কিম কি-দুক একজন কোরিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা হলেও তার চলচ্চিত্রগুলি নিজের দেশের বাইরে সম্ভবত বিদেশে আরও বেশি জনপ্রিয়। অন্যান্য দেশে নিজের চলচ্চিত্রগুলো বেশি মনোযোগ পাওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে কিম তার চলচ্চিত্র গুলির অন্তর্নিহিত দর্শনকে চিহ্নিত করেছেন। কিমের চলচ্চিত্রগুলিতে নির্লজ্জ এবং অস্বস্তিকর দৃশ্যের উদ্বেগহীন উপস্থিত রয়েছে এবং তিনি সিনেমার মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যথাসম্ভব বাস্তববাদী থাকার চেষ্টা করেন।
কিমের ভাষ্যে, অনেক বিদেশি সাংবাদিক আমার কাছে জানতে চান কোরিয়ার চাইতে দেশের বাইরে আমার কাজ কেন বেশি সমাদৃত হয়। আমি তাদেরকে বলি, কারণ আমার গল্পগুলি মানুষের সর্বজনীনতার ওপর ভিত্তি করে। প্রতিটি জাতি তার লোকদের নিয়েই আবর্তিত হয়, তবে আমাদের কোরিয়ানদের নিজেদের নিয়ে গর্ব বেশি, কারণ আমাদের শেখানো হয় যে আমরা অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আপনি যদি চারপাশে ভ্রমণ করেন এবং বিশ্বটি দেখতে পান তবে দেখবেন যে প্রতিটি জাতির নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রয়েছে এবং আমি এটি আমার চলচ্চিত্রগুলিতে রাখি।
কিম বলেন, কোরিয়ায় জনপ্রিয় হওয়া বেশির ভাগ চলচ্চিত্রে নিজেদের নিয়ে গর্ব ও অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি রয়েছে। তবে আমি কৌতূহল বোধ করি যদি আমরা এটিকে বাস্তব বিষয়গত মান হিসাবে বজায় রাখতে পারি। আমার চলচ্চিত্রগুলি দক্ষিণ আমেরিকা, রাশিয়া, চীন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় বা সমাদৃত হয় কারণ, আমি আমার গল্প গুলিতে মানুষের সর্বজনীনতার দিকে নজর রাখি।
কোরিয়া টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ওপরে উল্লেখিত কথাগুলো বলেছেন সদ্য প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা কিম কি দুক। কোরিয়ান এই চলচ্চিত্র নির্মাতাকে মনে করা হয় বর্তমান বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ নির্মাতা। শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ১টা ২০ এর দিকের লাটভিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
২০১৬ সালে কোরিয়া টাইমসের পক্ষ থেকে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন কিম জে হিউন। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য কিম কি দুক স্মরণে সাক্ষাৎকারটির সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।
প্রশ্ন: ডিজাস্টার ফিল্ম (দুর্যোগ বা বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র) তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর তো অভাব নেই, আপনি ফুকুশিমাকে কেন বেছে নিলেন?
উত্তর: হারিকেন, বড় ভূমিকম্প কিংবা তুষারঝড়ের মতো অনেক দুর্যোগই আছে, এই মুহূর্তে আমাদের জন্য ঝুঁকির। কিন্তু পরমাণুকেন্দ্রে বিস্ফোরণের ঘটনাটা একটু ভিন্ন। ক্ষতির পরিমাণ বা ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যার হিসাব এখানে অন্যরকম, কেননা তেজস্ক্রিয়তা আমাদের কাছে একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, তাৎক্ষণিক যার পরিমাণ বোঝা যায় না। তাছাড়া কোরিয়া এবং চীনের মতো দেশগুলোতে পরমাণুকেন্দ্রের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র তো পরমাণু জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আমি এই পরিস্থিতির অবসান চাই। আমার চলচ্চিত্রের দর্শক শুধু কোরীয়রা নয়, বৈশ্বিক। সে জন্যেই আমার চলচ্চিত্রের গল্পটি জাপানের, এতে জাপানি অভিনেতারা অভিনয় করেছেন।
প্রশ্ন- স্টপ চলচ্চিত্রে কিছু দৃশ্য রয়েছে, যা ততটা গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন জাপানি অভিনেতারা কোরীয় কাপ নুডলস খাচ্ছে, বা তার কম্পিউটারে কোরীয় ভাষা ব্যবহার হচ্ছে...
উত্তর- স্টপ কম বাজেটের ছবি, এতে কিছু ছোটখাটো ভুল রয়ে গেছে, এগুলো খেয়াল করার মতো কোন আর্ট টিম ছিল না আমার। আমার আগের ছবিগুলোতেও ভুল আছে, কিন্তু তা নিয়ে কোন সমস্যা নেই কারণ সেগুলো কিম কি দুকের কাজ। ছোটখাটো ডিটেইল বা শিল্প নির্দেশনার পরিবর্তে আমি আসলে ছবির মূল বার্তাটা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়ার ওপরেই বেশি জোর দিয়ে থাকি।
প্রশ্ন- ডিজাস্টার মুভি এভাবে একা একা নির্মাণের শক্তি পেলেন কীভাবে?
উত্তর - সত্যি বলতে কী, কাজটা খুবই কঠিন ছিল৷ আমি একে ডিজাস্টার মুভি বলতেও বিব্রত বোধ করি। টোকিওর দুটি স্টিলের টাওয়ার ধসে যাওয়ার দৃশ্যটি নির্মাণে আমি প্রথমে কম্পিউটার গ্রাফিকস ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু সেটা অপেশাদার হয়েছিল বলে পরে সেটা বাদ দিয়ে দিই। সিদ্ধান্ত নেই, চলচ্চিত্রটিকে ড্রামা হিসেবেই নির্মাণ করব। অর্থনৈতিক ক্ষতি কিংবা দেশজুড়ে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে তা দেখানোর পরিবর্তে আমাকে দেখাতে হয়েছে তেজস্ক্রিয়তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি করেছে সেটা। গভীরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনে জানরা পরিবর্তন।
প্রশ্ন- দর্শকের প্রতিক্রিয়া কেমন পেয়েছেন?
উত্তর- জাপানের ইউবারিতে চলচ্চিত্র উৎসবে স্টপ প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। তারা জানত এটা কম বাজেটের ছবি, এতে উন্নতির কিছু জায়গা ছিল, কিন্তু তারা এগুলো নিয়ে কথাই বলেনি।
বরং তারা এটা ইতিবাচকভাবে নিয়েছে যে কোরিয়ার একজন নির্মাতা জাপানের দুর্যোগ নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করেছে, যা কি না কোন জাপানি নির্মাতা করেনি৷ তারা চেয়েছে ছবিটি যেন তাদের দেশে প্রদর্শিত হয়।
প্রশ্ন- আপনার ছবিতে সাধারণত প্রধান চরিত্রের মনস্তত্ত্বকেই তুলে ধরা হয় কেন?
উত্তর- আমি গত ২০ বছর ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবই মানবিক গল্প। যেহেতু আমি নিজেই নিজের ছবিতে বিনিয়োগ করি, খুব বড় আকারে করার সুযোগ হয় না৷ ফলে আমি খুব বেশি সাইড ইফেক্ট বা শিল্প নির্দেশনায় বেশি খরচ করতে পারি না, ফলে আমার চলচ্চিত্র ড্রামাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, চরিত্রায়ণের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয়। অর্থ চলচ্চিত্রের পরিসরকে বড় করতে পারে। কিন্তু চরিত্রের আবেগকে অর্থপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলাই একমাত্র উপায় যার মাধ্যমে বিপুল বিনিয়োগ ছাড়াই চলচ্চিত্রের পরিসর বাড়িয়ে তোলা যায়। ছবিতে যদি কোন গল্প না থাকে, নাটকীয়তা না থাকে, তাহলে চলচ্চিত্র হিসেবে এর কোন মূল্য থাকে না। ফলে আপনি যদি আমার সিনেমা দেখেন, আপনাকে এর বার্তাটি বুঝতে হবে। I
প্রশ্ন- আপনার সিনেমায় প্রায়ই অস্বস্তিকর বা ভীতিকর দৃশ্য থাকে। কেন আপনি নিয়মিত এ রকম দৃশ্য ব্যবহার করেন?
উত্তর- আমার ছবিতে আমি কখনো মিথ্যা বলি না। প্রতিবারই যখন কোন নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, আমি উন্নতির চেষ্টা করি। আমার মনে হয় এ ধরনের দৃশ্যগুলোকে স্বাধীনভাবে দেখানোই আমার জন্য ভালো। এই সমাজে আরামদায়ক বহু চলচ্চিত্র আছে। আমার সিনেমার দর্শক যদি কমও হয়, আমি চাই দর্শকেরা সেই সিনেমার সাথে একাত্ম হোক, সমব্যথী হোক। আমার চলচ্চিত্র আমার নিজের জগৎ, এবং সেটাকে কেন্দ্র করেই তা নির্মিত হতে হবে। মানুষ আমার সিনেমা গুলিকে সময়ের সাথে সাথে ভিন্নভাবে দেখবে, এমনকি যখন কেউ দ্বিতীয়বার একটি সিনেমা দেখবে, তখনো তার কাছে এটি অন্য অর্থ নিয়ে হাজির হবে।
প্রশ্ন- চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন কিসের ওপর?
উত্তর- আগেই বলেছি, সত্য। কিম কি দুক হলেন কিম কি দুক। আমার চলচ্চিত্র সৎ। যখনই আমি দর্শক বা বাজারের কথা মাথায় রেখে সিনেমা বানাব, কোন জনপ্রিয় অভিনেতাকে বাছাই করব, আমি তখন অদৃশ্য হয়ে যাব। সত্য অদৃশ্য হয়ে যাবে। আমি আমার চলচ্চিত্রে শুধু আমারই হৃৎস্পন্দন শুনতে চাই।
