কালো ছত্রাক নিয়ে সাবধানতা

আপডেট : ২৩ মে ২০২১, ১১:০৯ পিএম

সম্প্রতি করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যেই ভারতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা কালো ছত্রাকের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। ভারতের কোনো কোনো স্থানে করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে, আশার কথা হলো, বাংলাদেশে এখনো এই রোগের প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া যায়নি।  

কালো ছত্রাক বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মিউকরমাইকোসিস। এটা বিশেষ ধরনের আনুবীক্ষণিক ছত্রাকের সংক্রমণজনিত বিভিন্ন রোগকে বোঝায়। এর মধ্যে রাইজোপাস প্রজাতি হলো সবচেয়ে বেশি দায়ী। তবে অন্যান্য জীবাণু যেমন মিউকর, কানিংহামেলা, অ্যাফোফিজোমাইসেস, লিচথিমিয়া, সাকসেনিয়া, রাইজোমুকর এবং অন্যান্য প্রজাতিও এই রোগের কারণ।

এই ছত্রাক সর্বব্যাপী মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে থাকলেও সংক্রমণ ক্ষমতা এতই কম যে ১ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র ১-২ জনের মধ্যে এই জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। কিন্তু কোনো কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলেই কেবল এই সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তখন ১ লাখে ২০ থেকে ৩০ জনের মধ্যে এই সংক্রমণ হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রোগী, বিশেষত কিটো অ্যাসিডোসিস আক্রান্তরা কালো ছত্রাকে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। তাছাড়া ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী, অতিরিক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা, অত্যধিক স্টেরয়েড গ্রহণকারী, কিডনি বা অন্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা রোগী এবং চরম অপুষ্টিজনিত রোগীদের মধ্যে কালো ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে। চামড়ার গভীর ক্ষত ও পোড়া ঘায়েও এই রোগ হতে দেখা যায়।

মিউকর পরিবেশে মোল্ড হিসেবে থাকলেও শরীরের অভ্যন্তরে ঢুকে হাইফা বা তন্তু আকারে পরিণত হয়। এগুলো বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে ছত্রাকের হাইফাগুলো রক্তনালিগুলোতে আক্রমণ করে, যা থেকে থ্রম্বোসিস ও টিস্যু ইনফার্কশন, নেক্রোসিস এবং পরিশেষে গ্যাংরিন তৈরি করে।

সুস্থ মানুষের রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা বা নিউট্রোফিল এই ছত্রাকের বিরুদ্ধে মূল প্রতিরক্ষার কাজ করে থাকে। সুতরাং, নিউট্রোপেনিয়া বা নিউট্রোফিল কর্মহীনতায় (যেমন, ডায়াবেটিস, স্টেরয়েড ব্যবহার) আক্রান্ত ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। একই কারণে এইডস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেও এই সংক্রমণের হার বেশি দেখা যায়।

আক্রান্ত অঙ্গের ওপর ভিত্তি করে মিউকরমাইকোসিস রোগটির ৬টি ধরন দেখতে পাওয়া যায়। যথা: (১) রাইনো সেরেব্রালনাক, নাকের ও কপালের সাইনাস, চোখ ও ব্রেইন বা মস্তিষ্কের সংক্রমণ (২) ফুসফুসীয় সংক্রমণ (৩) আন্ত্রিক সংক্রমণ (৪) ত্বকীয় সংক্রমণ (৫) অভ্যন্তরীণ বা ডিসেমিনেটেড সংক্রমণ (৬) অন্যান্য সংক্রমণ। 

এই কালো ছত্রাক মানুষের শরীরে শ্বাসনালি ও নাকের মধ্য দিয়ে, খাবারের সঙ্গে বা ত্বকের কোনো ক্ষত বা প্রদাহের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে থাকে। এর সংক্রমণ ঘটলে শরীরের আক্রান্ত অংশ আর নাকের শ্লেষ্মা, কফ, চামড়া ও চোখ কালো রং ধারণ করে বলে একে কালো ছত্রাক নামে ডাকা হয়।

মিউকরমাইকোসিস আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা দিতে না পারলে ৫০ ভাগ থেকে ৮০ ভাগ রোগী মৃত্যুবরণ করে থাকে। আর অভ্যন্তরীণ সংক্রমণের মৃত্যুর হার প্রায় ১০০ ভাগের কাছাকাছি।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা :

ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের শুরুতে রোগ সন্দেহ করা ও নির্ণয় করা অত্যাবশ্যক। এজন্য রক্ত পরীক্ষা, বুকের ও সংশ্লিষ্ট অঙ্গের এক্সরে, আলট্রাসনো, শ্লেষ্মা, চামড়া ও মাংসের টিস্যুর বায়োপসি, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষা করাতে হবে। উচ্চ মৃত্যুহারের ভয় থাকায় সময় নষ্ট না করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। ছত্রাকবিরোধী ওষুধ বা অ্যান্টিফাঙ্গাল ড্রাগ জরুরিভাবে শুরু করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিগুলো যেমন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে আক্রান্ত অঙ্গে সার্জারি করতে হতে পারে বা কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে আক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলে দিয়ে জীবন রক্ষা করতে হতে পারে।

ভারতের মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রদেশে মারাত্মক কভিড-১৯ সংক্রমণের মধ্যেই নতুন করে দেখা দিচ্ছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা মিউকরমাইকোসিস। দীর্ঘদিন রোগভোগ, অতিরিক্ত স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হয়। ভারতজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও শুরুতেই ভালোমতো চিকিৎসা করলে এই রোগকে দমন করে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।

গত সপ্তাহে, প্রায় একই সময়ে ভারতে কভিড রোগীদের মধ্যে হোয়াইট বা শ্বেত ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় বাড়তি আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। কালো ছত্রাকের মতো শ্বেত ছত্রাকের উপসর্গ ও চিকিৎসা একইরকম হলেও এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঠিক পরিকল্পনায় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় আমরা কভিড-১৯ এর বৈশ্বিক মহামারীকে যথাসাধ্য নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হয়েছি। আমাদের দেশে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের কোনো রোগী এখনো পাওয়া যায়নি। হোয়াইট ফাঙ্গাসের কোনো রোগীর খবরও পাওয়া যায়নি।

আশা করি সতর্কতা অবলম্বন করলে এই রোগ থেকে দেশের সবাই নিরাপদ থাকতে পারবে। তারপরও যদি সংক্রমণ ঘটে ভয়ের কোনো কারণ নেই। এই রোগের ওষুধ আমাদের হাতে রয়েছে, সঠিকভাবে প্রয়োগ করে আমরা রোগীর আরোগ্য নিশ্চিত করতে পারব। সুতরাং আতঙ্ক নয়, সাবধানতা দরকার।

লেখক : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত