অ্যালান বোর্ডারের হাত ধরেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২০, ০৭:৪০ এএম

অ্যালান বোর্ডার যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আঙিনায় পা রাখেন তখন সংকটের পাঁকে তলিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট। অবসর ভেঙে বব সিম্পসন এসে হাল ধরার চেষ্টা করছেন বটে কিন্তু ক্যারি প্যাকার ঝড় থামানোর সাধ্য তারও ছিল না। এমন একজন তরুণের দরকার ছিল যে ইস্পাত-কঠিন, নাছোড় এবং লড়াকু। যে অনভিজ্ঞ দলের ভঙ্গুরতাকে পাত্তা না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে। আশির দশকে অ্যালান বোর্ডার এই কাজটাই করে দেখিয়েছিলেন।

টেস্ট অভিষেক ১৯৭৯-তে। অস্ট্রেলিয়া তখন আর এক বা দুই নাম্বার টিম নয়। অথচ আগের একশো বছর তারা তাই ছিল। পতন হতে হতে এমন মাঝারি মানের দলে রূপান্তরিত হয়েছে যে ঘরের মাঠেও পাত্তা পাচ্ছে না। অথচ বোর্ডারের ফার্স্ট ক্লাসে অভিষেকের সময়ও পরিস্থিতি ততটা খারাপ ছিল না। ক্যারি প্যাকার সিরিজের ধাক্কাতেই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের নিশ্চয়তা যুগের অবসান। পরে বোর্ডারের হাত ধরে ‘গৌরবময় অনিশ্চয়তার’ পথে যাত্রা শুরু। 

বোর্ডারের হাতে অধিনায়কত্ব আসে ১৯৮৪ সালে। কিম হিউজের তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। ২৬ নভেম্বর তিনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে গ্যাবার প্রেসমিট থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যান। আগের বছর নিজেদের দেশে কিম হিউজের অস্ট্রেলিয়াকে ৩-০ টেস্টে সিরিজ হারানো ক্লাইভ লয়েডের উইন্ডিজ ফিরতি সফরে এসে ২-০তে এগিয়ে ছিল। হিউজ ৪ ইনিংসে করেন মাত্র ৭৯। অজি মিডিয়ার একটা অংশ অনেক আগে থেকেই অধিনায়কের তীব্র সমালোচনা করছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা। দ্বিতীয় টেস্ট হয়েছিল ব্রিসবেনে। আগেই পদত্যাগের বিবৃতি লিখে রেখেছিলেন হিউজ। প্রেস বক্সে সেটাই পড়ে শোনান। যদিও শেষ করতে পারেননি। প্রথম দুই লাইন পড়ার পর কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। অধিনায়কত্বের ভার দেওয়া হয় বোর্ডারকে। নতুন ম্যানেজার হন বব সিম্পসন। এই যুগলবন্দি ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়াকে। যে সাফল্যকে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে ‘পুনরুত্থানের’ শুরু হিসেবে দেখা হয়।

অধিনায়ক হিসেবে কিম হিউজ যতটা ভঙ্গুর ছিলেন ঠিক ততটাই কঠিন ছিলেন বোর্ডার। ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি ছিলেন লৌহকঠিন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৫৬ টেস্ট খেলেছেন। ৫০ বার দল জিতেছে। ৬০টি ড্র। হার ৪৬টিতে। চারশো রানের বোঝা মাথায় নিয়ে কিংবা ১৫০ রানে পিছিয়ে থেকে বা ফলোঅন করতে নেমে ৪৮ বার সফল হয়েছেন ব্যাটসম্যান বোর্ডার। হোমগ্রাউন্ড সিডনিতে টেস্ট সেঞ্চুরি পাননি। অথচ মাদ্রাজের ঘূর্ণি পিচে তার একাধিক সেঞ্চুরি আছে। দেশে অস্ট্রেলিয়া যখন তুলনামূলক ভাবে সুস্থির অবস্থায় তখন বোর্ডারের ব্যাটিং গড় ৪৫.৯৪। বিদেশের মাটিতে দল যখন বিপদের মধ্যে প্রতিকূল অবস্থায় সংগ্রাম করছে তখন বোর্ডারের টেস্ট গড় ৫৬.৫৭। এতটাই ফিট ছিলেন যে টানা ১৫৩ টেস্ট খেলে গেছেন। মোট ১৫৬ টেস্টে ৫০.৫৬ গড়ে করেছেন ১১ হাজার ১৭৪ রান। সেঞ্চুরি ২৭। হাফ সেঞ্চুরি ৬৩। অধিনায়ক হিসেবে খেলেছেন ৯৩ টেস্ট। জিতেছেন ৩২টিতে। অধিনায়ক বোর্ডারের ব্যাটিং গড় ৫১। ৩০ বছর পর্যন্ত তার ব্যাটিং গড় ৫০.৩৫। এরপর রান করেছেন ৫০.৭৪ গড়ে।

টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন বোর্ডার। ১৯৮২-র বক্সিং ডে টেস্ট এখনো উদাহরণ হয়ে আছে। মেলবোর্নে সেদিন ইংল্যান্ড মাত্র ৩ রানে জিতেছিল। ২৯২ রান তাড়া করে শেষ জুটিতে বোর্ডার-টমসন যোগ করেন ৭০ রান। সিঙ্গেলসের ওপর ভর করে খেলছিলেন। শেষ বলে রান নিয়ে স্ট্রাইক ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত জয় থেকে ২ রান দূরে সিøপে খোঁচা দিয়ে ২১ রানে ইয়ান বোথামের বলে আউট হন টমসন। আফসোস নিয়ে ৬২ রানে অপরাজিত থেকে ফেরেন বোর্ডার।

লেফট আর্ম স্পিনার হিসেবে ভিভ রিচার্ডসের উইন্ডিজকে একাই হারিয়েছিলেন বোর্ডার। ১৯৮৯ সালে সিডনিতে তার ১১/৯৬ বোলিং ফিগারটা এখনো টেস্ট ক্রিকেটের বিস্ময় হয়ে আছে। প্রথম ইনিংসে ২৬ ওভারে ৪৬ রানে ৭ উইকেট নেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫০ রানে নেন ৪টি। অস্ট্রেলিয়া জেতে ৭ উইকেটে।

১৯৫৫’র ২৭ জুলাই জন্ম নেওয়া বোর্ডার প্রায় ১৫ বছর টেস্ট খেলেছেন। ১৯৯৪-এ তার অবসরের সময় ডগ পার্কিসনের একটা গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বোর্ডারকে নিয়ে গাওয়া সেই গানের প্রথম লাইন, ‘হোয়ার উড উই বি উইদাউট এবি’।

বড় কোনো ক্রিকেটার অবসরে গেলে শূন্যতা তৈরি হবে খুব স্বাভাবিক। বোর্ডার যাওয়ার পরেও  হয়েছিল। তবে আশির দশকের মতো তা নিয়ে ভুগতে হয়নি অস্ট্রেলিয়াকে। এই কৃতিত্বটা অ্যালান বোর্ডারের। গানটা তাকে নিয়েই ভালো মানায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত