তিন ঘণ্টার ব্যবধানে বৃহস্পতিবার ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নয়টি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় বিএনপির এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে তিনটার মধ্যে বাসগুলোতে আগুন দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
পুলিশের আশঙ্কা ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটতে পারে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাত্রীবেশে কেউ বাসগুলোতে আগুন লাগিয়ে নেমে গেছে। এর সঙ্গে জড়িতরা শনাক্তও হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
বৃহস্পতিবার দুপুরে তুরাগে একটি বাসে আগুন দেওয়ার সময় হাতেনাতে সোহেল মিয়া নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর আসামিদের নাম উল্লেখ করে মামলা হবে বলে পুলিশ জানায়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সাংবাদিকদের বলেন, আগুনের ঘটনার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। কারা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি। তবে কেন্দ্রীয় অফিস থেকে বের হওয়ার সময় ফরিদপুর বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার মাসুকুর রহমানসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল মিয়া জানিয়েছে, সুমন নামের বিএনপির এক ব্যক্তি তাকে বলে, নির্বাচনের কেন্দ্রে ককটেল নিক্ষেপ করতে হবে। সেই অনুযায়ী সে ২০০ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করে এবং কামারপাড়া এসে পরামর্শ করে ককটেল নিক্ষেপের সময় পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। সোহেল বাসে আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িত।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে নাশকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে বাসে আগুন দিয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন স্থানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ঢাকা-১৮ আসনে চলমান উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। মামলা দায়েরেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।
পুলিশের রমনা ডিভিশনের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, নাশকতার উদ্দেশ্যে একযোগে বাসগুলোতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমরা জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালাচ্ছি।
লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার বলেন, তার এলাকার মধ্যে বংশালে দুপুর আড়াইটার দিকে দিশারী পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কারা আগুন দিয়েছে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে পল্টন থানাধীন বিএনপি পার্টি অফিসের উত্তর পাশে কর অঞ্চল ১৫-তে পার্কিং করা সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দুপুর ১টার দিকে মতিঝিল থানাধীন মধুমিতা সিনেমা হলের সামনে অগ্রণী ব্যাংকের স্টাফ বাস, ১টা ২৫ মিনিটে রমনা হোটেলের সামনে চলন্ত গাড়ি ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনে, শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে দেড়টার দিকে দেওয়ান পরিবহনে, ২টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশ সচিবালয়ের উত্তর পাশে রজনীগন্ধা পরিবহন এবং বংশাল থানাধীন নয়াবাজার এলাকায় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে দিশারী পরিবহনে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে।
এরপর দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে পল্টন এলাকায় জৈনপুরী পরিবহন, ৩টায় মতিঝিল থানাধীন পূবালী পেট্রল পাম্প সংলগ্ন দোতলা বিআরটিসি বাস), ভাটারার কোকাকোলা মোড়ে ভিক্টর ক্ল্যাসিক পরিবহনে দুষ্কৃতকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রচেষ্টায় এসব বাসের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বেশিরভাগ গাড়ির অধিকাংশ পুড়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে থানা পুলিশের মোবাইল টিম এবং সিনিয়র অফিসাররা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কোনো হতাহতের সংবাদ পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্তব্যরত কর্মকর্তা রাসেল শিকদার বলেন, অগ্নিকাণ্ডের প্রথম সংবাদ আসে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে। আর দুপুর ২টা ২৮ মিনিটে নয়াবাজারে একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিকাণ্ডের শেষ খবর পেয়েছি। প্রথম আগুনের ঘটনা ঘটে শাহজাহানপুরে একটি বাসে। এরপর কাঁটাবন, মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের কাছে, গুলিস্তানে গোলাপ শাহ মাজার এলাকা, বংশালের নয়াবাজার, প্রেসক্লাবে ও ভাটারার কাছে বাসে আগুন দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস আগুন নিভিয়ে ফেলে। এর মধ্যে কাঁটাবনে বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঢাকা-১৮ আসনে সংসদীয় উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী কোনও পক্ষ নাশকতার উদ্দেশ্যে একযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসে আগুন দিয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। নাশকতাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য ইতোমধ্যে থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশসহ পুলিশের অন্যান্য ইউনিটও কাজ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি ও টহল পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
