকরণ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মেসভাড়া করে থাকেন। যারা ছাত্রছাত্রী বাসায় গিয়ে পড়ানোর বিনিময়ে মাসের বেতন পেলেই ভাড়া পরিশোধ করতে পারেন। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা মতে গত ২৬ মার্চ থেকে ছুটি শুরু হওয়ায় এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী জনগণকে বাসা থেকে বের না হওয়ার নির্দেশনায় গৃহশিক্ষকরা চাইলেও ছাত্রছাত্রীদের বাসায় যেতে পারেননি।

আবার অনেকে গৃহশিক্ষককে নিজ থেকেই বাসায় ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সুরক্ষার জন্য আসতে নিষেধ করেন। যার ফলে ২৬ মার্চ থেকে গৃহশিক্ষকরা একপ্রকারে ঘরবন্দি।

বর্তমানে তারা অনেকে না খেয়ে জীবনযাপন করছে, পড়েছে আর্থিক সংকটে। অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ এবং কলেজ ছুটি দিয়ে দিলেও অনেক গৃহশিক্ষক গ্রামের বাড়িতে না গিয়ে টিউশনের বাসার টাকার জন্য থেকে গিয়ে পড়েছেন বিপাকে। যার ফলে এসব গৃহশিক্ষক বাসা ও মুদির দোকানির খরচ মেটাতে পারছেন না। এর মধ্যে নতুন যোগ হয়েছে কিছু অভিভাবক অমানবিক আচরণ। করোনা ছুতোয় গৃহশিক্ষককে বাদ দিয়ে দিয়েছেন কোন ধরনের বেতন ছাড়াই।

চবির ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হক বাবু বলেন, শহরে টিউশন করে নিজের পড়ালেখা এবং থাকা-খাওয়া খরচ মেটাই। গত মাসের ২২ তারিখ থেকে করোনার কারণে যাওয়া বন্ধ। তাই তারা পুরো মাসের টাকা দিবে না বলেছে ছাত্রীর বাবা।

তিনি বলেন, এই সময়ে ভিখারিও সহায়তা পেয়েছে, মরছি আমরা।

এদিকে চবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মেয়রগলিতে থাকা ইব্রাহিম ফুয়াদ বলেন, তিনমাসের টিউশনের টাকা বকেয়া। মেস ভাড়া দিতে পারিনি। টাকা পাব ভেবে বাড়িতে না গিয়ে এখন না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। এখন মুদির দোকানি ও মেস মালিক টাকা খুঁজছে, অপমান করছে।  

হালিশহর এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রিফাত ইসলাম বলেন, এখনও অফিস থেকে বেতন পাইনি। তাই গৃহশিক্ষকের বেতন দিতে পারিনি। আমাদের আয় না হলে ব্যয় কিভাবে করব। বড়লোকেরা এসব করে আমরা মধ্যবিত্তরা টিউশনের টাকা দিয়ে দিই।

গৃহশিক্ষকদের সম্মানী না দেয়াটা অমানবিক উল্লেখ করে বাকলিয়া সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই দুর্যোগে মানবিক দিক বিবেচনা করে গৃহশিক্ষকদের বেতন দিয়ে দেয়া উচিত। অভিভাবকদের ভাবা উচিত এসব ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের সন্তানের মতো। সারাবছর তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান করছে। রোদ বৃষ্টিঝড়ে সন্তানদের পড়াতে আসে। এই বেতন দিয়ে অনেকের সংসার চলে।

তিনি আরও বলেন, ইচ্ছে করে তো টিউশনে না গিয়ে থাকেনি গৃহশিক্ষকরা। এই সময়ে মানুষ যেখানে তাদের প্রাপ্যের চেয়ে বেশি পাচ্ছে সেখানে গৃহশিক্ষকদের পুরো মাসের টাকা না দেয়াটা খুব বিশ্রী। চট্টগ্রামে হাজার হাজার পরিবার আছে সরাসরি বাসায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ায়।

এদিকে চট্টগ্রামের সমাজকর্মী আতিকুর রহমান বলেন, মানুষের এই দুর্যোগে সামাজিক মূল্যবোধটা সমুন্নত না থাকলে এই পরিস্থিতে না খেতে পেয়ে মানুষ মারা যাবে। গৃহশিক্ষকদের সাথে এমন আচরণ কাম্য নয়। সবার উচিত যাদের বাসায় গৃহশিক্ষক আছে তাদের প্রাপ্য বেতনটুকু অন্তত দিয়ে দেয়া। ভাবতে হবে তাদেরও পরিবার আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত