আমাদের দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যেন আরও বেশি মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক। দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগে বেশির ভাগ মানুষই ধারণা করতে পারেনি করোনা আবার এই পর্যায়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। গত এক বছরে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এ কথা সত্য ইতিমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়েছেন; যদিও তাদের মধ্যে কেউ কেউ খামখেয়ালি আচরণ করেছেন বা এখনো করছেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছার একটি বড় উদাহরণ করোনার প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক তৈরির জন্য অর্থ বিনিয়োগ ও সফল হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। এর ফলে পৃথিবীতে এই প্রথম এত অল্পসময়ের মধ্যে এতগুলো ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে সেগুলো প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে।
করোনাভাইরাস ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর যে প্রভাব ফেলেছে তা সাম্প্রতিক অতীতে আর দেখা যায়নি। করোনায় বিশ্বের বড় দেশগুলোও বিপর্যস্ত; যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশসমূহ এবং ব্রাজিল, মেক্সিকো, রাশিয়া ও প্রতিবেশী ভারতসহ অনেক দেশই। দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ ভালোভাবেই করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পেরেছে। যদিও দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলানো গেছে বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু ভারতের বর্তমান অবস্থা অনেকগুলো আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
করোনা মোকাবিলায় যেমন রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা গিয়েছে, একই সঙ্গে বিশ্বের বড় দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বেশি প্রকট হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির জায়গা দুর্বল হয়েছে। ইতিমধ্যে কেউ কেউ ভ্যাকসিন নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের স্বার্থপর আচরণ করছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থও মুখ্য হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধিতার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ভ্যাকসিনের ওপর মেধাস্বত্ব আইনকে রহিত করতে পারেনি। ফলে ভ্যাকসিন ও ভ্যাকসিন প্রযুক্তি এখনো অল্পকিছু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। ২০২০ সালের অক্টোবরে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বে কিছু উন্নয়নশীল দেশ করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব আইন রহিত করতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে দাবি তুলেছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি। বিশ্বের বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো ভ্যাকসিন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ভ্যাকসিন প্রস্তুত ও বাজারজাত করা এখন একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। ভ্যাকসিন নিয়ে যে ব্যবসায়িক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ওই দেশগুলো কোনোভাবেই সেখানে ছাড় দিতে রাজি নয়। আর এর বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক স্বার্থ তো আছেই।
অন্যদিকে এখন সারা বিশ্বে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কাড়াকাড়ি। বিশ্বের বড় বড় দেশ ভ্যাকসিন ও ভ্যাকসিন তৈরির উপকরণ মজুদ করে রাখছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের প্রত্যাশিত সংখ্যায় ভ্যাকসিন পাচ্ছে না। ভ্যাকসিন না পাওয়ার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে তারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিরুদ্ধে মামলা করবে। যুক্তরাষ্ট্র অ্যাস্ট্রাজেনেকার ছয় কোটিরও বেশি ভ্যাকসিন ডোজ মজুদ করে রেখেছে। সম্প্রতি তাদের আর চাহিদা না থাকার পরিপ্রেক্ষিতে টিকার এই চালান ছেড়ে দেওয়ার কথাও তারা বলছে। ওদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন প্রস্তুতের দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেই দেশগুলো আবার ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে কেবল নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভারত বলছে, তারা জুন পর্যন্ত কোনো ধরনের ভ্যাকসিন রপ্তানির অনুমতি দেবে না।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ভ্যাকসিন পাচ্ছে না। অন্যদিকে ভারত ভ্যাকসিন তৈরির উপকরণের জন্য আমেরিকার মুখাপেক্ষী। আমেরিকা বলছে, সারা বিশ্বের স্বার্থেই সবার আগে তাদের জনগণকে ভ্যাকসিন দেওয়া প্রয়োজন! অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য যৌথভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি অ্যালায়েন্স ও কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনসের উদ্যোগে ‘কোভ্যাক্স’ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ন্যূনতম ২০ শতাংশ মানুষের জন্য ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু বিশ্বের ধনী দেশগুলোর ভ্যাকসিন মজুদ করে রাখার কারণে ‘কোভ্যাক্স’ এই ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারছে না। এর ফলাফল হচ্ছে ইসরায়েল, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ নিজেদের নাগরিকদের বেশির ভাগকে ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় আনতে পারলেও দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো সেভাবে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরুই করতে পারেনি। ২৯ এপ্রিলের হিসাব মতে আমেরিকার জনগণের প্রায় ৭১ শতাংশ ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছে, ভারতে তা প্রায় ১১ শতাংশ এবং বাংলাদেশে তা ৫ শতাংশের কিছুটা বেশি।
আমরা সবাই জানি করোনা ক্ষুদ্রশিল্প ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এক অভিশাপ। অন্যদিকে উল্টো চিত্রটা হচ্ছে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি করোনার কারণে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। বিশেষ করে আইটি ও ই-কমার্স কোম্পানিগুলো। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের সম্পদ গত এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। করোনাকালের ছয় মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১১ মিলিয়ন নাগরিক চাকরি হারিয়েছে। অন্যদিকে, একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬১৪ জন বিলিয়নিয়ার যৌথভাবে তাদের সম্পদ ৯৩১ বিলিয়ন বা এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বৃদ্ধি করেছে।
করোনাকালে বৈশ্বিক টেক কোম্পানিগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও আমাদের মতো দরিদ্র দেশগুলোয় ডিজিটাল-বিভক্তির কারণে অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনেক সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ভ্যাকসিনপ্রাপ্তি। বাংলাদেশ সরকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ভ্যাকসিন নিবন্ধনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করছে। কিন্তু এর ফলে শহুরে মধ্যবিত্ত ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর সুবিধা হলেও তথ্যপ্রযুক্তিতে সমান অ্যাকসেস না থাকায় ভ্যাকসিন গ্রহণ থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা থেকে মুক্তি পেতে গণ-ভ্যাকসিনেশনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এর জন্য চাই বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা। এজন্য প্রয়োজন করোনা ভ্যাকসিন তৈরির প্রযুক্তি উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং এ সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব বিধিবিধানকে তুলে নেওয়া। যাতে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে উপেক্ষা করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যাদের ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা আছে তারা তা উৎপাদন করতে পারে এবং অন্য দেশকেও সহযোগিতা করতে পারে।
লেখক : উন্নয়নকর্মী