ছাত্রলীগের কর্মীকে ঘুমন্ত অবস্থা থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর অস্ত্র ও মাদক দিয়ে গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগ উঠেছে (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) র্যাব-৮ এর বিরুদ্ধে।
গ্রেপ্তার ওই ছাত্রলীগ কর্মীর পরিবার র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে।
এর আগে সোমবার (৩০ মে) বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা বাজারের একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী সজিব সরদারকে আটক করে র্যাব-৮ এর সদস্যরা। পরদিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ইয়াবাসহ তাকে উদ্ধার করা হয় জানিয়ে দায়ের মামলায় সজীবকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে বরিশাল কারাগারে পাঠানো হয়। সজিব উপজেলার মুড়িহার গ্রামের ইউনুস সরদারের ছেলে।
মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমে র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে সজীব জানায়, তার বিছানার নিচে আগ্নেয়াস্ত্র ও ইয়াবা রক্ষিত আছে। পরে তার বিছানার নিচ থেকে একটি দেশে তৈরি শুটার গান, শুটার গানের দু রাউন্ড গুলি এবং ২৯০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র্যাব।
এ ঘটনায় র্যাব-৮ এর ডিএডি আনসার আলী বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাতে সজিবসহ পালিয়ে যাওয়া অপর চারজনকে আসামি করে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেন।
র্যাব আরো জানায়, গ্রেপ্তার সজিবের বিরুদ্ধে আগৈলঝাড়া থানায় হত্যা মামলাসহ চারটি এবং বরিশাল মেট্রোপলিটন থানায় একটিসহ মোট ৫ মামলা রয়েছে।
তবে র্যাবের ওই দিনের অভিযানের বিষয়ে গ্রেপ্তার সজিবের স্ত্রী সৈয়দা নওরীন জাহান মৌ বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে তার স্বামীকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দা নওরীন জাহান মৌ বলেন, সোমবার (৩০ মে) রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমি, আমার পরিবার ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাসায় ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। এ সময় বেশ কয়েকজন লোক আমার বাসার দরজা খুলতে বলে। আমি খুলে দেখি ২৫/৩০ জনের একটি দল। আমি জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে আমরা র্যাব। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি আপনার বাসায় কেন আসছেন, কিন্তু তারা কোনো উত্তর দেয়নি। পরবর্তীতে আমার স্বামী মো. সজিব সরদারকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তারা আমাকে বলে মঙ্গলবার সকাল ৮টার সময় থানায় যোগাযোগ করবেন। থানায় যোগাযোগ করলে থানা কর্তৃপক্ষ বলে তারা এ বিষয়ে কিছু জানে না।
মৌ বলেন, যখন আমার স্বামীকে বাসা থেকে তুলে নেয় তখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ ও তার সঙ্গে কোনো কিছু পায়নি র্যাব। বুধবার আমরা জানতে পারি, তাকে আগৈলঝাড়া থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। পরে আমি ও আমার পরিবার থানায় গিয়ে দেখি সজিবের শরীরে বিভিন্ন স্থানে ফুলা, জখম ও রক্তাক্ত এবং দুই হাঁটুতে ব্যান্ডেজ। আমি থানা কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করলে তারা আমাকে বলে আপনার স্বামীর সঙ্গে অস্ত্র, ইয়াবা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাকে ছাড়া যাবে না।
তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, এলাকার কতিপয় সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, চোর-বাটপার মিলে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে র্যাব দ্বারা আমার স্বামীকে ধরিয়ে তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন করে তাকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমি আমার স্বামীর মুক্তি চাই। আর যারা তাকে ফাঁসিয়েছে, যে সব মামলা দিয়েছে তার সঠিক তদন্ত চাই। যাতে এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার হয়।
এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
জানা গেছে, আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের গৈলা বাজার সংলগ্ন প্রভাতী ভবনে সোমবার (৩০ মে) মাঝরাতে অভিযান চালিয়ে সজিব সরদার নামে একজনকে আটক করে র্যাব-৮ এর একটি টিম। র্যাব দাবি করেছে, আটক যুবকের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে ৩৯০ পিস ইয়াবা, একটি ওয়ান শুটার গান, শুটার গানের দুটি কার্তুজ জব্দ করা হয়। এরপর আটকের বিরুদ্ধে র্যাবের ডিএডি আনসার আলী বাদী হয়ে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা দিয়ে থানায় সোপর্দ করে।
এ-সংক্রান্ত একটি পোস্ট র্যাব-৮ বরিশালের ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হলেও তা বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না।
সজিব সরদারের মা নাসরিন জাহান বলেন, র্যাব যখন আমার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় তখন আমরা ভেবেছি ঈদের আগের একটি মারামারির ঘটনায় হয়তো আটক করতে পারে। র্যাব বলে গেছে মঙ্গলবার সকাল ৮টায় আগৈলঝাড়া থানায় যোগাযোগ করতে। কিন্তু সারা দিন অপেক্ষা করার পর সন্ধ্যায় থানায় নিয়ে আসে। যখন সজিবকে থানায় নিয়ে আসা হয় তখন তার জ্ঞান ছিল না। আমার ছেলের কোনো দিন শ্বাসকষ্ট ছিল না। অথচ থানায় তাকে ইনহেলার দিয়ে শ্বাস নেয়াতে হয়েছে। দুই হাঁটু থেকে রক্ত ঝরছিল। বিভিন্ন স্থানের চামড়া তুলে ফেলেছে। কনুই দুটি ফুলে গেছে। আমার ছেলের শরীরের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে নির্যাতন চালায়নি র্যাব।
আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম ছরোয়ার বলেন, তার বিরুদ্ধে ৫/৬টি মামলা চলমান। তাকে আটক করতে গেলে কিছুটা ধস্তাধস্তি হয়ে আহত হতে পারেন। তবে থানায় তাকে কোনো ধরনের মারধর করা হয়নি।
এদিকে বুধবার (২ জুন) সন্ধ্যায় আসামি সজিব সরদারকে বরিশাল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক মো. মনিরুজ্জামান তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সজিবকে বহনকারী পুলিশের পিকআপটি বাধা দেন স্বজনরা। এ সময়ে তারা সড়কে শুয়ে পড়েন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লোকমান হোসেন বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে স্বজনরা ওই আসামিকে জেলহাজতে পাঠানোর সময় পুলিশি ভ্যান আটকে দিচ্ছিল খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সজিবকে থানায় নিয়ে আসার পর র্যাব কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।
বুধবার পরিবারের সংবাদ সম্মেলনের পর র্যাবের কাউকে মন্তব্য নেয়ার জন্য পাওয়া যায়নি।
