ইউরোপ-আমেরিকায় কমছে বিধিনিষেধ, করোনা মহামারি কি শেষের পথে?

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:০৮ পিএম

করোনা মহামারি শেষ হচ্ছে, এমনটা ধরে নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকার এবং আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ কড়াকড়ি কমাচ্ছে। তবে কিছু দেশ এখনো সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়। স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ এড়াতে সতর্কতা বজায় রাখছে তারা।

যাবতীয় বাধানিষেধ দূর করে পুরোপুরি করোনা মহামারির আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব কিনা, সে বিষয়ে তর্কবিতর্ক রয়েছে। তবে ইউরোপ-আমেরিকার বেশ কিছু দেশ ওমিক্রন ঢেউ সত্ত্বেও অনেক বিধিনিষেধ কমিয়ে এনেছে। জনসাধারণের একটা বড় অংশ করোনা টিকা নেওয়ায় এমন ‘সাহসী’ পদক্ষেপ নিতে চাইছে বেশ কিছু দেশের সরকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বিধি-নিষেধ কমানোর পক্ষে বলছে। যে সব দেশের মানুষের মধ্যে উচ্চ মাত্রায়  প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে গণস্বাস্থ্য পরিষেবা কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী এবং মহামারির প্রবণতা সঠিক দিশায় এগোচ্ছে, সেখানে এমন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে ডাব্লিউএইচও মনে করে। তবে রাজনৈতিক চাপের কারণে তড়িঘড়ি করে এমন বেপরোয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান।

এমন প্রেক্ষাপটে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এবং বেশ কয়েকটি নর্ডিক দেশ করোনা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করছে। নরওয়ে ও ডেনমার্কে সংক্রমণের হার বেড়ে চললেও সরকার এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। ডেনমার্কের অনেক মানুষ অবশ্য স্বেচ্ছায় মাস্ক পরছেন।

মহামারি শেষ হচ্ছে, এমনটা ধরে নিয়েই কড়াকড়ি কমানোর ঝুঁকি নিচ্ছে বেশ কিছু দেশ। গত সপ্তাহ থেকে ইংল্যান্ডে আর প্রায় কোনো বিধিনিয়মই চালু নেই। শুধু পরীক্ষায় করোনা ধরা পড়লে মানুষকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডও বুধবার জানিয়েছে, সংক্রমণ বেড়ে চললেও হাসপাতালের উপর তেমন চাপ না থাকায় অনেক বিধিনিয়ম তুলে নেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপের সব দেশ অবশ্য করোনা সংক্রান্ত নিয়ম শিথিল করছে না। ইটালি বরং আরও কড়া নিয়ম চালু করেছে। সোমবার থেকে ব্যাংক ও ডাকঘরে প্রবেশের জন্য হেলথ পাস দেখানোর পাশাপাশি করোনা টেস্টের ফলও দেখাতে হচ্ছে। ৫০ বছরের বেশি বয়সের কোনো মানুষ টিকা না নিলে ১০০ ইউরো জরিমানাও করা হচ্ছে। গ্রিসে ৬০ বছরের বেশি বয়সের মানুষের জন্য সেই জরিমানার অঙ্ক ৬০ ইউরো। ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রিয়া সবার জন্য করোনা টিকা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেবার পর ধাপে ধাপে কিছু পদক্ষেপ নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জার্মানিতে বিভিন্ন মহলের চাপ সত্ত্বেও ফেডারেল সরকার এখনো করোনা সংক্রান্ত কড়াকড়ি তুলে নিতে প্রস্তুত নয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দায়িত্বজ্ঞানের ভিত্তিতে বিধিনিয়ম শিথিল করা হবে বলে সরকারি এক মুখপাত্র জানিয়েছেন। তবে এখনো সেই সময় আসে নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিরোধী ইউনিয়ন শিবির অবশ্য এখন থেকেই এমন পদক্ষেপের প্রস্তুতির জন্য চাপ দিচ্ছে। সরকারের শরিক উদারপন্থি এফডিপি দলও স্পষ্ট পদক্ষেপের পক্ষে বলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষেই সংক্রমণের হার আবার কমতে শুরু করবে। কয়েকটি রাজ্যের সরকার এখনই কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করছে। আগামী ১৬ই ফেব্রুয়ারি চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আবার আলোচনা হবে। তখন শর্তসাপেক্ষে বিধিনিষেধ শিথিল করার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছু প্রদেশের স্থানীয় নেতারা বিধি-নিষেধ কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ডেনভার শহরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং পাবলিক স্পেসের জন্য টিকার সার্টিফিকেট এবং মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে স্কুল এবং গণপরিবহনে কড়াকড়ি কমানো হয়নি।

নিউইয়র্কের গভর্নরও আগামী সপ্তাহ থেকে করোনা বিধিনিষেধ কমানোর চিন্তা করছেন। কারণ সেখানে করোনা আক্রান্তের হার এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। নিউইয়র্ক সিটিতে এখন প্রতিদিন গড়ে ৪২০০ জন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। অথচ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন ৪১ হাজার জন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

পুরো যুক্তরাষ্ট্রেও সামগ্রিকভাবে করোনার সংক্রমণ অর্ধেক কমে গেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৮ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে সেখানে এই সপ্তাহে এখন তা ৪ লাখ ৩০ হাজারে নেমে এসেছে।

গত সপ্তাহে ইংল্যান্ডে প্রায় সমস্ত ঘরোয়া বিধিনিষেধের অবসান ঘটেছে। জনসাধারণের মধ্যে মাস্কের প্রয়োজন নেই, পাবলিক ভেন্যুতে যাওয়ার জন্য ভ্যাকসিন পাসের আর প্রয়োজন নেই, এবং বাসায় থেকে অফিস করার আদেশ বাতিল করা হয়েছে।

মঙ্গলবার নরওয়েতে রাত ১১টার পর অ্যালকোহল পরিবেশনের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এবং ১০ জনের বেশি লোকের ব্যক্তিগত জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে, নির্দিষ্ট আসনের ইভেন্টে লোকে আবার কনুই মিলিয়ে বসতে পারছে এবং খেলাধুলার ইভেন্টগুলো মহামারীর আগের মতো হয়ে গেছে।

সুইজারল্যান্ড বুধবার বাসায় থেকে অফিস এবং কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজনীয়তা বাতিল করেছে এবং আগামী সপ্তাহগুলোতে অন্যান্য বিধিনিষেধ সহজ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

ডেনমার্কের রাজধানীতে মঙ্গলবার বেশিরভাগ বিধিনিষেধ বাতিল করার একদিন পরও অনেক লোক রাস্তায় এবং দোকানে মুখোশ পরে ছিল।

ভ্যাকসিনের বাধ্যবাধকতার আদেশ জারি করা প্রথম ইউরোপীয় দেশ অস্ট্রিয়া এই মাসে কোভিড-১৯ বিধিনিষেধ শিথিল করার পরিকল্পনা করছে এবং রেস্তোঁরাগুলোকে অধিক রাতেও খোলা থাকতে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

নিউজিল্যান্ড তার কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সহজ করবে, টিকা নেওয়া নাগরিকদের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত কোয়ারেন্টাইন হোটেলে থাকার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু টিকাবিহীনদের কোয়ারেন্টাইন আব্যাহত থাকবে। বিদেশীদেরকে কোয়ারেন্টাইন-মুক্ত ভ্রমণের জন্য অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা এই সপ্তাহে ঘোষণা করেছে যে, তারা চতুর্থ তরঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায় যে, সেখানে অনাক্রম্যতা ৬০% থেকে ৮০% হয়ে গেছে। মাস্ক এখনও বাধ্যতামূলক, তবে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং স্কুলগুলোকে ২০২০ সালের মার্চ মাসের পর প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণরূপে খুলে দেওয়া হচ্ছে।

তবে বেইজিং অলিম্পিক উৎসব উপলক্ষে চীন তার শূন্য-কোভিড নীতিতে অনড় আছে। কোনও রোগী শনাক্ত হলে দ্রুত লকডাউন এবং কোয়ারেন্টাইন আরোপ করা হচ্ছে। গণ পরিবহনে মাস্ক বাধ্যতামূলক রয়েছে এবং বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ ও দোকানে প্রবেশের জন্য লোককে স্বাস্থ্য অ্যাপে ‘সবুজ’ অবস্থা দেখাতে হয়।

বিশ্বের অনেক জায়গায় ওমিক্রনের প্রকোপ শিথিল হওয়ায় আশা জেগেছে যে, করোনাভাইরাস একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে চলেছে। যেখানে ভাইরাসটি ফ্লুর মতো একটি স্থায়ী কিন্তু শুধু সাধারণ হুমকি হিসেবে থাকবে। যাকে সঙ্গে নিয়েই মানুষ বাঁচতে পারবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত