ধরা পড়বেন জেনে যা করলেন বেলারুশের সেই সাংবাদিক

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ০৮:২৬ পিএম

তাকে ধরতেই মধ্য আকাশে মিনস্কের দিকে বিমানের গতিপথ ঘোরানো হচ্ছে বুঝতে পেরে সাথে সাথেই নিজের ল্যাপটপ ও মোবাইল সঙ্গীর হাতে তুলে দেন বেলারুশের ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক রোমান প্রোতেসেভিচ।

গ্রিস থেকে লিথুয়ানিয়াগামী রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইট আচমকা পাশের দেশ বেলারুশের রাজধানী মিনস্কের দিকে ঘোরানোতে প্রোতেসেভিচের মধ্যে তড়িৎ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে দেখেন সহযাত্রীরা।

তিনি আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে মাথার ওপরের লকারে থাকা লাগেজ থেকে ল্যাপটপ বের করে বাড়িয়ে দিলেন পাশের নারী সঙ্গীর দিকে। সঙ্গে দিলেন মোবাইল ফোনটিও।

রোমান প্রোতেসেভিচের হাতে সময় খুব বেশি ছিল না। লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াস থেকে মিনস্কের দূরত্ব দুশো কিলোমিটারেরও কম। ঘুরে যেতে লাগবে মাত্র কয়েক মিনিট।

গতবছর মিনস্কে প্রবল সরকারবিরোধী বিক্ষোভের খবর প্রচার করায় বেলারুশ সরকারের রোষানলে পড়েন রোমান প্রোতেসেভিচ। তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য রবিবার রীতিমত সিনেমার কায়দায় জঙ্গি বিমান পাঠিয়ে রায়ানএয়ারের ওই উড়োজাহাজকে মিনস্কে নামতে বাধ্য করেছে বেলারুশ সরকার।

ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের বরাতে সাংবাদিক রোমান প্রোতেসেভিচের গ্রেপ্তারের ঘটনা বর্ণনা দেওয়া হয়েছে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে।

ওই ফ্লাইটের লিথুয়ানিয়ার যাত্রী মান্তাস বলেন, যখন ঘোষণা হল যে আমরা মিনস্কে অবতরণ করতে যাচ্ছি, রোমান দাঁড়িয়ে গেলেন এবং লাগেজ কম্পার্টমেন্ট খুলে লাগেজ থেকে বিভিন্ন জিনিস আলাদা করতে শুরু করলেন।

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, উনি ভুল করেছেন। জিনিসগুলো বান্ধবীকে না দিয়ে আমাকে নয়তে অন্য কোনো যাত্রীকে দিতে পারতেন, আমরা অনেক লোক ছিলাম। আমারতো মনে হয় তাকেও (বান্ধবী) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রিসের রাজধানী এথেন্স থেকে যাত্রা শুরুর পর মিনস্কে সাত ঘণ্টার বিরতি আর ভোগান্তি শেষে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে ফিরে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলছিলেন মান্তাস।

মান্তাস বলেন, আমরা দেখেছি রোমান প্রোতেসেভিচকে লাগেজে কিছু খোঁজার জন্য আটকানো হয়েছে। অন্য যাত্রীদের লাগেজেও তল্লাশি শেষে বাসে করে টার্মিনালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আবারও বিমানে ওঠার আগ পর্যন্ত তাদের কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। 

তিনি বলেন, আমরা জানালা দিয়ে দেখলাম, রোমান একা দাঁড়িয়ে আছেন এবং অনুসন্ধানী কুকুরসহ একজন পুলিশ (তার লাগেজে) কিছু খুঁজছে।

মান্তাস জানান, রোমান প্রোতেসেভিচের কাছ থেকে ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন নিয়েছিলেন তার যে সঙ্গী, তাকে মিনস্কে আটক করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে মিনস্ক থেকে ভিলনিয়াসে যাত্রার আগে উড়োজাহাজটিতে যাত্রী ছিল আগের চেয়ে কম। তার মানে বিমান থেকে একজনের বেশি লোককে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে- কিন্তু সেটা সঠিক করে বলা মুশকিল।

লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট গিতানাস নাউসেদা অবশ্য এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মিনস্ক থেকে ভিলনিয়াসের ফ্লাইটে প্রোতেসেভিচের নারী সঙ্গী ওঠেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও একজন যাত্রী লিথুয়ানিয়ার গণমাধ্যমকে বলেছেন, বেলারুশের নিরাপত্তাকর্মীরা আসার পর রোমান প্রোতেসেভিচ নিজেই তার পরিচয় দেন। আমি তার পাসপোর্ট নিয়ে যেতে দেখেছি। তিনি মাস্ক খুলে বলেন: আমি অমুক এবং আমার কারণেই এসব কিছু ঘটছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্লান্ত হয়ে পড়া আরেকজন যাত্রী বলেন, প্রোতেসেভিচকে অত্যন্ত আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল। আমি সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়েছি এবং তিনি খুবই হতাশ ছিলেন।

বেলারুশের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা বেলারুশিয়ান টেলিগ্রাফ এজেন্সি বেলটা বলেছে, বোমা থাকার সন্দেহে রায়ানএয়ারের ওই ফ্লাইটের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য ওই বোমার খবর মিথ্যা হয়ে যায়।

মিনস্কে অবতরণের পর ২৬ বছর বয়সী সাংবাদিক রোমান প্রোতেসেভিচকে দ্রুততার সঙ্গে আলাদা করে অনুসন্ধানী কুকুর দিয়ে তার লাগেজ তল্লাশি করা হয়। অবশ্য সেখানে কিছু পায়নি পুলিশ।

এদিকে, সাংবাদিক রোমান প্রোতেসেভিচকে গ্রেপ্তারের জন্য রায়ানএয়ারের ফ্লাইট ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য।

অবিলম্বে প্রোতেসেভিচের মুক্তি দাবি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। লিথুয়ানিয়ার আহ্বানে ইউরোপীয় নেতারা সোমবার এ বিষয়ে একটি বৈঠকে বসবেন।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের এক টুইটে বলেন, গর্হিত এবং বেআইনি আচরণের জন্য বেলারুশকে পরিণতি ভোগ করতে হবে। রায়ানএয়ার হাইজ্যাকের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করা হবে।

এই ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় হাইজ্যাক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাতায়ুজ মোরাভিয়েস্কিও।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিংকেন এক টুইটে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেক ‘তীব্র নিন্দা’ জানিয়ে বলেন, বেলারুশ কর্তৃপক্ষ একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের জন্য নির্লজ্জ ও জঘন্যভাবে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। আমরা এর আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করছি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে আমরা বাকিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব টুইটার বার্তায় বলেন, লুকাশেঙ্কোর এমন অস্বাভাবিক আচরণের জন্য কঠিন পরিণতি হবে।

৬৬ বছর বয়সী আলেকজান্দার লুকাশেঙ্কো ১৯৯৪ সাল থেকে বেলারুশ শাসন করছেন। গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় শত শত বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নির্বাসনে থাকা বেলারুশের বিরোধীদলীয় নেত্রী সেভেৎলানা তিখানোভস্কায়াও জোর করে রায়ানএয়ারের ফ্লাইট নামানোর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং সাংবাদিক প্রোতেসেভিচের মুক্তি দাবি করেছেন।

গত বছর বেলারুশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দেশত্যাগে বাধ্য হন সেভেৎলানা তিখানোভস্কায়া। বর্তমানে তিনি লিথুয়ানায় অবস্থান করছেন।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত