সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকায় জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জের ধরে ১৯৫৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর মুনসেফ আদালতে বাটোয়ারা মামলা (নম্বর-৩৯৭) করেন আসিরুননেসা। বাদীর পক্ষে ১৯৬২ সালের ২৩ আগস্ট রায় দেয় বিচারিক আদালত।
২০ বছর আগে বাদী আসিরুননেসার মৃত্যু হয়। নতুন বাদী হন তার মেয়ে হামিদা খাতুন (৭০)। ইতিমধ্যে মামলার একাধিক বিবাদীরও মৃত্যু হয়েছে। ৬৩ বছর পর চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালত মামলাটি নিষ্পত্তি করে রায় দিয়েছে। এখন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর দখল বুঝে পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন বাদী হামিদা খাতুন।
আসিরুননেসার মতো ভূমিসংক্রান্ত দেওয়ানি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন অনেকে। দিন, মাস, বছর যায়, তাদের অপেক্ষার প্রহর ফুরোয় না। অনেক ক্ষেত্রে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারেন না বাদী-বিবাদীরা। সম্পত্তির মতো উত্তরাধিকাররাও মামলা পান। বাবার মৃত্যুর পর মামলা পান সন্তানরা, চলে বংশ পরম্পরায়।
উচ্চ ও বিচারিক আদালতের আইনজীবীরা বলছেন, দেওয়ানি মামলা শুরু হলে ১০ বছরের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির নজির নেই বললেই চলে। ৬০-৭০ বছর ধরে চলছে, এমন মামলাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, তার চেয়ে মামলা চালাতে বেশি খরচ করেছেন বাদী ও বিবাদীরা। সংশ্লিষ্ট মামলার পক্ষ-বিপক্ষ আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মিলছে না প্রতিকার।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, দেশে দেওয়ানি মামলার বিচার পদ্ধতি যুগোপযোগী নয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির আলোকে মামলা পরিচালনা করায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ১১৩ বছরের পুরনো এ আইনের প্রয়োগ পদ্ধতিও আধুনিক নয়। বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি দূর করতে দেওয়ানি আইন সংশোধন ও সংস্কার সময়ের দাবি। পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ওপরও জোর দেন তারা।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে বিচারপ্রার্থীকে দ্রুত বিচার দেওয়া মৌলিক ও বাধ্যগত বিষয়। যথাসময়ে বিচার না পেলে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুন্ন হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবস্থা এমন, সম্পত্তির মতো মামলাও পক্ষগণ উত্তরাধিকার সূত্রে পান। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন দরকার। আমাদের পদ্ধতিগত আইনগুলো (প্রসিডিউরাল ল) যুগোপযোগী না বলে মামলা জট বাড়ছে। গুরুত্ব (মেরিট) বুঝে মামলার আদেশ হবে। পরিস্থিতি বুঝে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আদেশ হতে পারে। তা না হলে বস্তার পর বস্তা মামলার কাগজের স্তূপ জমবে।’
আইনজীবীরা জানান, বিচারিক আদালতে মামলার আরজি প্রস্তুত, শুনানির জন্য নোটিস-সমন জারি ও তা পেতে দেরি, বিবাদীর জবাব দাখিল ও গ্রহণে বিলম্ব, ঘন ঘন শুনানি মুলতবির আবেদন ও মঞ্জুর, বিচারক ও এজলাস স্বল্পতা, বিচারিক নীতি তৈরি না হওয়া, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও পুরনো আইন সংস্কারের অনীহায় দেওয়ানি মামলা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।
করোনা পরিস্থিতির কারণে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় থেকে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের মধ্য জুলাই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে, দেশে উচ্চ ও বিচারিক আদালতে ৩৭ লাখ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বেড়েছে। বিচারিক আদালতে প্রায় ১৪ লাখ দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন, যার বেশিরভাগই জমি কিংবা ভূমিসংক্রান্ত। উচ্চ আদালতের ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন। সবমিলে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলা প্রায় ১৫ লাখ।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি জমির বিরোধ নিয়ে ৪০-৫০ বছর মামলা চলা দুঃখজনক। স্বল্পসময়ে ভূমির বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা দরকার। দেওয়ানি আইনে কিছু পরিবর্তন হয়েছে, সুফল পেতে হলে আরও সংস্কার দরকার।’
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত বিচারিক আদালত থেকে মামলা জট তৈরি হয়। বিশেষ করে নোটিস জারি, জবাব দাখিল, সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়ায় বেশি সমস্যা হয়। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে এ বিষয়ে একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আইন কমিশন উদ্যোগী হতে পারে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকায় জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জের ধরে ৬৩ বছর আগে মামলা করেন আসিরুননেসা। বিচারিক আদালতে বাদীর পক্ষে প্রথম রায় হয় ১৯৬২ সালের ২৩ আগস্ট। বিবাদী আব্দুল আলী রায়ের বিরুদ্ধে একই বছর জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। রায়টি আংশিক সংশোধন শেষে বাদীর পক্ষে রায় এলেও এ রায়ের বিরুদ্ধে ১৯৭০ সালে হাইকোর্টে আপিল করেন বিবাদী। হাইকোর্ট ১৯৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতের রায় আংশিক সংশোধন করে বাদীর পক্ষে রায় দেয়।
এরপর মালিকানার অংশ নির্ধারণ করতে অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ ও প্রক্রিয়া শেষ করতে লেগে যায় ১১ বছর। ২০০০ সালের ২৪ এপ্রিল অ্যাডভোকেট কমিশনার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার পর ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর বাদীর পক্ষে চূড়ান্ত ডিক্রি জারি হলেও প্রতিবেদনে আপত্তি তোলেন বিবাদী। ২০০১ সালের ১৪ আগস্ট বিবাদীর আপিল খারিজ হয়। এ আদেশের বিরুদ্ধে বিবাদীপক্ষ ২০০১ সালে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন আবেদন করলে ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের সব সিদ্ধান্ত বাতিল করে নতুন করে অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের নির্দেশ দেয়।
হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের করা আপিল ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর শুনানির জন্য গ্রহণ করে আপিল বিভাগ। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বাদীর আপিল গ্রহণ করে রায় দেয় সর্বোচ্চ আদালত।
এ মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে জানান, আইনের বিধান অনুযায়ী সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে তিনবার সময় নেওয়া যায়। আবার সাক্ষ্য শুরু হলে সময় নেওয়া যায় তিনবার। কিন্তু আইনে স্পষ্টভাবে বলা নেই যে, তিনবারের বেশি সময় নিলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিকার কী হবে?
তিনি বলেন, ‘এমন বিধান থাকা উচিত যে, বাদী তিনবারের বেশি সময় নিলে তার মামলা খারিজ হবে কিংবা বিবাদী তিনবারের বেশি সময় নিলে বাদীর পক্ষে চূড়ান্তভাবে একতরফা ডিক্রি হবে। এছাড়া একবার যদি কারও মামলা খারিজ হয় কিংবা একতরফা ডিক্রি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ শুধু একবার আপিলের সুযোগ পাবে। আদালত থেকে সমন জারির পদ্ধতি এখনো সেকেলে। অনেকের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায় না। এতে দীর্ঘ সময় লাগে। এগুলো আধুনিক ও যুগোপযোগী করা উচিত।’