শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়লেও ছাত্রদের চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগটি বানোয়াট বলে দাবি করেছেন সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন।
বুধবার শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন বলেন, ‘একজনেরও চুল কাটিনি। কারও চুলে হাতও দিইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরকম ঘটনা ঘটছে কি না, এই সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নাই। সোমবার সকালেও তারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।’
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বিসিক বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ শিক্ষার্থীর মাথার চুল কেটে দেয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার শিক্ষার্থীরা চারদফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
এই বিষয়ে প্রশাসন মঙ্গলবার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সহযোগী অধ্যাপক ফারহানাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত রবিবার পরীক্ষার হলের দরজার সামনে তিনি কাঁচি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কক্ষে ঢোকার সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের চুল মুঠোর মধ্যে ধরা গেছে, তাদের মাথার সামনের খানিকটা তিনি কেটে দেন।
ছাত্রদের চুল কেটেছিলেন কি না- জানতে চাইলে ফারহানা বলেন, ‘না, এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটি শুনে অবাক লেগেছে। আমি পত্রিকায় দেখেছি খবরটা।’
তিনি বলেন, ‘১৬ জন মানুষের চুল কেটে দেব, কেউ দেখবে না? তারা কোনো ছবি তুলবে না? আমি কাটতে চাইলাম আর ১৬ জন আমাকে চুল কাটতে দিল, কেউ কোনো প্রতিবাদ করবে না?’
তিনি বলেন, ‘একজনেরও চুল কাটিনি। কারও চুলে হাতও দিইনি। এরকম ঘটনা ঘটছে কি না, এই সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নাই। সোমবার সকালেও তারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০০০-২০০১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর কিছুদিন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছিলেন। ২০১৮ সালে যোগ দেন রাষ্ট্রায়ত্ত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর এবং প্রক্টরিয়াল বোর্ডের সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর মঙ্গলবার রাতে তিনি ওই তিন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আব্দুল লতিফ জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘চুল কাটার ঘটনার বিষয়ে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সেই প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
চুল না কাটলে কেন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে, শিক্ষকদের দলাদলির কোনো বিষয় আছে কি না- জানতে চাইলে ফারহানা বাতেন বলেন, ‘কিছু দলাদলি তো থাকেই। তবে সে কারণে হয়েছে কি না, তাও বুঝতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালেও একবার বিশ্ববিদ্যালয় সমস্যা হয়েছিল। তখন আমি শিক্ষকদের পক্ষে ছাত্রদের বিরুদ্ধে একটা রিট করেছিলাম। এখন সেই সব ছাত্ররাই আমার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মূলতঃ তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলন করছে, যার সঙ্গে যুক্ত করিয়েছে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের। এখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতি থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করছি।’
ফারহানা বলেন, ‘যদি ধরেও নিই যে আমি চুল কেটেছি, সেটার তো তদন্ত শুরু হয়েছে। তারা তদন্ত করে কী পায় দেখা যাক। কিন্তু তার আগেই তারা ইউনিভার্সিটি থেকে আমার পদত্যাগ চাচ্ছে কেন? আমি তো নিজ থেকেই প্রক্টরশিপ, চেয়ারম্যানশিপ থেকে রিজাইন দিয়েছি। স্টুডেন্টদের কথা চিন্তা করেই এটা করেছি। তারা ছাত্র, তারা ভুল করতেই পারে। তাদের বয়স কম, তাদের প্রতি তো আমার কোনো ক্ষোভ বা রাগ নেই। আমি ধরে নিলাম যে আমি পদত্যাগ করলে ওরা যদি শান্ত হয়, তাই পদত্যাগই করলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার চাইবে কেন? আমার চাকরিটা কি মগের মুল্লুক?’
বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে ঝামেলা রয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকে হয়ত অনেক সময় অপরিষ্কার-অগোছালোভাবে ক্লাসে চলে আসে। অন্য ছাত্রীরা সেটার জন্য আমার কাছে কমপ্লেইন করে, তখন হয়ত কাউকে কিছু বলেছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে বলেছি। এতটুকুই তো!
এদিকে, সোমবার দুপুরে পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলন করার চেষ্টা করলে রবির ওই শিক্ষক আবারও শিক্ষার্থীদের গালিগালাজ করে পরীক্ষার হলে যেতে বাধ্য করেন। তিনি এ সময় নাজমুল হাসান তুহিন নামের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে তার চেম্বারে ডেকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন ও রবি থেকে তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার হুমকি দেন।
পরে ওই শিক্ষার্থী ভয়ে সোমবার রাত ৭টার দিকে দ্বারিয়াপুরের শাহমখদুম ছাত্রাবাসে নিজ কক্ষে দরজা দিয়ে ৩৫টি ঘুমের বড়ি এক সঙ্গে গুঁড়ো করে সেবন করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। রাত ৮টার দিকে তার সহপাঠীরা বিষয়টি টের পেয়ে তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় প্রথমে শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। তার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ফারহানা বলেন, ‘যে ছেলেটা আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়েছে, তার সঙ্গে এক বছর আগে একটা ঘটনা ঘটেছে। সে প্রথম বর্ষে থাকার সময় মেসে দ্বিতীয় বর্ষের এক ছেলেকে তার ভাড়া দিতে বাধ্য করেছে বলে আমার কাছে অভিযোগ আসে। এই ঘটনায় আমি তাকে সিআর (ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ) পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ সে মিথ্যা বলছে, বড় ভাইকে সম্মান দেখাচ্ছে না।’
