প্রশ্নের শক্তি আর উত্তরের বিভ্রান্তি

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২২, ১২:২৩ এএম

প্রশ্নের একটা শক্তি আছে। তা উত্তরদাতাকে বিচলিত করে, হতভম্ব করে, পর্যুদস্ত করে এমনকি পরাজিত করে। তাই অতীত যুগে প্রশ্নহীন আনুগত্য চাইতেন শাসকরা। তবে ইতিহাস বলে, শাসকরা যা চান তা তো সব সময় পূরণ হয় না আর সব প্রশ্নের উত্তর দিতেও পারেন না তারা। মহাপরাক্রমশালী এক সম্রাটকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কি সমুদ্রের ঢেউকে থামিয়ে দিতে পারবেন? উত্তরে ছিল নীরবতা আর প্রশ্নকারীর প্রতি তীব্র কটাক্ষ। যাক! সেসব কথা। এখন তো আর সেই সাম্রাজ্য নেই, সম্রাটও নেই। কিন্তু একটা বিষয় আছে। ভুল হোক শুদ্ধ হোক চট-জলদি উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাকে সবাই পছন্দ করতেন। সে কারণে মোল্লা দো পেয়াজা, বীরবল, গোপাল ভাঁড় এমনকি নাসির উদ্দিন হোজ্জা পর্যন্ত ইতিহাসে বেঁচে আছেন তাদের বুদ্ধিদীপ্ত তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়ার কারণে।

ইতিহাসের সীমানা ছাড়িয়ে এ ধরনের চরিত্র আজও মেলে। এখন তো সাম্রাজ্য বা সম্রাট নেই আছে রাষ্ট্র এবং সরকার। যে সরকার যত শক্তিশালী অর্থাৎ বিরোধী মতকে যত দমন করতে পারেন তার চারপাশে এ রকমের চরিত্র বেশি পাওয়া যায়। আর একটা বিষয়ে পরিবর্তন ঘটেছে তা হলো উত্তর এখন আর বুদ্ধিদীপ্ত হতে হয় না। যুক্তি, বুদ্ধি, রসবোধের পরিবর্তে এখন প্রয়োজন গলার জোর, অসত্য তথ্য, প্রতিপক্ষকে তাচ্ছিল্য করার ক্ষমতা। প্রচারমাধ্যমে বিপুলভাবে তা প্রচার করা হয়। ম্রিয়মাণ সত্য দুর্বিনীত মিথ্যার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারে না। ফলে বিজয়ীর আত্মতৃপ্তি নিয়ে তারা বলতে থাকেন, বলতে থাকেন, বলতেই থাকেন। জনগণ এসব বিশ্বাস করেন কি না জানা যায় না কারণ জনমত যাচাইয়ের জন্য গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নেই। তবে জনগণ নিশ্চুপ হয়ে থাকেন এটা বোঝা যায়। নীরবতাকেই সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরে নিয়ে এই বিভ্রান্তিকর উত্তর প্রদান চলতেই থাকে। বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরের চেয়ে বিবেচনাহীন বক্তব্য এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।

যেমন ধরা যাক, বলা হচ্ছে দাম বেড়েছে তাতে জনগণের খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে না, কারণ দাম যা বেড়েছে তার চেয়ে আয় বেড়েছে অনেক বেশি। বাস্তবে কি তাই? বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা লেবার ফোরস সার্ভে অনুযায়ী ৬ কোটি ৮২ লাখ। এর মধ্যে সাড়ে ৫ কোটির বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী। যাদের মাসিক বেতন বা নিয়মিত কাজের কোনো সংস্থান নেই। এরা অনেকটা কানাবেনা অর্থাৎ কাজ নেই তো বেতন নেই। বাকি সোয়া কোটি যাদের প্রাতিষ্ঠানিক খাত বলা হয় তাদের মজুরি নির্ধারণ করার জন্য মজুরি বোর্ড আছে। মজুরি বোর্ড ৪৩টা সেক্টরের মজুরি নির্ধারণ করে দেয়। সেটা ন্যায্য হয় কি না সে প্রশ্ন এখন যদি আলোচনা নাও করি, উত্তরদাতারা কি বলবেন গত ২০১৮ সালের পর কতটি সেক্টরে মজুরি পুনর্নির্ধারণ হয়েছে? ২০১৩ সালের পর থেকে ৩২টি খাতের মজুরি পুনর্নির্ধারণ হয়নি। এ যাবৎকালে দ্রব্যমূল্য কি বাড়েনি?

আর একটি কোথাও বেশ জনপ্রিয় করার চেষ্টা হচ্ছে। একজন দিনমজুর এখন যে মজুরি পান তাতে দিনে ২০ কেজি চাল কিনতে পারেন। শুধু চাল কিনে জীবন বাঁচে কি না সে প্রশ্ন না হয় নাইবা করা যাক। কিন্তু তারা কারা, তারা কোথায় কাজ করেন, মাসে কত দিন এ রকম মজুরি তারা পান এসব প্রশ্ন করা যেতে পারে কারণ দিনে ২০ কেজি চালের সমান মজুরি মানে মাসে ৩৩ হাজার টাকা আয়। দেশে অনেক ব্যক্তি এখন আছেন যারা দিনে ৩৩ হাজার টাকার বেশি আয় করেন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি তাদের জন্য সমস্যা নয়, তাদের সমস্যা মানসম্পন্ন বিদেশি পণ্য পাওয়া যায় কি না? এ রকম মানুষ স্বাধীনতার আগেও ছিল, স্বাধীনতার পর দেশের বয়স যত বাড়ছে এ ধরনের মানুষের সংখ্যাও তত বাড়ছে। এমনকি দ্রুত ধনী হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এই ধনীরা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বসতি স্থাপন করছেন ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায়। তারা নমস্য! কিন্তু যে ব্যর্থ এবং হতভাগারা দেশে পড়ে আছেন, যাদের সংখ্যা ৯০ শতাংশের বেশি, তারা কি এই পরিমাণ আয় করেন? মাথাপিছু আয়ের যে হিসাব দেওয়া হয় বছরে ২৫৯১ ডলার অর্থাৎ ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা, পাঁচজনের পরিবার হলে মাসে আয় দাঁড়ায় ৯৩ হাজার টাকা। মাথা গুনতি করলে কি খুঁজে পাওয়া যাবে কতজন শ্রমিক এই পরিমাণ আয় করেন? তাদের মা-বাবা-সন্তান কী আয় করে, তাদের পারিবারিক আয় কত এবং তারা কী কী জিনিস কেনেন? 

ইউরোপ-আমেরিকায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি দামে জিনিস বিক্রি হয়, আমরা অনেক সস্তায় কিনি, ফলে তাদের কষ্টের কথা ভেবে নিজেদের দুঃখ ভুলে থাকার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার শ্রমজীবীদের কষ্ট আছে, তাই তারা আন্দোলন করেন, ধর্মঘট করেন, ঘেরাও করেন সেসব তো আমরা দেখি। আমাদের দেশে এসব করলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, ষড়যন্ত্রকারী বলে আখ্যা দেওয়া হয়। আমেরিকায় একজন শ্রমিকের ঘণ্টাপ্রতি আয় ১১ ডলার, কোনো কোনো রাজ্যে ১৫ ডলার। সবচেয়ে কম রোজগার করলেও দিনে ৭৫ ডলার আয় করেন তারা। সেখানে ১ ডজন ডিমের দাম দেড় ডলার। অর্থাৎ দিনের আয় দিয়ে ৫০ ডজন ডিম কিনতে পারেন। সেখানে খাদ্যে বিপুল ভর্তুকি দেওয়া হয় বলে তা সস্তা। আমাদের ২০ কেজি চাল কিনতে পারা শ্রমিক তো দিনের আয় দিয়ে ১০ ডজন ডিম কিনতে পারেন না। চাল, ডাল, মাংস, মাছ ও দুধ এসবের তুলনা না হয় নাইবা করলাম আমরা। উত্তরদাতারা কি জানেন না এসব কথা?

এখন সাড়ম্বরে প্রচার করা হচ্ছে ১ কোটি মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। তারা সস্তায় জিনিসপত্র পাবেন। এই কার্ড দিয়ে একটি পরিবার দুই দফা ১১০ টাকা দরে দুই লিটার সয়াবিন তেল, ৫৫ টাকা দরে দুই কেজি চিনি, ৬৫ টাকা দরে দুই কেজি মসুর ডাল ও ৩০ টাকা কেজি দরে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারবে। প্রথম ধাপের কার্যক্রম চলেছে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। আগামী ৩ এপ্রিল শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপে বিক্রির কার্যক্রম। তখন যুক্ত হবে ৫০ টাকা দরে দুই কেজি করে ছোলা। বাজারে এখন সয়াবিন তেল ১৬৫, চিনি ৮০, মসুর ডাল ১০০, পেঁয়াজ ৩০, ছোলা ৭০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ বাজার থেকে পণ্য না কিনে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনলে প্রথম দফায় একজন ক্রেতার সাশ্রয় হবে ২৩০ টাকা আর দ্বিতীয় দফায় হবে ২৭০ টাকা। দুই দফায় কার্ডধারী ভাগ্যবান মানুষের সাশ্রয় হবে ৫০০ টাকা। চাল-গম ছাড়া দেড় মাসে দুই দফায় প্রাপ্ত এই পরিমাণ পণ্য দিয়ে মানুষ সংসার কীভাবে চালাবেন তার হিসাব সেই মানুষরাই করবে। আমরা মাথাপিছু বরাদ্দের একটা হিসাব করে দেখতে পারি। পরিবারপ্রতি সদস্য সংখ্যা গড়ে ৫ জন হলে সরকার মাথাপিছু ভর্তুকি দিচ্ছে ১০০ টাকা। আর সরকারের দিক থেকে বিরাট বলে দাবি করা এই কার্যক্রমে জনগণের জন্য সরকারের ভর্তুকি হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা। আর এসব পণ্য যদি পুরোপুরি বিনামূল্যেই মানুষকে দিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে প্রথম দফায় প্রয়োজন হতো ৮৪০ কোটি আর দ্বিতীয় দফায় ৯৮০ কোটি টাকা। মোট দরকার ১৮২০ কোটি টাকা। উপচে পড়া রিজার্ভ আর বিশাল বাজেটের দেশে এই টাকা কি অনেক?

সরকার এই পণ্য কিনবেন বাজার দরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে, লাভ হবে ব্যবসায়ীর। কার্ড দেওয়া নিয়ে দলবাজির চিত্র উঠে এসেছে। এর ফলে রাষ্ট্রের টাকায় সমর্থক বাড়াবে ক্ষমতাসীন দল। এ তো হয়েই আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মন্ত্রীদের ভাষ্যমতে দেশে তো গরিব মানুষ নেই। তাহলে সরকারি হিসাবেই ১ কোটি কার্ডে ৫ কোটি মানুষ তো নির্লজ্জ দরিদ্র। এই প্রখর রোদে ১৩ কেজি পণ্য কিনে ২৭০ টাকা সাশ্রয় করার দীর্ঘ লাইন কোন চিত্র তুলে ধরে? কিংবা যখন একজন মন্ত্রীও বলেন লাইন ধরে জিনিস কেনার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। তখন কি তারা হতদরিদ্র নন এমন মানুষের কথা ভেবে বলেন না?

একটা সাধারণ হিসাবে দেখা যায় দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজার প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার। দুই কোটি টন চাল কেনাবেচা হলে চালের দাম কেজিতে ১০ টাকা কারসাজি করলে ভোক্তার পকেট থেকে বেরিয়ে যায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এমনি করে চিনিতে ৪ হাজার কোটি, তেলে ৭ হাজার কোটি, ডালে ২৫০০ কোটি আর লবণে ৬০০ কোটি টাকার কারসাজি হয় বাজারে। এই দ্রব্যমূল্যের আঘাত ও সিন্ডিকেটবাজির বিরুদ্ধে বাম দলগুলোর হরতাল দেখে লজ্জা পেয়েছেন কোনো কোনো মন্ত্রী। মানুষের প্রশ্ন এই লজ্জা দুর্নীতি, সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো, দেশ থেকে টাকা পাচার, সরকারি অর্থের অপচয় দেখে যদি পেতেন তাহলে দেশের মানুষ উপকৃত হতো। লজ্জা একটি ভালো গুণ কিন্তু তা তো পেতে হবে প্রয়োজনীয় জায়গায় এবং কাজে। দাম কেন বাড়ে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আয় কতটা বেড়েছে আর বিদেশে দাম কতটা বেড়েছে সেই আলোচনায় সঠিক উত্তর মেলে না। বিভ্রান্ত হয় বিপদগ্রস্ত মানুষ আর প্রশ্রয় পায় সুবিধাভোগীরা। প্রশ্নের শক্তিকে অবজ্ঞা করে অসত্য উত্তর দিয়ে সাময়িক সাফল্যপ্রাপ্তি কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি কোথাও গণতন্ত্র থাকবে না। 

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত