‘তারা জানে কীভাবে বেঁচে থাকাকে অর্থবহ, দেশকে বিশেষ করা যায়’

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২২, ০৬:০১ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বেশ সক্রিয় বিশিষ্ট অভিনেতা আফজাল হোসেন।

শুক্রবার তিনি একটি পোস্ট দিয়েছেন। বাঙালি মুসলমান, ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেছেন সেখানে।

তার সেই পোস্ট এখানে তুলে ধরা হলো—

‘কোটি টাকায় বিয়ে, লাখ টাকায় কোরবানির গরু, হাজার টাকায় সেহরী বা ইফতার- বছর জুড়ে এসব নিয়ে প্রায়ই গল্প শুনতে হয়। টাকার গল্প, টাকা ওড়ানোর নানা উপলক্ষের গল্প বয়ান করে গৌরব প্রকাশ করা এখন বহু মানুষের অতি প্রিয় বিষয়।

এ দেশে জন্মগ্রহণ করা মানুষদের মর্যাদা গৌরবের বিষয় কি, কি এবং কেন- তা নিয়ে বহুজন এখন মোটেও মাথা ঘামায় না। এরা যে কোনো উপলক্ষ পেলে কলকল ছলছল করে- উদ্‌যাপনের আনন্দে নয়, আরও একবার টাকার দামে মর্যাদা ক্রয়ের সুযোগ মিলেছে বলে।

হিন্দি ছবির কারণে উঁচু স্তরে পৌঁছাতে চাওয়া বাঙালিদের বিবাহ অনুষ্ঠান বদলেছে। অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার, নামের ভক্তও হয়ে উঠেছে তারা। এ সে অজুহাতে প্রায়ই শোনা যায়, সব্যিয়াসাচী কিনলাম।

অস্তিত্ব সংকটে পড়া হতভাগা বাঙালি ভাবে, বাংলা নাম সব্যসাচী উচ্চারণ করলে ঠিকঠাক মর্যাদা বৃদ্ধি হবে না- তাই হিন্দির ঢঙে সব্যিয়াসাচী উচ্চারণ করে। এরা একদিকে অশুদ্ধ উচ্চারণে নিজের ভাষায় কথা বলে প্রমাণ দেয় কতটা অজ্ঞান, রুচিহীন অন্যদিকে অপরের ভাষা অতি শুদ্ধ উচ্চারণের চেষ্টা করে বুঝিয়ে দিতে চায়- দেখো কত আধুনিক, উঁচু স্তরের আমরা।

দিনে দিনে এই অস্তিত্বের সংকট বেড়েই চলেছে, তাই বলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। দেশটা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিল। একশো রকম হতাশা বৃদ্ধির পাশাপাশি আজও রক্ত ঘামের বিনিময়ে বহু মানুষ আশা উদ্দীপনা জাগিয়ে রেখেছে। টাকা তাদের মাথা খায়নি। তারা অহংকার, গৌরব, মর্যাদা, স্বপ্ন, সার্থকতা এসবের প্রকৃত মানে জানে ও বোঝে। তারা জানে কীভাবে বেঁচে থাকাকে অর্থবহ, দেশটাকে বিশেষ করে তোলা যায়।

এবারের ঈদে কতগুলো উদাহরণ চোখের সামনে এসেছে। বিস্মিত এবং আনন্দিত হয়েছি। এগুলো আমরা করেছি, আমাদের দেশের! চামড়ার তৈরি পণ্য, শাড়ি চুড়ি, অন্যান্য পোশাক- তার নকশা, ভাবনা দারুণ এক উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বাড়িতে বসে আচার, ঘি, কুলফি ইত্যাদি অসংখ্য প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। সেসবের মান, স্বাদ ও উপস্থাপনা সত্যি গৌরব করার মতো।

নিজের স্বার্থ ষোলো আনা বুঝে নিতে একদল মানুষ যা খুশি তাই করছে আর একদল মানুষ আশায় বুক বেঁধে নিজ নিজ নিষ্ঠা, সততা ও সাধ্য অনুযায়ী স্বপ্নপূরণ করে চলেছে। অনুভব করা যায়, প্রত্যেকেই খুব একা। এ দেশে নতুন কিছু করতে চাইলে সহযোগিতার আশা করা যায় না। তবু মানুষ এগিয়ে চলেছে। দেশ গৌরব আর মর্যাদা যে কর্মে ও কর্মের ধর্মে- তা এই অসীম মানুষেরা জানে।

একটা সামান্য উদাহরণ- ওপরের অলংকারটা। কাপড়, সুতা আর কড়ি দিয়ে তৈরি। বাজারে এ রকম অলংকারের চাহিদা কেমন- তার হিসাব কষলে এ রকম একটি সৃষ্টির পেছনে মানুষ সময় ব্যয় করত না। সুন্দর টিকে থাকে প্রেমে, বিশ্বাসে, শুদ্ধতায়- অস্তিত্ব প্রকাশের আগ্রহে।

অস্তিত্বহীন মানুষদের টিকিয়ে রাখে টাকার গন্ধ। সে গন্ধ ক্রমাগত ছড়িয়ে দিয়ে দিয়ে তাদের সুখ মেলে। বোকা সুখের এই নষ্টকান্ডে প্রতিদিন নাকানিচুবানি খায়, খাচ্ছে সাধারণ। ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলে- শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর এটা আক্রমণ। আসলের ওপর নকলের হামলা। এই আক্রমণ বা হামলাকে অন্যায় বা দোষ বলে ধরা হচ্ছে না, হবে না। কি চমৎকার তামাশা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত