যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও জ¦ালানির স্বার্থরক্ষায় ১৯৫৩ সালে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে। ফলে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয় ইরানের নির্বাচিত সরকার। ৭০ বছর পরও সে ঘটনার অনুরণন দেখা যাচ্ছে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জাীবিত করার চেষ্টা ফের শুরু হয়েছে। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা এ নিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে ৪০ বছরের বেশি সময়ের তীব্র অবিশ্বাস নিরসনের অন্যতম উপায় হিসেবে ধরা হচ্ছে একে। আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলার ভয়ও রয়েছে। এটি হলে ইরান ও তার মিত্রদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে সহিংস প্রতিশোধের ঢেউ। এমন পরিস্থিতিতেও দুই দেশের আলোচনায় বরাবরের মতোই আস্থার অভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। দুটি দেশ ঘনিষ্ঠভাবে বেড়ে ওঠা, সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাসকে লালন করার এমন নজির বিংশ শতাব্দীতে আর নেই। উভয়পক্ষের সম্পর্কে গভীর এই ক্ষতের উৎপত্তি আসলে অন্য গল্পে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তেলের স্বার্থরক্ষায় ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে ইরানের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করেছিল। সেই অভ্যুত্থানে ইরানের রাজবংশের শেষ রাজা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে (সংক্ষেপে শুধুই শাহ) ক্ষমতায় বসানো হয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহের পতনের পর দু’দেশের সম্পর্ক শুধু তিক্তই হয়েছে, প্রায় ৭০ বছর আগে যার শুরু।
সংকটের শুরু
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক, ছিল শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। তবে ১৯৫১ সালের মার্চে ইরান সরকারের তেল জাতীয়করণ করা পশ্চিমের কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে আসে। এই সময়েই তৃতীয় বিশ্বের প্রত্যক্ষ ও আধা-প্রত্যক্ষ উপনিবেশগুলো একে একে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করছিল। ব্রিটিশরা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে শাসন না করলেও ১৯৪০ এর দশকে এর বেশিরভাগ অংশ দখল করে এবং যুক্তরাজ্যের অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানি ১৯০৯ সাল থেকে দেশটির বিশাল তেলের ভাণ্ডারের প্রায় সব মুনাফা যতভাবে সম্ভব শুষে নিয়ে আসছিল।
ইরানকে পশ্চিমা আধিপত্য থেকে বের হতে এবং প্রকৃতপক্ষেই উন্নয়নের কোনো সুযোগ তৈরি করতে চাইলে নিজের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে হতো। আর এটিই ছিল ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ও তার প্রধান সহযোগী হোসেন ফাতেমির একক উদ্দেশ্য। মাত্র ৩৩ বছরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া ফাতেমির চেষ্টায় আইনপ্রণেতা, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, ধর্মগুরু ও সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে একটি ন্যাশনাল ফ্রন্ট গঠন করে ইরানের তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। কিন্তু ইরানের এই গণতান্ত্রিক বিজয় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক স্বার্থে চরম আঘাত হানে। তারা গোপনে একমত হয়, অন্য দেশ যাই করুক, ইরানকে তেলের বিষয়ে স্বাধীন হতে দেওয়া যাবে না। যুদ্ধের ক্ষতি থেকে নিজেকে উদ্ধারে যুক্তরাজ্যের ইরানের সস্তা তেলের খুব প্রয়োজন ছিল। তবে এর কোনো কিছুই প্রকাশ্যে বলা যায় না। চরম দারিদ্রসীমার নিচে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি দেশের তেল নিয়ে নীলনকশা সব জায়গায় সমালোচিত হতো। সেই জায়গা থেকেই ‘অপারেশন এজাক্সের’ পরিকল্পনা করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকি থেকে ইরানকে বাঁচানোর নামে দেশটির স্বাধীন ও একরোখা প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুত করা হয়। পুরো পরিকল্পনাটিকে উপস্থাপন করা হয় সমাজতন্ত্রের বেড়ে ওঠা প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে।
জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যকে তুলোধুনো
মোসাদ্দেক ও ফাতেমি তেল জাতীয়করণের লড়াইকে ১৯৫১ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘে নিয়ে যান। সেখানে যুক্তরাজ্যকে তুলোধুনো করেন মোসাদ্দেক। তৃতীয় বিশ্বের নেতাদের মধ্যে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের, কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের আগে মোসাদ্দেকই প্রথম জাতিসংঘে জাতীয়তাবাদী ভাষণ দেন। সাবলীলভাবে ফরাসি ভাষায় কাউন্সিলের সামনে ইরানের সম্পদ নিয়ন্ত্রণের সার্বভৌম অধিকারের কথা তুলে ধরেন। ‘যুক্তরাজ্য বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করছে ভেড়ার বাচ্চা নেকড়েকে খেয়ে ফেলছে’ বলে উপহাসও করেন। এরপর দেশের পর দেশ ইরানকে সমর্থন দেয় এবং আলোচনা সেখানেই শেষ হয়ে যায়। ইরানে ফিরে মোসাদ্দেকের সরকার ব্রিটিশ কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনে বহিষ্কার করে। যুক্তরাজ্যের গোপন গোয়েন্দা বাহিনী এম১৬-এর প্রতিনিধিরা আত্মগোপনে চলে যান। ব্রিটিশ দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিপরীতে যুক্তরাজ্য ইরানের ওপর নানা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
একাট্টা যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র
ইরান থেকে বিতাড়িত হয়ে যুক্তরাজ্য সুযোগ খুঁজছিল এবং তা খুব দ্রুতই পেয়ে যায়। ১৯৫২-৫৩ সালে লন্ডন ও ওয়াশিংটনে রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় আসে। রিপাবলিকান ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ডেমোক্রেটিক হ্যারি ট্রুম্যানের স্থলাভিষিক্ত হন। আর যুক্তরাজ্যে উইনস্টন চার্চিল লেবার সরকারকে সরিয়ে রক্ষণশীলদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন। এই দুই পক্ষই ইরানের ভাগ্যকে নিজেদের হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। অপারেশন এজাক্স কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়। ইরানের তুলনামূলক উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ ও স্বাধীন সংবাদ ব্যবস্থা দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে খেপাতে সিআইয়ের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়। বর্তমানে বিশ্বে মিথ্যা সংবাদের শক্তি সবার কাছে পরিচিত। তবে ১৯৫৩ সালে এ বিষয়ে খুব কম মানুষই সচেতন ছিলেন। সিআইএ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ২০টিরও বেশি সংবাদপত্রকে অর্থ দিয়েছিল। আর ইরানের চার-পঞ্চমাংশ সংবাদপত্রকে ঘুষ দেওয়া হয় বলে ধারণা করা হয়। এসব গণমাধ্যমে এমনভাবে সংবাদ প্রচার করা হতো যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানকে দ্রুত নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিচ্ছে এবং ইরানের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি তুদেহ এর জন্য দায়ী। অপারেশন এজাক্স পরিচালনার দায়িত্ব পান সিআইয়ের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের প্রধান কারমিট রুজভেল্ট (কিম)। ধূর্ত ও বুদ্ধিমান কিম ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্টের নাতি। প্রথম দিকে সিআইএ পরিচালনা করা পরিবারের সদস্য কিমের ওপর সংস্থাটির প্রধান অ্যালেন ডুলেসেরও পূর্ণ আস্থা ছিল। ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব পাওয়ার পর রুজভেল্ট জুনের শেষ দিকে লন্ডনে চার্চিলের সঙ্গে দেখা করেন। পররাষ্ট্র দপ্তরে ওই বৈঠকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের পরিমার্জন করা ওয়াশিংটনের খসড়ায় অপারেশন এজাক্সের বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আগস্ট ১৯৫৩, তেহরান
ইরানের রাজধানী যেন ছিল জ্বরে আক্রান্ত। সংবাদপত্রগুলো ভর্তি ছিল সরকারকে গালিগালাজ করা শিরোনামে. পার্লামেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল আর রাস্তা দখল করেছিল ভাড়া করা গু-ারা। তারা সেøাগান দিচ্ছিল, ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’। বাহ্যিকভাবে শহরের জামশিদ স্ট্রিটে লাল ইটের মার্কিন দূতাবাসকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন সব অশান্তি থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে গোপনে সিআইএ এবং এম১৬-এর মাঠকর্মীরা শহর চষে বেড়াচ্ছিল। তারা সম্পাদকদের কিনছিলেন, সংসদ সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদেরও ঘুষ দেওয়া হচ্ছিল। ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের নির্ধারিত দিনের আগে রেজা শাহের বাড়ি সাদাবাদ প্রাসাদের মাঠে পার্ক করা একটি গাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করেন কারমিট রুজভেল্ট। সেখানে তিনি শাহকে জানান, আইজেনহাওয়ার ও চার্চিল অভ্যুত্থানে সমর্থন দেবেন। গাড়ির ভেতরে তারা প্রয়োজনীয় অর্থ ও মিত্রদের বিষয়ে কথা বলেন। শাহ যদি অভ্যুত্থানে সহযোগিতা না করেন তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজের মতো ব্যবস্থা করবে বলে হুমকিও দেন কিম। তবে অনুমিতভাবেই, প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে অপসারণের ডিক্রিতে স্বাক্ষর করতে সম্মত হন শাহ। নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের আরেকটি ডিক্রি দিতেও রাজি হন।
ব্যর্থ অভ্যুত্থান
অবশেষে ১৫ আগস্ট আসে। মধ্যরাতের পরপরই ফাতেমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মোসাদ্দেক আগেই খবর পেয়ে শত শত সেনা বাড়ির চারপাশে অন্ধকারে জড়ো করেন। শাহের রাজকীয় বাহিনীর প্রধান কর্নেল নেমাতুল্লাহ নাসিরির বাহিনী সেখানে যাওয়ার পরপরই গ্রেপ্তার হয়। রাত ১টার মধ্যেই অভ্যুত্থান সব চেষ্টা নস্যাৎ হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে অপারেশন এজাক্স ব্যর্থ হওয়ার কথা জানতে পেয়ে শাহ বিকেলেই দেশ ছেড়ে পালান।
অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার তথ্য পেয়ে রুজভেল্ট ভার্জিনিয়ার ল্যাংলিতে সিআইএ সদর দপ্তরে যোগাযোগ করার পর সংস্থা প্রধান ডুলস আদেশ দেন, ‘হাল ছেড়ে দাও এবং এখনই বেরিয়ে যাও।’ তবে রুজভেল্ট তেহরান থেকে ফিরতি বার্তায় জানান, তিনি থাকছেন এবং সব ঠিক করে ফেলবেন।
এদিকে ১৬ তারিখ সকালে ফাতেমি শরীরে জ্বর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে যান। সেখানে দেখতে পান, মোসাদ্দেক মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শাহের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের রাস্তা খুঁজছেন। রাজতন্ত্রের বিরোধী এবং অভ্যুত্থানে যুক্ত কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পক্ষে থাকা ফাতেমির সঙ্গে এ নিয়ে মোসাদ্দেকের মনোমালিন্য হয়। হতবাক ও অপমানিত হয়ে কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় ফাতেমি শুধু বলেন, ‘রাজতন্ত্রের বিশ্বাসঘাতকতার পর আপনি যে আইনি পন্থা নিচ্ছেন, তা বাস্তবসম্মত নয়। এটা আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।’
মোসাদ্দেকপন্থিদের সমাবেশ
অভ্যুত্থান চেষ্টার পরদিন সন্ধ্যায় মোসাদ্দেকপন্থি বিশাল জনতা পার্লামেন্ট স্কয়ারে জমায়েত হয়। প্রধানমন্ত্রীকে কথামতো কাজ করাতে ব্যর্থ হয়ে ফাতেমি এই জনতার কাছে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজতন্ত্রের অবসান এবং অভ্যুত্থানের ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ বিচারের জন্য দাবি জানাতে সরাসরি আবেদন করেন। এমন পরিস্থিতিতে রুজভেল্ট বুঝতে পারেন, শাহের পক্ষে সবকিছু নিয়ে যাওয়ার জন্য তার কাছে খুব অল্প সময় রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বেসমেন্টে কার্যালয় স্থানান্তর করেছিলেন। ১৭ আগস্ট সকাল ৭টার দিকে সিআইএর স্টেশন প্রধান তেহরানের পার্ক হোটেলে অবস্থান করা নিউ ইয়র্ক টাইমস ও এপির দুই আমেরিকান সাংবাদিককে ডেকে তুলে উত্তর তেহরানের একটি বাড়িতে যেতে বলেন। সেখানে অপারেশন এজাক্স অনুযায়ী কারমিট রুজভেল্টের ঠিক করা প্রধানমন্ত্রী জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদি তাদের ১৫ আগস্টের রাতের ‘বাস্তব’ বিবরণ শোনাবেন বলে জানানো হয়। তবে জাহেদি আগেই আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তার ছেলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিককে শাহের রাজকীয় ডিক্রির একটি অনুলিপি ও তার বাবার একটি জাল লিখিত সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে জাহেদি দাবি করেন, তিনিই আসল প্রধানমন্ত্রী।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
১৭ আগস্ট সকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেন্ডারসন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। টানা এক ঘণ্টার বৈঠকে তিনি সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন। এরপরই কূটনৈতিক নাটক শুরু করেন তিনি। হেন্ডারসন মোসাদ্দেকের কাছে দাবি করেন, ইরানজুড়ে শিশুসহ মার্কিন নাগরিকদের লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। হামলাও হয়েছে। এখনই এসব বন্ধ করা না হলে ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দিতে হবে। কিছুটা হুমকির সুরে এটিও বলেন, তিনি শুনেছেন মোসাদ্দেক আর আইনত প্রধানমন্ত্রী নন। মোসাদ্দেক কি নিশ্চিত যে, তিনিই রাষ্ট্রের বৈধ কর্র্তৃপক্ষ? নিজের বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়ে এরপর মোসাদ্দেক যা করেন, সেটিই তাকে শেষ করে দেয়। রাস্তায় একত্র হওয়া হাজার হাজার ইরানি সমর্থক এবং ফাতেমির জোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মোসাদ্দেক ফোন করে পুলিশকে তার নিজের সমর্থকদের সরিয়ে দিতে বলেন।
মোসাদ্দেকের পতন
১৯ আগস্ট ভোরে তেহরান ছিল একদম শান্ত। মোসাদ্দেকের নির্দেশে সব বিক্ষোভকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এর আগের রাতে সিআইএ যা করার করে ফেলে। ওইদিন ইরানের ছয়টি প্রধান পত্রিকা প্রথম পৃষ্ঠায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণার একটি রাজকীয় ডিক্রি ছাপায়। ব্রিটিশ এজেন্টদের ভাড়া করা গুণ্ডাবাহিনী সকাল ৮টার দিকে বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে বাজারগুলোতে সমবেত হয়। তারা মোসাদ্দেক বিরোধী সেøাগান দিয়ে, পথচারীদের মারধর এবং লুটপাট করতে করতে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। তাদের থামাতে হেন্ডারসনের অনুরোধে মোসাদ্দেক সেনাবাহিনীকে মাঠে নামান। সেই সুযোগে শাহের অনুগত সেনারা মূল অভ্যুত্থানের জন্য শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তারা বিভিন্ন ব্যারাকে মোসাদ্দেকপন্থি কমান্ডারদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বিকেলের মধ্যে ২৪টি ট্যাঙ্ক প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির কাছে একত্র হয়। তারা হামলা শুরুর পর প্রধানমন্ত্রী, ফাতেমি এবং বেশ কয়েকজন মন্ত্রী পাশের বাগানের প্রাচীর পার হয়ে পালান। তবে জানতেন, পালিয়ে শেষ পর্যন্ত লাভ নেই। পরে সবাইকেই গ্রেপ্তার করা হয়।
দুপুর ২টার দিকে রেডিও তেহরানে ঘোষণা করা হয়, মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করার জন্য শাহের আদেশ কার্যকর করা হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন জাহেদি। মহামান্য শাহ বাড়ি ফেরার পথে। এটিও ঘোষণা করা হয়, জনতা ফাতেমিকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেছে। শাহ ২২ আগস্ট নিজ বিমানে বিজয়ীর বেশে তেহরানে ফিরে আসেন। তাকে অভিনন্দন জানান হেন্ডারসন, জাহেদি, গু-া দলের নেতা শাবান দ্য ব্রেনলেস এবং পার্লামেন্টের চেয়ারম্যান আয়াতুল্লাহ কাশানি। কিছুদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের তেল কোম্পানিগুলোর ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ ভাগাভাগির ২৫ বছরের চুক্তি বাতিল করেন শাহ।
১৯ আগস্ট অভ্যুত্থান পরবর্তী ঘোষণায় ফাতেমির মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হলেও তিনি মারা যাননি। বন্ধুদের সহায়তায় কয়েক মাস আত্মগোপনে থাকার পর তাকে তেহরানের একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে শত নির্যাতনেও ফাতেমি তার প্রত্যয়ে অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিচার শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই বছরের ১০ নভেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৈন্যরা যখন তাদের রাইফেল তুলছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সাংবাদিক, ঔপনিবেশিকবিরোধী এ যোদ্ধা গর্জন করে বলেন, ‘স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক! মোসাদ্দেক দীর্ঘজীবী হোক!’
