শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের আশঙ্কা দীর্ঘদিনের। মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রশ্নে আমরা যেন ধুঁকছি অনেকদিন ধরে। করোনারভাইরাস গত দুই বছর শিক্ষাব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল। প্রায়শই বলা হয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক মনন গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য আচরণের পরিবর্তন কিন্তু আচরণের পরিবর্তনের জন্য প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক উদ্যোগের ঘাটতি আছে এবং একইসঙ্গে ঘাটতি শিক্ষার্থীর জন্য সহায়ক পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তৈরিতে।
শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একজন শিক্ষার্থীকে বিবেকবান এবং একইসঙ্গে যৌক্তিক মানুষে রূপান্তর করা। যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার নিজের ওপর কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এমনিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত যেখানে এদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সাধারণ সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা, হালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারিগরি শিক্ষা। ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন। ফলে শিক্ষার এই ভিন্ন ধারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন রেখা তৈরি করে যা মোটেও সামাজিক সম্প্রীতি ও সামাজিক শক্তি তৈরিতে সহায়ক না। আবার প্রায় সবগুলো ধারাতেই লার্নিং ও টিচিং-এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর যে পর্যায়ে যে দক্ষতাগত পরিবর্তন আনা দরকার তা আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। বলাবাহুল্য সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় কারিকুলাম ভিন্ন, শিক্ষার পদ্ধতিও ভিন্ন এবং ফলাফল ভিন্ন।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সবকিছুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক না। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানসম্পন্ন কারিকুলাম, লার্নিং-টিচিং পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, শিক্ষার পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক সুযোগ-সুবিধা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি গণমাধ্যমও সার্বিকভাবে শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যপক ভূমিকা রাখে। অনেকেই বলে থাকেন বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না। আবার কর্মসংস্থান তৈরির জন্য আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখে যে দক্ষতা অর্জন করা দরকার তা করতে পারে না বলে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, গবেষণা বলে আমাদের দেশে যে যত বেশি উচ্চ সার্টিফিকেটধারী তার বেকার থাকার সম্ভাবনা তত বেশি।
বিভিন্ন পর্যায়ে গোঁড়ামি ও প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত হওয়া শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য অর্জনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু সফল হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। দক্ষতার ঘাটতির পাশাপাশি, বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রথাগত চর্চার কারণে শিক্ষাব্যবস্থা এই উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যালয়ে একের পর এক ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিকুলামে একে তো আছে পুরুষতন্ত্রের ছাপ, তারপরও গোষ্ঠী বিশেষের চাপে কারিকুলাম পর্যন্ত পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। এখন আবার যুক্ত হয়েছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার আতঙ্ক। উদ্দেশ্যও পরিষ্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার যে অভিযোগগুলো এসেছে তার প্রায় সবগুলো ঘটনাই ঘটেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে। ধর্মীয় বিভাজন শুধু আমাদের দেশেই না, সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতেও শিক্ষার্থীর হিজাব পড়াকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। এখনো আমাদের চোখের সামনে কর্নাটকের ছাত্রী মুসকান খানের প্রতিবাদ ভেসে ওঠে।
করোনার কারণে গত দুই বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ থাকলেও, গোঁড়ামির চাষবাস বন্ধ থাকেনি, যদিও এই প্রক্রিয়া গত দুই বছরের না তা বলাই বাহুল্য, ততোধিক বছর ধরে। গত বছর সারা দেশের বিভিন্ন পূজামন্ডপে হামলার কথা আমরা এখনো ভুলে যাইনি। স্পষ্টতই আমাদের সমাজ এক ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে একশ্রেণির মানুষ উগ্র আচরণকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইছে ও প্রশ্রয় দিচ্ছে। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উত্থাপনের মধ্য দিয়ে।
মনের মধ্যে অজানা আশঙ্কার জন্ম নিচ্ছে, এই পরিস্থিতি সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা চূড়ান্ত ধ্বংসের চক্রান্ত কিনা? যেখানে কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে বাহাসে যুক্ত হতে দেখা যায় এবং আরও আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে তা আবার মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা হয়। অনেকেই বলছেন এই ঘটনাগুলোর পেছনে বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য জড়িত আছে। কারও কারও ব্যক্তিস্বার্থ জড়িত আছে হয়তো কিন্তু তার থেকেও বড় বিষয় হচ্ছে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সাম্প্রতিক এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আর কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করবে, না খোলামেলা আলোচনা করার সাহস পাবে? আর ধর্মীয় সংখ্যালঘু হলে তো কথাই নেই। এমনিতেই শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে আশঙ্কার কোনো শেষ নেই, তারপরে এ ধরনের একের পর এক ঘটনা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যাবে তা বিবেচনার দাবি রাখে। সম্পতি জামিনে মুক্ত হয়ে ঘটনার শিকার মুন্সীগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল বলেছেন শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করতে না পারলে সে আবার কেমন শিক্ষক। এটা অবশ্যই একজন শিক্ষকের কাছ থেকে যথার্থ দায়িত্ববোধের পরিচয়। যে শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল তারাও কোনো না কোনোভাবে প্ররোচিত হয়েছে তা সহজেই বোঝা যায়।
শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে খোলামনের আলোচনা শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম, বিজ্ঞান, সমাজ ও সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এতে শিক্ষার্থী কারিকুলামের পাশাপাশি নতুন নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পাবে এবং এক সময় নিজেই খুঁজে নিতে পারবে কোনটা ঠিক। পাশাপাশি সমাজের বহুপক্ষীয় মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে শিখবে।
ভিন্ন মত, পথ ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সম্মান করা কখনো অধর্ম হতে পারে না বরঞ্চ হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণই ধর্মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। আমাদের সবাইকেই বুঝতে হবে সংঘাত তৈরি করে কখনো একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা যায় না। সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার জন্য চাই সহনশীলতা, ভিন্নমত ও পথ থাকা সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
