হিসাব করতে অঙ্ক লাগে, অঙ্ক ছাড়া হিসাব হয় না। এই অঙ্ক আবার এমন এক শাস্ত্র যেখানে ফাঁকি চলে না। সহজ উদাহরণ হিসেবে এ কথা বহুল প্রচলিত যে, দুই আর দুইয়ে চার হয়। কিন্তু ছোটবেলায় হয়তো সবাই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন যে, দুই আর দুই মিলে কখন পাঁচ হয়? কৌতুক মেশানো উত্তরটাও প্রায় সবারই জানা, যখন অঙ্ক ভুল হয়। কারণ অঙ্কে ভুলের স্থান নেই। কিন্তু অঙ্কে না থাকলেও জীবনের এবং রাজনীতির হিসাবে ভুল করা, ভুল বোঝানো এবং ভুল দেখানো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। রাজনীতি এবং অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই সংখ্যার খেলা শুধু নয় সংখ্যার ভেলকি দেখে আসছে মানুষ। যাকে অনেক সময় প্যাঁচ বলে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন বলা হচ্ছে ফসলের দাম বেশি তাই কৃষকরা এখন বেশি লাভ করছেন। যদি প্রশ্ন করা হয় এই বেশি মানে কী? তখন বিরক্ত হয়ে উত্তর দিতে পারে, বেশি বুঝলেন না? বেশি মানে হলো যা কম নয়। পাল্টা প্রশ্ন যদি করা হয়, এই কম নয় মানে কী? চাষ করতে যা খরচ হয়েছে তার তুলনায় কম নয় এটাই কি বুঝাতে চাইছেন? তখন অর্থনৈতিক হিসাবের প্রশ্ন বাদ দিয়ে তেড়ে উঠে রাজনৈতিক উত্তর দিয়ে হয়তো বলবে, এই সহজ কথা বুঝলেন না? আগে যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের তুলনায় কম নয়, তাদের তুলনায় বেশি। তাদের সময় এই ছিল আর আমাদের সময় দেখুন, এই হচ্ছে। এতে কথার পিঠে কথা হয়, কথার প্যাঁচ শক্তিশালী হয় কিন্তু অঙ্কের প্যাঁচ খোলে না।
তেমনি অঙ্কের হিসাবে মিলছে না অনেক কিছু। করোনার টিকার জন্য খরচ হয়েছে কত? কিংবা খরচ হবে কত? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নয় স্বচ্ছ হিসাবটা জানতে চাওয়া অপরাধ নয়, বরং নাগরিক হিসেবে জানতে চাওয়া একটি অধিকার আর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো দায়িত্ব। জনগণের ট্যাক্সের টাকা যথার্থভাবে খরচ হচ্ছে, না-কি অপচয় হচ্ছে তা তো দেশের স্বার্থেই জনগণের জানা দরকার। দুর্নীতি হচ্ছে কি না তা বলার আগে জানতে হবে প্রকৃত খরচ কত হয়েছে। যা খরচ করা হয়েছে তার চেয়ে কম খরচ করা সম্ভব ছিল কিনা। সরকার নাগরিকদের বিনামূল্যে টিকা দিচ্ছেন বলে চোখ বুজে বলবেন, যা হয় হোক তাতে আমার কি! এভাবে ভাবা কোনো সচেতন নাগরিকের উচিত নয়। সরকার যাকে বিনামূল্য বলছেন তা কিন্তু জনগণের ট্যাক্সের টাকা কিংবা বিদেশ থেকে জনগণের জন্য অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত টিকা বা টাকা। ফলে সরকার জনগণের জন্য যা করে বা যে ব্যয় করে তা তো জনগণের টাকাতেই করে। তাই এই সব খরচের হিসাব এবং স্বচ্ছতা থাকা দরকার।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আকুল আবেদন নামে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে তারা মোট ভ্যাকসিন কিনেছে এক কোটি এক লাখ ৫০ হাজার ডোজ। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কিনেছে ৭০ লাখ ডোজ। আর ভারতের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছে ৩৩ লাখ ডোজ। চীনের সিনোফার্মের টিকা কিনেছে ২০ লাখ ডোজ আর উপহার হিসেবে পেয়েছে ১১ লাখ ডোজ। মডার্নার টিকা কিনেছে ২৫ লাখ ডোজ এবং ফাইজারের কাছ থেকে কিনেছে এক লাখ ৬ হাজার ডোজ। অর্থাৎ মোট টিকা কিনেছে ৭০ লাখ+২৫ লাখ+২০ লাখ+১ লাখ ৬ হাজার = এক কোটি ১৬ লাখ ৬ হাজার ডোজ। মন্ত্রণালয়ের হিসাবের সঙ্গে মিলল না তো! এর বাইরে উপহার হিসেবে বিনামূল্যে পেয়েছে ৪৪ লাখ ডোজ। আবার মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বলেছে প্রতি ডোজ টিকা তারা কিনেছে ৩ হাজার টাকা দামে। কিন্তু তা কীভাবে হয়? সেরাম ইনস্টিটিউট টিকার দাম ৪ ডলার, পরিবহন খরচ ১ ডলার মোট ৫ ডলার বা ৪২৫ টাকা। চীনের সিনোফার্মের টিকার দাম ১০ ডলার অর্থাৎ ৮৫০ টাকা। মডার্নার টিকা বিনামূল্যে পাওয়া গেছে বলে বিমানবন্দরে টিকা আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন। আর যে টিকা উপহার হিসেবে পাওয়া গিয়েছে তা তো বিনামূল্যেই। তাহলে প্রতি ডোজ টিকার খরচ তিন হাজার টাকা হয় কীভাবে? কোথায় ৪২৫ টাকা এবং ৮৫০ টাকা আর কোথায় তিন হাজার টাকা!
সরকারিভাবে করোনা পরীক্ষার খরচের হিসাব দেখানো হয়েছে ৩ হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার সানসিয়র কিট ব্যবহার করে সর্বোচ্চ খরচ হয় ১৭০০ টাকা। আর একবারে ৯০টি স্যাম্পল পরীক্ষা করা হলে খরচ কমে ১২০০ টাকায় নেমে আসবে বলে জানা গেছে। তাহলে সরকারিভাবে পরীক্ষার খরচ তিন হাজার টাকা হয় কীভাবে? মেলে না উত্তর! স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আবার উল্লেখ করেছে তারা এক লাখ করোনা রোগীর চিকিৎসা দিয়েছে। প্রতিদিন একজন রোগীর পেছনে খরচ করেছেন ২০ হাজার টাকা। মোট খরচ করেছে দুই হাজার কোটি টাকা। ৬৪ জেলার মধ্যে ৪২টি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ নেই। করোনা আক্রান্ত সব রোগীর কি আইসিইউ লেগেছিল? খোলা চোখে দেখে এবং কয়টি আইসিইউ আছে তা হিসাব করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, এত রোগীকে আইসিইউ সুবিধা দেওয়ার মতো আইসিইউ বেড দেশে নেই। দেশে কভিড ডেডিকেটেড শয্যা ১২৩৬৫টি এবং আইসিইউ শয্যা ১০৮৪টি বলেই তো আমরা জানি। তাহলে প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা করে ১০ দিনে রোগীপ্রতি ২ লাখ টাকা খরচ হলো কীভাবে? বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এসব প্রশ্ন যদি করা হয় তাহলে কে দেবে উত্তর?
করোনা রোগীর চিকিৎসা এবং টিকা নিয়ে খরচের হিসাব না হয় নাই-বা মিলল, ভাতের কিংবা চালের হিসাবও কি মিলবে না? দেশ কৃষি উৎপাদনে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। এই সাফল্যের দাবিদার সরকারের হিসাব ও বাস্তবের সঙ্গেও তো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে তৃতীয়। চীন, ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। দীর্ঘদিন চাল উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে ছিল ইন্দোনেশিয়া। তাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ গত দুবছর ধরে তৃতীয় অবস্থানে আছে। ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচারের তথ্যমতে ২০২১- ২২ অর্থবছরে চাল উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার টন। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে গত বছরেই চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৬৬ লাখ টনের বেশি। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ। দৈনিক শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই আধা কেজি বা ৫০০ গ্রাম চাল খেলে ১৭ কোটি জনসংখ্যা হিসাব করে চালের প্রয়োজন বছরে ৩ কোটি ১০ লাখ টন। মার্কিন বা বাংলাদেশি যে কোনো হিসাবেই তো চাহিদার তুলনায় চালের উৎপাদন অনেক বেশি। তাহলে কেন সরকারি খাদ্য গুদামে মজুদ কমছে এবং বাজারে চালের দাম বেড়েই চলেছে? খাদ্য মজুদ বাড়ানো এবং চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারত থেকে সরকারিভাবে ৫ লাখ টন এবং বেসরকারিভাবে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে? চাল আমদানির সুবিধার্থে চালের ওপর আমদানি শুল্ক ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে? বাজারে এর কোনো প্রভাব কি পড়বে, সাধারণ ক্রেতারা কোনো সুফল কি পাবেন? অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সে সম্ভাবনা নেই। ব্যবসায়ীদের মুনাফার কাছে মানুষের কষ্টের কোনো দাম নেই।
দেশে কোথাও নাকি কোনো সিন্ডিকেট নেই। তাহলে চালের দাম, তেলের দাম এমনকি কাঁচামরিচের দাম নিয়ে এই কারসাজি কারা করে? চাল আমদানি করা হচ্ছে নাকি বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য। কাঁচামরিচ আমদানির কথা শুনেই দাম কিছুটা কমে যাওয়ার রহস্য কী তাহলে? সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের যে দাম নির্ধারণ করা হয়
কৃষক সে দামে ধান বিক্রি করতে পারে না। মৌসুমে কৃষক কমদামে ধান বিক্রি করে। আবার চালের যে দাম সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি দামে ভোক্তাদের চাল কিনতে হয় বাজার থেকে। এই কেনা এবং বেচা দুই ক্ষেত্রেই লাভ করছে ব্যবসায়ীরা আর লোকসান বা ক্ষতির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তাই তাদের আয় এবং জীবন যাপনের ব্যয়ের হিসাব কোনোমতেই মিলছে না।
নাসির উদ্দিন হোজ্জার একবার মাংস খেতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল। কষ্ট করে কিছু টাকা জোগাড় করে ২ কেজি মাংস কিনে রাঁধুনিকে দিয়ে বললেন, ভালো করে রান্না করো। অনেক দিন মাংস খাই না, আজ পেট ভরে খাব। এ কথা বলে গোসল করতে গেলেন। রাঁধুনিও অনেক দিন পর মাংস রান্না করছে। রান্না কেমন হলো তা পরীক্ষা করতে গিয়ে একটু একটু করে কখন যে পুরো মাংসটুকুই খেয়ে ফেলেছে তা খেয়ালই করতে পারেনি। যখন খেয়াল হলো তখন তো মাথায় হাত। কী জবাব দেবে হোজ্জাকে? শেষে দোষ চাপাল বিড়ালের ওপর। এই বিড়ালটাই সব খেয়ে ফেলেছে। হোজ্জা মুচকি হেসে বিড়ালটাকে ধরে ওজন করে দেখলেন, বিড়ালের ওজন ২ কেজি। এরপর হোজ্জার সেই অবিস্মরণীয় প্রশ্ন, বিড়াল যদি ২ কেজি হয় মাংস তাহলে কোথায়? আর মাংস যদি ২ কেজি হয় বিড়াল তাহলে কোথায়? টিকার দাম নিয়ে টাকার গরমিল, দেশে মোট চালের উৎপাদন আর আমদানি নিয়ে গরমিল এবং চালের দাম নিয়ে চালবাজি দেখে এই প্রশ্নটাই কি আবার নতুনভাবে জাগে না? অঙ্ক যদি সত্য হয় এসব ক্ষেত্রে হিসাব কেন মিলবে না?
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট