মিনুসহ ৪ বিএনপির নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আবেদন

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২১, ০৫:০৩ পিএম

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে ৭৫’র ১৫ আগস্টের হত্যাকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনুসহ চার নেতার নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আবেদন করেছে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনটি জমা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে এ আবেদন দেওয়া হয়।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল আবেদন পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আবেদন পেয়েছি। এটার এখন পরবর্তী বিষয়গুলো দেখা হবে।’

এর বেশি তিনি কথা বলতে চাননি।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুসাব্বিরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলার এই আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, মামলার আবেদন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়েছে। তিনি অনুমোদন দিলে মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হবে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনুসহ আরো যাদের আসামি করার আবেদন করেছেন তারা হলেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাবেক সিটি মেয়র ও রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন।

আবেদনে বলা হয়, গত ২ মার্চ বিএনপি রাজশাহীতে বিভাগীয় সমাবেশ করে। মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনের সঞ্চালনায় সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বিএনপির এই চার নেতা পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের অসৎ উদ্দেশ্যে নেতাকর্মী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে মিজানুর রহমান মিনু প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘হাসিনা রেডি হও, আজ সন্ধ্যার সময়, কালকে সকাল তোমার নাও হতে পারে, মনে নাই পঁচাত্তর সাল? পঁচাত্তর সাল মনে নাই?’

মামলার আবেদনে আরো বলা হয়, মিনুর এই ঘোষণার পর বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উগ্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। কিছু নেতাকর্মী সমাবেশের এই বক্তব্য ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করেন। সমাবেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুসহ অন্যরাও একইভাবে বক্তব্য দিয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করেন এবং বেআইনিভাবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার উৎখাতের হুমকি দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাসহ নির্বাচিত সরকার উৎখাতের প্রকাশ্য ঘোষণা ও হুমকি দিয়ে তারা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন। যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি বিপজ্জনক ও হুমকিস্বরূপ।

মামলার বিষয় অবগত করতে মঙ্গলবার দুপুরে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ। সংবাদ সম্মেলনে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, সমাবেশে বিএনপি নেতারা যে বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলো অত্যন্ত বিদ্বেষমূলক, উসকানিমূলক এবং ষড়যন্ত্রমূলক। মিজানুর রহমান মিনু ৭৫ সালের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে বাহবা দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা এসব বক্তব্যের জন্য জাতির সামনে ক্ষমা চাওয়ার জন্য মিজানুর রহমান মিনুকে ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তিনি তাদের দলের দপ্তর সম্পাদককে দিয়ে একটি বার্তা গণমাধ্যমে পাঠিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এটি অবমাননাকর। আমরা এটি মেনে নিইনি। আমরা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করতে চাই। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে। আমরা এই প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। জেলা প্রশাসক বরাবর আমরা একটি আবেদন করেছি। জেলা প্রশাসক এটি পুলিশ কমিশনারের কাছে পাঠাবেন। পুলিশ কমিশনার এটি তদন্ত করে জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলবেন। এরপর জেলা প্রশাসক তখন অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। সেখানে প্রক্রিয়া শেষ হয়ে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে এটি মামলা হিসাবে গ্রহণ হবে বলে আমরা আশা করছি। ভবিষ্যতে কেউ যাতে এমন করার সাহস না পায় সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েই আমরা এই মামলাটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। 

২ মার্চ বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশে ৭৫’র ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিয়ে প্রতিবাদের মুখে ৭ মার্চ দুঃখ প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু। মিনুর পক্ষে রাজশাহী নগর বিএনপির দপ্তর সম্পাদক নাজমুল হক ডিকেন ই-মেইলে বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠান।

বিবৃতিতে মিনু উল্লেখ করেন, ‘ভোট জালিয়াতির প্রতিবাদ, নতুন নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠনের দাবি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলা দিয়ে দেশে আসতে বাধা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশ ছিল। আমার বক্তব্যের জন্য যারা ব্যথিত হয়েছেন, মর্মাহত হয়েছেন, আমি তাদের নিকট দুঃখ প্রকাশ করছি। গত ২ মার্চ সমাবেশ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন যেভাবে সর্বসাধারণকে সমাবেশে আসতে বাধা প্রদান করেছে তা নজিরবিহীন। সব যানবাহনসহ এমনকি খাবার দোকান বন্ধ ছিল যা ইতিপূর্বে রাজশাহীতে ঘটেনি এবং নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে’।

মিনু বলেন, আমি এই মহানগরীতে জন্মগ্রহণ করে দীর্ঘদিন রাজশাহীবাসীকে নিয়ে রাজনৈতিক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ সব আন্দোলনে পাশে পেয়েছি। সুতরাং কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা গোষ্ঠী বিশেষকে উদ্দেশ্য করে আক্রোশমূলক বক্তব্য প্রদান করা আমার স্বভাব বহির্ভূত। তাই সবাইকে আমার বক্তব্যে ষড়যন্ত্র না খোঁজার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি’।

গত ২ মার্চ রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠের পাশে একটি কমিউনিটি সেন্টারের পাশে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে মিজানুর রহমান মিনু যে বক্তব্য দেন তার একাংশে বলেন, ‘আমাদের নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, রাজপথে থেকে দেশনেত্রী হয়েছেন। তাকে বের করে আনব, মুক্তি চাই না হাসিনা... রেডি হও। আজ সন্ধ্যার সময়, কালকে সকাল তোমার নাও হতে পারে। মনে নাই ৭৫ সাল? ৭৫ সাল মনে নাই?’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত