খাদ্য কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চালকল তালিকায় দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট : ১৬ মে ২০২০, ১১:১৬ পিএম

উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম ধান-চাতালের মোকাম পাবনার ঈশ্বরদীতে খাদ্য কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বন্ধ ও পরিত্যক্ত শতাধিক চালকল সরকারী তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, ধান ভাঙানো মিল, মিলের বয়লার অথবা চাতাল কিছুই নেই, আবার কয়েক বছর ধরে বন্ধ অথবা এখনও চালুই হয়নি এমন চালকলকেও এবার সরকারী চাল (আমন) সরবরাহ করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ঈশ্বরদীতে প্রায় শতাধিক চালকলের ক্ষেত্রে ঘটেছে এ ধরনের দুর্নীতির ঘটনা।

এসব ঘটনায় মেসার্স রেদওয়ান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান মহলদার দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে পাবনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদ নেওয়াজ শুক্রবার সারাদিন ঈশ্বরদীর ৫১টি চালকলে সরেজমিন তদন্ত করে ২০টি চাল কল পরিত্যক্ত ও বন্ধ পেয়েছেন বলে জানান।

তিনি বলেন, পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ তাকে বিষয়টি তদন্ত করতে নির্দেশ দেন। সরেজমিন তদন্তে ৫১টির মধ্যে ২০টি চালকলকে দুর্নীতির মাধ্যমে উৎকোচ নিয়ে চাল সরবরাহ করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

একাধিক মিল মালিক সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, পাবনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও স্থানীয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের যৌথ কারসাজিতে উপজেলার ৪২৫টি চালকলকে ১৫ হাজার ১৬২ মেট্রিক টন চাল (আমন) সরবরাহ করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

চালকল মালিকদের অভিযোগ, বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পাবনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইকবাল বাহার চৌধুরী এই তালিকা চূড়ান্ত করেছেন। তাকে সহযোগিতা করেছেন ঈশ্বরদী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুন এস কাইয়ুম ও সরকার দলীয় একটি সিন্ডিকেট। টন প্রতি ১০০ টাকা প্রদান না করা হলে ঈশ্বরদী খাদ্য গুদাম ও মুলাডুলি কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামে চাল সরবরাহের অনুমতিও দেন না তারা।

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এবং বন্ধ মিলকে তালিকাভুক্তি করতে গোপনে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের উৎকোচ। এই কাজ এবারই নতুন নয়, গত কয়েক বছর ধরে চক্রটি এ ধরনের অপকর্ম করে আসছে। এছাড়াও এখনো চালুই হয়নি এমন চালকলকেও এবার সরকারী চাল (আমন) সরবরাহ করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে।    

সরেজমিনে ঈশ্বরদী চাল মোকামের বিভিন্ন চালকলে গিয়ে এ অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। মানিকনগর গ্রামের মণ্ডল এগ্রোফুড নামের একটি অটো রাইস মিলের মালিক বাচ্চু মণ্ডল কয়েক বছর আগে মৃত্যুবরণ করার পর থেকে তার মিল বন্ধ রয়েছে। অথচ পরিত্যক্ত এই মিলকে ৪৩৮.৭৫০ মেট্রিক চাল সরবরাহ করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও দাশুড়িয়ার এ্যাপোলো ট্রেডার্স রাইস মিল দীর্ঘ দিন থেকে বন্ধ। মিল-চাতাল গুঁড়িয়ে সেখানে করা হয়েছে ফ্ল্যাট বাড়ি। তার নামেও ৯.৩৩০ মে. টন চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

পৌর এলাকার সাঁড়া গোপালপুরের খন্দকার রাইস মিলটি প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকলেও এবারের তালিকায় ১৪.৯৪০ মে. টন চাউল সরবরাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে। একইভাবে মুলাডুলি ইউনিয়নের শেখপাড়ার মেসার্স সাজ অটো রাইস মিল, চকনারিচারে মেসার্স খান অটো রাইস মিল এখনও চালুই হয়নি অথচ তাদের নামও তালিকাভুক্ত করে ১০২.০৬০ মে.টন করে চাল সরবরাহ করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

আবার আওতাপাড়ার সিরাজুল অ্যান্ড ব্রাদার্স অটো রাইস মিলের প্রতিদিন চাল উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ কেজির ১৬০-৭০ বস্তা অথচ এই মিলকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৬৭.৫৭০ মে.টন চাল সরবরাহ করার। সাহাপুরের মেসার্স আরাখা চাল কলসহ বেশ কয়েকটি চালকলে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, বয়লার; তাদের নামও ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ তালিকায় রাখার ব্যবস্থা করেছেন ঈশ্বরদী খাদ্য গুদামের উপ-পরিদর্শক মামুন ও সিন্ডিকেট।

এভাবে ইসলাম রাইস মিল, ভাই-বোন রাইস মিল, মণ্ডল চাউল কল, বিশ্বাস রাইস মিল, মনির হোসেন খোকন রাইস মিল, আইয়ুব আলী চাউল কল, হোসনে আরা রাইস মিল, ফরিদ রাইস মিল, মডার্ন খান রাইস মিলসহ শতাধিক চালকলের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

আবার এমন অনেক চালকল, চাতাল চালু আছে এবং চাউল বরাদ্দ পাওয়ার সকল যোগ্যতা থাকলেও তাদের নাম তালিকায় রাখা হয়নি। চালকল মালিক মিজানুর রহমান মহলদার অভিযোগ করে বলেন, গত বছর আমার চালকলের নাম তালিকায় ছিল অথচ এবার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুন এস কাইয়ুম ও একটি সিন্ডিকেটকে উৎকোচ দিতে রাজি না হওয়ায় আমার মিলের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুন এস কাইয়ুম এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সরকারী নিয়ম কানুন অনুসরণ করেই ঈশ্বরদী উপজেলায় ৪২৫টি চালকলকে চাল সরবরাহ করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে নিউজ করার দরকার নেই, দুই ভাই বসে চা খেয়ে বিষয়টির সমাধান করব।

পাবনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, সার্ভে করে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমে চালকলের তালিকা বিভাজন করা হয়েছে, এখনও চাল বরাদ্দ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি, তবে এ ধরনের অভিযোগ হলে তদন্ত করে তালিকা পরিবর্তন করা যেতে পারে।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিহাব রায়হান বলেন, সরকারের খাদ্য সংগ্রহের এই কার্যক্রমে অনিয়ম করা হলে অবশ্যই তা খতিয়ে দেখা হবে। কেউ দুর্নীতির আশ্রয় নিলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত