বর্ষা মৌসুম এলেই রাজশাহীতে যৌবন ফিরে পায় পদ্মা নদী। পানি ও গতিময় স্রোতে জেগে ওঠে বছরের বাকি সময় নীরব থাকা প্রমত্তা পদ্মা। এ সময় নদীতে ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। সারি সারি ডিঙ্গি ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে ভ্রমণে বের হয় অসংখ্য মানুষ। কিন্তু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অভাব ও মাঝিদের বেপরোয়া চলাচলের কারণে মাঝে মাঝে ঘটে দুর্ঘটনা। নৌকাডুবিতে নিখোঁজসহ প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এর জন্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অদক্ষ মাঝিদেরও দায়ী করছেন কেউ কেউ। যদিও এসব দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু ক’দিন যেতে না যেতেই সব কিছুতে ঢিলেঢালা ভাব চলে আসে। এসব দেখভালের জন্য রাজশাহীতে নৌপুলিশের কার্যক্রম শুরু হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তারা পুরোটা সামাল দিতে পারছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, রাজশাহীতে বিনোদনের বিশেষ জায়গা হিসেবে ধরা হয় পদ্মা নদীর পাড়কে। পদ্মার ধারে ঘুরতে গিয়ে বাড়তি আনন্দ পেতে নৌকাভ্রমণে নেমে যান অনেকেই। মানুষকে বিনোদন দিতে বেশ কিছু নৌকাও সব সময় প্রস্তুত থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে এ বিনোদনই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের। আবার প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই নদী পার হতে গিয়েও পড়ছেন দুর্ঘটনার কবলে।
স্থানীয়রা জানান, সবশেষ গত শুক্রবার বিকেলে ঘুরতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন ১৩ নৌকাযাত্রী। এদের মধ্যে ১১জন পাড়ে উঠতে পারলেও তলিয়ে যান এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ও তার ফুপাতো ভাই। এ ছাড়া গত জুলাইয়ে পদ্মায় ঘুরতে গিয়ে নৌকা থেকে দুই যাত্রী নদীতে পড়ে যান। পরে নৌকার লোকজনই তাদের উদ্ধার করেন। একই দিন নদীতে ভ্রমণের জন্য নৌকায় উঠে ঢেউয়ে তলিয়ে যান দুই নারী। কিছুক্ষণ পর তাদের উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। তাছাড়া চলতি বছরের মার্চে রাজশাহী মহানগরীর শ্রীরামপুরে পদ্মায় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। বিয়েবাড়ি থেকে ফেরা ওই নৌকা থেকে অনেকেই সাঁতরে পাড়ে উঠলেও নববধূ সুইটি খাতুনসহ একই পরিবারের নয় জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রধান ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলাম। তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ রাখা হয়। এর মধ্যে মাছ ধরার নৌকা ও বিনোদনের নৌকা আলাদা করা, মাঝিদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, যাত্রীসংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া রয়েছে। এ ছাড়াও বাধ্যতামূলকভাবে লাইফ জ্যাকেট পরা, সন্ধ্যার পর নৌকা চলাচলে নিষেধাজ্ঞাসহ বেশ কিছু সুপারিশ আনা হলেও পরে এসবের কোনোটিরই বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
রাজশাহী নৌপুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহদী মাসুদ বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা এসব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।’ রাজশাহী নৌপুলিশের সুপার দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘সম্প্রতি আমি রাজশাহী অঞ্চলের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেছি। সবশেষ দুর্ঘটনাটির পর আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং কঠোরভাবে নিয়ম মানার নির্দেশনা দিয়েছি। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য নৌপুলিশও সচেতন থাকবে।’
এ সময় সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ পুলিশের নতুন একটি ব্রাঞ্চ। সংকট কিছুটা থাকবেই। তবে সেই সংকট কাটিয়ে উঠছি। ইতিমধ্যে আমরা নৌযান ও লোকবল পেয়ে গেছি। সামনে আরও বাড়বে। তবে সংকট থাকলেও আমাদের কার্যক্রম থেমে নেই।’
