বাদীই যদি হয়ে পড়ে আসামি

আপডেট : ১৯ মে ২০২১, ০১:১৯ এএম

দশচক্রে ভগবান হয় ভূত, আর প্রয়োগ-চক্করে আইন হয়ে পড়ে কিম্ভূত! বিচিত্র কত কিছুই না ঘটে বিচিত্র এই ভুবনে, বিচিত্র এই দেশে! বিচিত্র প্রয়োগে আইনের কিম্ভূতদশার দেখা অল্প-বিস্তর পেয়েছি বিচারিকজীবনে। তবে, এমন বিচিত্রের দেখা পাইনি আগে। পেলাম শেষকালে বিচারকর্ম ছেড়ে ডেপুটেশনে দুদকে (দুর্নীতি দমন কমিশন) এসে, আইনি মতামতের জন্য। সরকারি এক দপ্তরের তহবিল তছরুপের ঘটনায় সেই দপ্তরের এক কর্মকর্তা অপর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থানায় এজাহার করেন। আইনের প্যাঁচে দুর্নীতির সেই মামলা আসে দুদকে। দুদক কর্মকর্তা তদন্ত শেষে সেই মামলা ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ (চূড়ান্ত প্রতিবেদন; তদন্ত মামলা সব কিছুর চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি, আসামি সবার অব্যাহতি) দিয়ে খতম করে আবার এজাহার করার অনুমতি চান। এমন কিম্ভূত রিপোর্ট কেন? থানার মামলার এজাহারকারী-বাদীকেই নাকি আসল আসামি হিসেবে পাওয়া গেছে তদন্তে। এখন তাকে আসামি বানাতে আবার এজাহার লাগবে। তাই বলে কি সফল তদন্তের এমন বিফল পরিণতি! আবার এজাহার ছাড়া গতি কি নেই আইনে!

আলোচনায় বাড়ে জ্ঞান। আমার লিগ্যাল উইংয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেই তদন্তকারীকে নিয়ে বসলাম। আইনজীবী ছাড়া আইন-আলোচনা অপূর্ণ! দুদকের এক আইনজীবীকেও নিলাম। বিশেষ কিছু ক্ষমতা ছাড়াও দুদককে তদন্তের জন্য থানা-পুলিশের সাধারণ সব ক্ষমতাই দেওয়া আছে আইনে। সিআরপিসি (ফৌজদারি কার্যবিধি), পিআরবি (পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গল) দুদকের তদন্তেও লাগে। ফাইনাল রিপোর্ট দিতে গেলে তার ক্যাটাগরি ভাগ করতে বলে পিআরবি-র ২৭৫ নম্বর রেগুলেশন। অপরাধ ঘটেছে সত্য, তবে কে বা কারা ঘটিয়েছে তার কূলকিনারা করে অপরাধী খুঁজে না পেলে এবং সম্ভাবনাও দেখা না গেলে হয় ‘ফাইনাল রিপোর্ট-ট্রু’। সংক্ষেপে ‘এফআর-টি’। এটাই ঘটে বেশিরভাগ ফাইনাল রিপোর্টে। লোকে তাই ‘এফআরটি’ বলে ফাইনাল রিপোর্টকে। বানোয়াট ঘটনার ডাহা মিথ্যা, ‘ইন্টেনশনালি ফলস’ পাওয়া গেলে ‘এফআর-আইএফ’। অপরাধ ঘটেনি, ‘মিসটেক অব ফ্যাক্ট’ (ঘটনাগত ভুল) পেলে হয় ‘এফআর-এমএফ’। অপরাধ ঘটেনি, ‘মিসটেক অব ল’ (আইনগত ভুল) পেলে হয় ‘এফআর-এমএল’। আর অপরাধ ঘটেছে তবে ‘নন-কগনিজ্যাবল’ (অ-আমলযোগ্য) পেলে হয় ‘এফআর-ননকগ’। আপনার ঘটনা সত্য, আসল অপরাধীও খুঁজে পেয়েছেন; বাদীর বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপসহ অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চার্জশিট না হয়ে ফাইনাল রিপোর্ট হয় কোন ক্যাটাগরিতে?

‘ওসব কোনোটাতেই নয় স্যার।’ তদন্তকারীর জবাব।

তবে কি এই স্পেশাল ক্যাটাগরি নিজে বানালেন?

‘না স্যার, সিনিয়রদের কাছ থেকে শিখেছি। তারা শিখেছিল পুলিশের কাছ থেকে।’

মনে পড়ল, দুদকের জন্ম যে ব্যুরো (দুর্নীতি দমন) থেকে তার যাত্রা শুরুই হয়েছিল পুলিশ-কর্মকর্তাদের দিয়ে, ১৯৮৪-৮৫ পর্যন্ত কেবল তারাই ছিলেন। ব্যুরোর নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগ শুরু হলে পুলিশ-কর্মকর্তাদের ফেরতযাত্রা শুরু, চলে প্রায় ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত। অপরাধের এক ঘটনায় দু-বার এজাহার চলে ফজলুল হক সাহেব? জিজ্ঞেস করলাম আইনজীবীকে।

‘না চলে না। আইন সমর্থন করে না, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের নিষেধ আছে বারবার।’

তাও তো তদন্তকারী করতে চায়!

‘বাদীকেই তো আসামি করতে হচ্ছে। এরকম হলে বাদীর মামলায় পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে আবার এজাহার করে নতুন মামলায় চার্জশিট দেয় তার বিরুদ্ধে। এটাই প্র্যাকটিস, দেখে আসছি।’

এই কিম্ভূত প্র্যাকটিসের আইনটা কোথায়? বলতে পারেন না তিনিও। তদন্তকারীর গণ্ডি কি এজহারেই আটকানো! এজাহারে নাম থাকা আসামিদের কাউকে বাদ দিয়ে নাম না থাকা নতুন কাউকে ঢোকায় না চার্জশিটে!

‘সে তো সব সময়ই করে।’ জবাব সবার।

তাহলে! এজাহারের কাজ হলো আমলযোগ্য অপরাধ ঘটার প্রাথমিক খবরটা দিয়ে তদন্তকাজে নামানো। অপরাধ ঘটেছে কি না, কারা কীভাবে ঘটিয়েছে সব তুলে আনবে তদন্তকারী। প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ অনুসারে চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট হবে। তাতেই ঠিক হবে কে বা কারা আসামি আর সাক্ষী হবে, কে বা কারা বাদ যাবে আর নতুন করে ঢুকবে। এজাহারে নাম থাকা না থাকায় কী যায় আসে!

‘সেটা ঠিক আছে। কিন্তু, এজাহারকারীকেই আসামি করলে চার্জশিটে তার নাম কোন কলামে থাকবে?’

কেন! আসামির কলামে।

‘তাহলে এজাহারকারীর কলামের কী হবে?’

তারই নাম থাকবে সেখানে।

‘একই চার্জশিটে একই লোকের নাম দুই কলামে?’

এজাহারকারীর নাম চার্জশিটে তো সব সময়ই দুই কলামে থাকে, এজাহারকারীর কলামে আর সাক্ষীর কলামে। এটাতে তার নাম সাক্ষীর বদলে আসামির কলামে থাকবে।

‘তাহলে এজাহার প্রমাণ করবে কে?’

এজাহার কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? এটা কি কোনো সাবস্ট্যান্টিভ এভিডেন্স? এজারহারীকে সাক্ষীতে না পাওয়া গেলে, ‘খোদা না খাস্তা’, মারাই গেলে চার্জশিটের সব আসামি খালাস হবে?

‘না, তা হয় না।’

সাক্ষীতে এজাহারকারী হাজির হলে এজাহারে লেখা তার কথার মিল-গরমিল বের করা যায় (সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ও ১৫৭ ধারা)। এজাহারের আসল কাজ তো তদন্তে নামানো। এজাহারকারী সাক্ষী থেকে আসামির কলামে চলে গেলে মামলা রেকর্ডকারী পুলিশ-কর্মকর্তা, তদন্ত-কর্মকর্তা সাক্ষীতে এসে বলবে কোন এজাহার পেয়ে থানায় মামলাটা নিয়েছিল আর তদন্তে নেমেছিল। এক ঘটনায় শুধু আসামির নাম বদলিয়ে আবার এজাহার না হলে এজাহারকারী-বাদীর বিরুদ্ধে চার্জশিট হবে না? সফল তদন্ত বিফল করে সুফল পেতে আবার তদন্ত! সার্থক শ্রম পণ্ড করে ভণ্ডশ্রম! সময়ের অপচয়, সাক্ষীদের হয়রানি। এই তদন্ত বরবাদ করা যাবে না। বাদীকে আসামির কলামেও দিয়ে চার্জশিট দেন এটাতেই।

‘হাইকোর্টে যদি না টেকে?’

তাহলে দেখান ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে বাদীকে আসামি বানানো আলাদা এজাহার করা চার্জশিট সম্পর্কে হাইকোর্টের নজির!

‘খুঁজতে হবে, সময় লাগবে।’ দিলাম সময়। সময় নিয়ে দুদকের আইনজীবী এ কে এম ফজলুল হক সত্যিই সময় করে খুঁজে নিয়ে এলেন ৫৫ ডিএলআর (২০০৩), ২০২ পৃষ্ঠায় আব্দুর রউফ বনাম রাষ্ট্র মামলার নজির। দেখি আমার ভাবনাই টিকছে। যা-সব ভাবছিলাম ঠিক সে-সবই জোরালো যুক্তিতে ফুটে উঠেছে হাইকোর্টের রায়ে। পরিষ্কার কথা, তদন্তে এজাহারকারী-বাদীকেই আসল অপরাধী পাওয়া গেলে সে-মামলাতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে তাকে আসামি বানানো আলাদা এজাহারের কোনোই দরকার নেই আইনে। সফল তদন্তের ঐ মামলাতেই বাদীকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়াই বিধেয়। আমার ধারণাটা পাকা হলো, পাওয়া গেল নতুন বিদ্যা। কাজ চালানো টুকটাক যা কিছু বিদ্যা আমার সব এভাবেই আইনজীবীদের থেকেই টোকানো।

৫৫ ডিএলআর-এর মামলাটা ছিল স্ত্রী-খুনের (মার্ডার)। সেই স্ত্রীর বাবা-ভাইদের আসামি করে স্বামীর বোন প্রথমে এজাহার করে, স্বামীকে করে সাক্ষী। পাঁচ মাস ধরে তদন্ত চালিয়ে স্বামীকে আসল খুনি পেয়ে তদন্তকারী ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে সেদিনই স্বামী ও বোনকে আসামি করে আবার এজাহার করে। তারপরে স্বামীর বিরুদ্ধে খুনের, বোনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ গোপনের চার্জশিট দেয়। দেখছি আবারও স্ত্রী-খুনের মামলা ৫ বছর ধরে তদন্ত চালিয়ে এজাহারকারী-স্বামীকে আসল খুনি পেয়ে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে সেদিনই এজাহারকারী-স্বামীকে আসামি বানিয়ে আবার এজাহার হলো। এবারের এজাহারটা নিজে করেনি পুলিশে, করেছে বাদীরূপী আসল আসামি স্বামীর শ্বশুরে। ছিল কিম্ভূত, হয়ে গেল কিমাকার! নয়া প্র্যাকটিস কেন একাকার! অপরাধের একটা ঘটনায় আরেকবার এজাহার একেবারেই নিষিদ্ধ। ৫৫ ডিএলআর-এর সেই মামলায় হাইকোর্টের মূল কথা ছিল তদন্তে মামলার বাদীকেই আসল অপরাধী পাওয়া গেলে সে-মামলাতেই তার বিরুদ্ধে চার্জশিট হবে। এর জন্য ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে বাদীকে আসামি বানানো আলাদা এজাহারের দরকারই নেই। সেটাতে পরবর্তী এজাহারটা ছিল তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার ‘সুয়োমোটো’ (নিজ উদ্যোগে) দাখিল করা। রায়ে সেটাকে সুয়োমোটো’ এজাহার বলা হয়। ডিএলআর এডিটরিয়াল নোটে ‘সুয়োমোটো’ লেখে। আসল এলেমে বেখেয়াল হয়ে শুধু ‘সুয়োমোটো’-তেই নজর ফেলে ‘সুয়োমোটো’ ছেড়ে শ্বশুর লাগালে চলবে! ফাইনাল রিপোর্ট (চার্জশিটও) হয় এসপি-র অনুমোদনের পর; কোর্টে দাখিলের আগে থানায় এন্ট্রি করে তার নম্বরটাও লিখতে হয় তাতে। এজাহার নেয় থানা। ঘটনা একটাই, ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া, আবার এজাহার নেওয়া; সব কাজই পুলিশের। পার্থক্যটা কী ‘সুয়োমোটো’ আর শ্বশুরে!

শাজনীন-খুনের এজাহার প্রথমে হয়েছিল দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায়। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে ধর্ষণের পরে খুন পেয়ে তদন্তকারী সে-মামলাটা রেখে আরেকটা এজাহার করে ধর্ষণের পরে খুনের অভিযোগে ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইনে। নারী নির্যাতনের এ-মামলায় চার্জশিট হয়, বিচারে কিছু আসামির ফাঁসির আদেশ হয়, হাইকোর্টেও বহাল হয়। আপিল বিভাগে এসে দ্বিতীয়বারের এই এজাহারের প্রসঙ্গ ওঠে। চরম নাখোশ হয়ে আপিল বিভাগ বলে, একটা ঘটনায় দ্বিতীয়বারের এজাহারটা একবারেই বেআইনি, সে-কারণে পুরো মামলাই বাতিলযোগ্য। শেষটায় তাদের শেষ অস্ত্র সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ দিয়ে ন্যায়বিচার রক্ষা করেন। মামলা-সাজা বাতিল করেননি। [সৈয়দ সাজ্জাদ মইনুদ্দিন বনাম রাষ্ট্র, ৭০ ডিএলআর (এডি) ৭০]

দ্বিতীয় এজাহারকাণ্ড আর কত! আইনের শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরাই আইনের বিধান, সুপ্রিম কোর্টের রায় পাশ কাটাবার প্র্যাকটিস চালালে আইন রক্ষা হবে! কিম্ভূত কিমাকার করে তদন্ত সেরে বিচার করতে দিলে ন্যায় ও বিচার দুটোই যায়। আবারও কি সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের ভরসা! নাকি ন্যায়বিচারের সঠিক পথটা আগেই কেউ ধরাবে!   

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত