দুর্নীতির টাকায় বাগানবাড়ি

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩০ এএম

মাদারীপুর সদরের টিবি হাসপাতাল রোডে ৩০০ শতাংশ জমিতে দুর্নীতির টাকায় বাগানবাড়ি নির্মাণ করেছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সাবেক সচিব সাইফুল হাসান বাদল। তিনি বাড়ি নির্মাণের জন্য জোর করে স্থানীয়দের কাছ থেকে ২০০ শতাংশ জমি নামমাত্র মূল্যে কিনেছেন। মাদারীপুরে তিনি আরও ৫-৬ একর জমি কিনেছেন। সচিব থাকাকালে তিনি এসব জমি কেনায় প্রভাব খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওই সচিবের স্ত্রী রাজধানীর একটি স্কুলের শিক্ষিকা। অভিযোগ রয়েছে, তিনিও দুর্নীতির টাকায় ঢাকার আফতাবনগর ও উত্তরখানে প্লটের মালিক হয়েছেন।

আয়কর নথি অনুযায়ী সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইফুল হাসান বাদল জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি ও সঞ্চয়পত্র প্রভৃতি বাবদ ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকার সম্পদের মালিক। তার স্ত্রীরও রয়েছে প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ টাকার সম্পদ। তবে তার কাগজে-কলমের হিসাব, আর মাঠপর্যায়ের হিসাবে ভিন্নতা রয়েছে। বাস্তবে সচিবের মাদারীপুরে প্রায় ৩০০ শতাংশ জমির ওপর কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল বাগানবাড়ি রয়েছে। একই এলাকার পূর্ব টুবিয়া মৌজায় ৫ থেকে ৬ একর জমিসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে তার। এ ছাড়া তার নারায়ণগঞ্জে দুই একরের বেশি ও মুন্সীগঞ্জে প্রায় তিন একর জমি এবং ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। সরকারি নথিতে ঘোষিত সম্পদ এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে তার সম্পদের ব্যবধান অনেক। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ তথ্য ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার সৈদারবালী মৌজার টিবি হাসপাতাল রোডে সাবেক সচিবের স্ত্রী ও মায়ের নামে প্রায় ৩০০ শতাংশ জমি রয়েছে। ওই জমির আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা। সেই জমির ওপর বিলাসবহুল বাগানবাড়ি নির্মাণ করেছেন সচিব সাইফুল হাসান বাদল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাইফুল হাসান বাদল সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় ২০০ শতাংশ জমি বেচতে বাধ্য করেছেন। সেই জমি তিনি কম দামে কিনেছেন।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব টুবিয়া মৌজায় সাবেক স্বাস্থ্য সচিবের নামে প্রায় ৫ থেকে ৬ একর জমি রয়েছে। মাদারীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় তার নামে-বেনামে আরও বিপুল সম্পদ রয়েছে। সাবেক স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে শুধু সম্পদ অর্জন নয়, সরকারি পদে থাকার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জমি দখল ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও করা হয়েছে। মাদারীপুরের স্থানীয় মানুষের জমি জোর করে দখল করে তার কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সচিব সাইফুল হাসানের ঢাকার লালমাটিয়ায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। স্টার রেসিডেন্স নামের ৩/১৩এ, ব্লক-বি-এর এ-৫ নম্বর ফ্ল্যাটটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। বর্তমানে তিনি সপরিবারে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ঢাকা মেট্রো গ-২৬-৮১৬৮ নম্বরের একটি গাড়ি রয়েছে। ২০২৩-২০২৪ করবর্ষের আয়কর নথিতে গাড়িটির মূল্য ২৫ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। বাস্তবে তার সম্পদের প্রদর্শনকৃত মূল্য থেকে বাজারমূল্য কয়েকগুণ বেশি।

আয়কর নথিতে সম্পদের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক স্বাস্থ্য সচিবের ২০২৩-২০২৪ করবর্ষের আয়কর নথি অনুযায়ী আফতাবনগর হাউজিংয়ের ৩ নম্বর রোডের ৫২ নম্বর প্লটের মালিক তিনি। প্লটের মূল্য প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, অথচ আয়কর নথিতে মূল্য দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে প্লটটিতে একটি আটতলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া লালমাটিয়া হাউজিংয়ে ৫ দশমিক ৮৭ কাঠা জমিসহ একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সঞ্চয়পত্রে তার বিনিয়োগ ২৫ লাখ টাকা। আশা সমবায় সমিতিতে তার ১১ শতাংশ জমি রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ লাখ টাকা। তার অন্যান্য অকৃষি জমির মূল্য ১ লাখ ৩ হাজার ২০০ টাকা। সব মিলিয়ে তার মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫২ টাকা। তিনি সম্পদের হিসাবে তার মাদারীপুরের বাগানবাড়ি, পূর্ব টুবিয়ার জমি এবং নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের জমির তথ্য উল্লেখ করেননি।

স্ত্রীকেও বানিয়েছেন কোটি টাকার মালিক : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সচিবের স্ত্রী সাহিনা আক্তার পেশায় একজন সিনিয়র শিক্ষিকা। তিনি ধানম-ির কাকলী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে কর্মরত। তার ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের আয়কর নথিতেও একাধিক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ থাকার তথ্য রয়েছে। আয়কর নথি অনুযায়ী, তার নামে উত্তরখান মৌজায় ৬ কাঠা জমি রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৬৬০ টাকা। এ ছাড়া তার যে অকৃষি জমি আছে সেটির মূল্য ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আয়কর নথিতে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দেখানো হলেও বাস্তবে তার মূল্য আরও বেশি। তিনি স্বামীর সহায়তায় এসব সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, সাইফুল ইসলাম বাদল সহকারী কমিশনার ভূমি হিসেবে নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারে ৩ বছর, এরপর মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে ২ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি ২০২১ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অবসর গ্রহণ করেন।

অভিযোগ করা হয়েছে, সাইফুল ইসলাম বাদলের বাবা রজ্জব আলী মোল্লা ছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী লোক। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রীয় তালিকাভুক্ত রাজাকার। তার বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালের ২২ এপ্রিল কালকিনি থানায় মামলা করা হয়েছিল এবং জিআর মামলা ছিল।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাইফুল হাসান বাদলের ব্যক্তিগত মোবাইলফোনে কল দেওয়া হলে তিনি ফোনকল কেটে দেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত