যাবতীয় জল্পনাকে সত্যি করে কংগ্রেসেই যোগ দিলেন এক সময় সারা ভারতে প্রায় রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বামপন্থী নেতা কানহাইয়া কুমার। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সিপিআই) ছেড়ে রাহুল গান্ধীর হাত ধরলেন তিনি।
ভগৎ সিংয়ের জন্মদিনেই কংগ্রেসে যোগ দিলেন কানহাইয়া। মাথায় হলুদ পাগড়ি পড়ে রাহুল গান্ধীর হাত ধরেন প্রাক্তন সিপিআই নেতা।
কানহাইয়া কুমার কংগ্রেসে যোগদানের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছি কারণ এটি শুধু একটি দল নয়, এটি একটি ধারণা। এটি দেশের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দল, এবং আমি ‘গণতান্ত্রিক’ এর উপর জোর দিচ্ছি ... শুধু আমি নই, অনেকে মনে করেন দেশ টিকে থাকতে পারে না কংগ্রেস ছাড়া’।
তিনি আরও বলেন, ‘কংগ্রেস পার্টি একটি বড় জাহাজের মত। যদি এটি রক্ষা করা হয়, আমি বিশ্বাস করি অনেক মানুষের আকাঙ্ক্ষা, মহাত্মা গান্ধীর একককত্ব, ভগত সিং এর সাহস এবং বি আর আম্বেদকারের সমতার ধারণাও সুরক্ষিত থাকবে। এজন্যই আমি এতে যোগ দিয়েছি’।
তিনি জানান তিনি অনুভব করছিলেন যে একটি বিশেষ আদর্শ ভারতের মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ভবিষ্যতকে নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, ‘কোটি কোটি তরুণ' আজ মনে করেন যে 'কংগ্রেসকে বাঁচানো ছাড়া দেশকে বাঁচানো যাবে না’।
কানহাইয়া কুমারকে স্বাগত জানিয়ে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল বলেন, তাঁর দল এই দেশে শাসক ‘ফ্যাসিবাদী শক্তিকে’ পরাজিত করতে তাঁর এবং মেভানির সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ।
ভেনুগোপাল বলেন, ‘কানহাইয়া কুমার এই দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতীক। তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তার মতো একজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের যোগদান কংগ্রেসের তরুন্দেরকে উৎসাহিত করবে’।
এদিন গুজরাটের দলিত নেতা এবং নির্দল বিধায়ক জিগনেশ মেভানিও দিল্লিতে কানহাইয়া কুমারের সঙ্গেই রাহুল গান্ধীর পাশে ছিলেন। তবে তিনি সরাসরি কংগ্রেসে যোগ দেননি।
তিনি জানিয়েছেন, ‘নির্দল বিধায়ক হওয়ার জন্য আমি টেকনিকাল কারণে কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছি না। কংগ্রেসে যোগ দিলে আমি বিধায়ক হিসাবে কাজ চালাতে পারব না। তবে কংগ্রেসের আদর্শের আমি অংশীদার’।
এদিকে এদিন সকাল থেকেই দিল্লিতে কংগ্রেস অফিসের বাইরে কানহাইয়া কুমারকে স্বাগত জানাতে পোস্টারে ছেয়ে ফেলা হয়। কংগ্রেসের নেতা কর্মীদের মধ্যেও যথেষ্ট উৎসাহ ছিল। এরপর দিল্লির শহিদ-ই-আজম ভগৎ সিং পার্কে রাহুল গান্ধীর সঙ্গেই মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উপরে তুলে ধরেন কানহাইয়া কুমার।
মোদী বিরোধিতার সুর সপ্তমে তুলে তিনি বাম রাজনীতিতে নতুন করে জোয়ার আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেই জোয়ারে পুরোপুরি পাল তোলার আগেই তিনি চলে গেলেন কংগ্রেসে।
ভারতে বামপন্থী রাজনীতির পরবর্তী প্রজন্মের মুখ মনে করা হত তাঁকে। এহেন কানহাইয়া কুমার বামপন্থা ছেড়ে ধরলেন কংগ্রেসের হাত।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিহারের বেগুলরাই কেন্দ্র থেকে প্রার্থীও হয়েছিলেন কানহাইয়া। কিন্তু জিততে পারেননি। তার পর থেকে তাঁকে সেভাবে সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা যায়নি। তিনি একসময় দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি ছিলেন। সেই সময় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশবিরোধী স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কানহাইয়ার বিরুদ্ধে। তবে কানহাইয়া কুমার জাতীয় স্তরে বেশ জনপ্রিয় রাজনীতিক।
ভারতের অ-বাম দলগুলিকে আক্রমণের টার্গেটে রাখলেও প্রথম থেকেই কানহাইয়া কখনও সরাসরি কংগ্রেস বা রাহুলগান্ধীকে সেভাবে আক্রমণ করেননি।
২০১৯ এ সিপিআই-এর টিকিটে বিহারের বেঙ্গুসরাই থেকে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কানহাইয়া। সে সময় বিজেপির গিরিরাজ সিংয়ের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। তারপর থেকেই সু-বক্তা কানহাইয়া কুমারকে দলে নিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল কংগ্রেস।
২০১৬ সালে রাহুল গান্ধী জেএনইউ-তে গিয়ে কানহাইয়াদের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। ছাড়া পেয়ে কনহাইয়াও রাহুলকে ধন্যবাদ জানান। তবে ২০১৯ এ যখন কানহাইয়াকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল দেশদ্রোহীতার মমলায় তখন কংগ্রেস নেতারা এবং রাহুল গান্ধী চুপই ছিলেন।
রাজনৈতিক পণ্ডিতরা রাহুলের কংগ্রেসের নীরবতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি কানহাইয়াকে সমর্থন করলে তাদের দেশবিরোধী হিসেবে প্রচার শুরু করত গেরুয়া শিবির। এই কারণেই ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে আরজেডি-কংগ্রেস জুটি বেগুসরাই আসনে বিজেপির গিরিরাজ সিংয়ের বিরুদ্ধে কানহাইয়াকে সমর্থন করেনি। শেষ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সিংয়ের কাছে প্রায় ৪.২ লাখ ভোটে পরাজিত হন কানহাইয়া।
গত ১০ বছর ধরে নরেন্দ্র মোদীর সামনে ঠিক কাকে কোন ইস্যুতে দাঁড় করাবে তা খুঁজে পায়নি বিজেপি বিরোধী দলগুল। ঠিক সে সময়ই ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিতর্কের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমেড় শিরোনামে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি কানহাইয়া কুমার।
এরপর কানহাইয়ার গ্রেফতারি, ছাড়া পাওয়া, ফিরে এসে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে উমর খালিদদের পাশে নিয়ে ‘হাম ক্যায়া চাহতে, আজাদি, যো তুম না দোগে আজাদি তো হাম ছিনকে লেঙ্গে আজাদি’ স্লোগান তোলা!
সবমিলিয়ে রাতারাতি ভারতের বিজেপি বিরোধীদের কাছে নায়ক হয়ে উঠেছিলেন কানহাইয়া।
