বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, 'আমরা অনেকভাবে যাচাই-বাছাই করলাম, এর (বিদ্যুৎ সংকট) মূল কারণ হলো ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণে বেশ কিছু জায়গায়, বিশেষ করে ইউরোপে তীব্রভাবে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।'
সোমবার তিনি সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বলেন।
নসরুল হামিদ বলেছেন, আরও একটা বড় বিষয় হলো ইউরোপে প্রচণ্ড দাবদাহ, এ কারণে সেখানে আরো এনার্জি দরকার। আমরা যে পরিমাণ এনার্জি ইমপোর্ট করতাম, অর্থাৎ আমরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ২ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি (ঘনফুট) গ্যাস ব্যবহার করতাম। ২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত আমরা ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি পেতাম। সেটা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি। কিছু ড্রিলিং করার কারণে কয়েকটি খনি থেকে আমরা ১৯ এমএমসিএফডি ও ১৫ এমএমসিএফডি গ্যাস পাচ্ছি, কিন্তু এটা খুবই সামান্য। বাকি প্রায় সাড়ে ৮০০ এমএমসিএফডি গ্যাস আমরা ইমপোর্ট করতাম। এরমধ্যে ৫০০ এমএমসিএফডি আমরা লংটার্ম কনট্রাক্টে ইমপোর্ট করি। যেটা কি না ব্র্যান্ড প্রাইস টাই-আপ করা হলো ওয়েল প্রাইসের সঙ্গে, যদি তেলের দাম বাড়ে তাহলে গ্যাসের দাম বাড়বে।
তিনি বলেন, কাতার ও ওমানের সঙ্গে আমাদের ১৫ বছরের চুক্তি করা আছে। যাদের কাছ থেকে আমরা বাকি ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ এমএমসিএফডি গ্যাস নিচ্ছি। যেটা আমরা স্পট মার্কেট থেকে নিতাম। এই স্পট মার্কেট গত বছরের প্রথম দিকে লংটার্ম থেকেও কম পয়সায় ছিল। যার কারণে আমরা এটাকে ব্যালেন্স করতাম।
দেশে উৎপাদিত গ্যাস, লংটার্ম এবং স্পট এই ৩টাকে ব্যালেন্স করে মূল্য নির্ধারণ করা হতো উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সরকার সে সময়ও ভর্তুকি দিতো। গ্যাসে এবং বিদ্যুতে শেখ হাসিনার সরকার সে সময়ও ভর্তুকি দিতো। কিন্তু তার পরিমাণ আর এখনকার পরিমাণে অনেক ব্যবধান হয়ে গেছে। কারণ এখনকার স্পট মার্কেটে গ্যাস প্রায় ৩৬ থেকে ৪০ ডলারের মধ্যে উঠানামা করছে। যার কারণে গত মাসের আগের মাস পর্যন্ত আমাদের স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস নেওয়া ছিল, এরপর আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।
নসরুল হামিদ বলেন, আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি অন্তত এই দামে স্পট মার্কেট থেকে আর কোনো গ্যাস কিনবো না। এই দামে কিনলে সরকারকে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে, সেখানে অসম্ভব একটা ফিগার চলে আসে। যে কারণে আমরা মনে করছি, আমাদের গ্যাসবেইজড যে পাওয়ার প্লান্টগুলো ছিল, সেখানে আমরা কিছু রেশনিং করব, এটা হলো বড় বিষয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আরেকটা বিষয় হলো, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রচণ্ডভাবে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আমরা তেলের পাওয়ার প্লান্টগুলোও বন্ধ করে দিচ্ছি। আমাদের যে প্রায় ১১ শ মেগাওয়াটের ডিজেল পাওয়ার প্লান্ট আছে, সেটাও আমরা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিচ্ছি। এতে আমাদের বিদ্যুতের কিছুটা ঘাটতি হবে। সেই ঘাটতির পরিমাণ হয়তো এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট হবে।
মঙ্গলবার থেকে এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব জায়গায় একসঙ্গে না, আমরা মূলত চেষ্টা করব পিক আওয়ারে ১ ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেওয়ার। আগামী এক সপ্তাহ আমরা এই পরিস্থিতিটা দেখব। যদি আগে থেকেই গ্রিডভিত্তিক, এলাকাভিত্তিক, জোনভিত্তিক গ্রাহকদের জানিয়ে দিতে পারি, সেটা আমাদের চেষ্টার মধ্যে থাকবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেমন আমরা এটা ঘোষণা করলাম, আজকে নারায়ণগঞ্জের এই এলাকাগুলোতে এতটা থেকে এতটা পর্যন্ত লোডশেডিং হবে, বিষয়টা এরকমভাবে হবে। এই প্র্যাকটিসটা আমরা ১ সপ্তাহ করব। এতে যদি দেখি ১ ঘণ্টা আমাদের জন্য যথেষ্ট, তাহলে আমরা সেভাবে রাখব। আর যদি দেখি, ১ ঘণ্টা পর্যাপ্ত না, তাহলে আরও ১ ঘণ্টা অর্থাৎ ২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে যাব।
তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি বিভিন্ন খাতে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি কীভাবে সাশ্রয়ী করা যায়। এটা শুধু বাংলাদেশের বিষয় না, আপনারা যদি প্রতিনিয়ত বিদেশি সংবাদ দেখেন, ইউরোপের প্রায় প্রত্যেকটা দেশ জ্বালানি সাশ্রয় করার জন্য বিভিন্নরকম ব্যবস্থা নিয়েছে। কিছু দেশ রেশনিংয়ে গেছে। কিছু কিছু দেশ প্রচণ্ডভাবে নিজেদের দাম অ্যাডজাস্টমেন্টে গেছে। এরকম বিভিন্নভাবে তারা মেজারমেন্টে গেছে। এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশ এই পরিস্থিতিতে গেছে।
তিনি বলেন, এই বিষয়টা মনে রেখে আমরা যদি নিজেরা একটু সাশ্রয়ী হই এবং বিশেষ করে আমাদের যানবাহনের ক্ষেত্রে যদি একটু কম ব্যবহার করি, তেল ইমপোর্ট কিছুটা কমবে। আমাদের ফরেন কারেন্সির ওপর চাপ কিছুটা কমবে। আমরা যদি ট্রান্সপোর্টগুলো খুব হিসেব করে খরচ করি, আমাদের সরকারি মিটিং যতগুলো হয়, যেসব আমাদের মন্ত্রণালয়ে হয় বা অন্য অফিসে গিয়ে হয়, সেগুলো যদি আমরা অনলাইনে করে ফেলি, ইতোমধ্যে আমরা অভ্যস্থ, গত ২ বছর তো অনলাইনে করেছি। এতে আমাদের ট্রান্সপোর্টে অনেকখানি জ্বালানি সাশ্রয় হবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে আমরা যে পরিমাণ ডিজেল ইমপোর্ট করি, তার ১০ শতাংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুতে। আর বাকি ৯০ শতাংশ ডিজেল ব্যবহার হয় ট্রান্সপোর্ট সেক্টর এবং অন্যান্য খাতে। এ বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। অন্যান্য খাতের থেকে যদি আমরা বিদ্যুৎ ১০ শতাংশ বন্ধ করে দিই এবং সেখান থেকে যদি আমরা ১০ শতাংশ সেইফ করতে পরি, তাহলে এই ২০ শতাংশ সেইফে যে পরিমাণ অর্থ আমরা সেভ করতে পারব, যে পরিমাণ ফরেন কারেন্সি সেভ করতে পারব, এটা একটা বিরাট বড় বিষয় হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুতরাং আমি মনে করি যে, আপনারা সবাই আমাদের সঙ্গে যথেষ্ট পজিটিভি ওয়েতে থাকবেন। এটা খুবই সাময়িক ব্যাপার, আমি মনে করি না এটা খুব দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের এই বিষয়টা অনুধাবন করতে হবে যে, বিশ্বের সব দেশই কিন্তু কোনো না কোনোভাবে এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, বিশেষ করে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ খাতে।
