প্রকৃতি সংরক্ষণে উদাসীনতা আত্মঘাতী

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২, ১০:৩০ পিএম

প্রতি বছর পৃথিবীতে ‘বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস’ পালিত হয়। দিবসটি আসে, আর বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে যথারীতি এ বিষয়ে নানা সভা-সেমিনার আয়োজন করে। কিন্তু এই দিবস পালনের মধ্যেই কেন জানি সবকিছু সীমাবদ্ধ থেকে যায়! অথচ, বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত গত এক দশক আগে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দূষণ বৃদ্ধি তথা প্রকৃতি-পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো বিষয়গুলো কী পর্যায়ে ছিল আর বর্তমানে সেসব কী অবস্থায় আছে।

করোনাকাল আমাদের আরও ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে এবং অতি সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াও আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন কতটা সত্য। এসব কিছুই এই বার্তা দিচ্ছে যে, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, বন্ধুত্ব করেই পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহে টিকে থাকতে হবে।

প্রকৃতিপ্রেমিক বৃক্ষসখা দ্বিজেন শর্মার মতে, ‘প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংগ্রাম তখন থেকে শুরু হয়েছে, যখন মানুষ আগুন আবিষ্কার করেছে। মানুষ এতটা শক্তি অর্জন করেছে যে, ইচ্ছে করলে মুহূর্তেই পৃথিবীটা ধ্বংস করে দিতে পারে; যদিও তারা আরেকটা পৃথিবী তৈরি করতে সক্ষম নয়।’ আমাদের পৃথিবী একটাই। পৃথিবী নামক এই ছোট গ্রহের মধ্যেই প্রায় আটশ কোটি মানুষের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও বেঁচে থাকা। প্রকৃতি ও পরিবেশ ভালো থাকার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের টিকে থাকা। আমাদের নিজেদের স্বার্থে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে, প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে।

আমাদের দেশের প্রকৃতি বৈচিত্র্যময় এবং অনেক সম্পদে ভরপুর। নদ-নদী, খাল-বিল, পাহাড়-বন, হাওর-বাঁওড়, মাটি আর বায়ু মিলিয়ে এক অপূর্ব প্রকৃতির সমারোহ। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। একসময় এদেশে সাতশ টিরও বেশি নদ-নদী ছিল। সত্যি বলতে, একবিংশ শতাব্দীতে এসে এদেশে এখন ২৩০টির বেশি নদ-নদী খুঁজে পাওয়া যায় না! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদ-নদী বিলীন হয়ে যাচ্ছে! এর দায় আমরা কোনোভাবে এড়াতে পারি না! দেশের বেশিরভাগ নদ-নদী দখল, দূষণ আর নাব্য সংকটে ভুগছে।

নদীর মতো প্রকৃতির সব উপাদানই মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে জড়িত। প্রচন্ড রোদের মধ্যে আমরা একটু শীতল পরশ পাওয়ার জন্য গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিই। বৃক্ষ না থাকলে পানি যেমন সুপেয় হবে না তেমনি বায়ু নির্মলও হবে না। বিপরীতভাবে বায়ুতে বৃদ্ধি পাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড। ঘূর্ণিঝড়, দুর্যোগে গাছ আমাদের আগলে রাখে। বৃক্ষ আমাদের শিক্ষা দেয় নমনীয় হতে, ভালোবাসতে, নিয়ম মানতে, বিশ্বাসে দৃঢ় থাকতে। ইট-পাথর আর চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকলেও একটু সময় পেলেই আমরা ছুটে যাই প্রকৃতির কাছে, বনের কাছে, পাহাড়ের কাছে, নদীর কাছে। বুক ভরে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিই। প্রকৃতি আমাদের মায়ের মতো। যে মা আমাদের আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে, আহার দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের প্রকৃতি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের প্রকৃতির থেকে একটু ভিন্ন। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এদেশের জাতীয় সংগীতে প্রকৃতির বর্ণনা ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি দিজেন্দ্রলাল রায় বলেছেন, ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা,/এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,/ ও সে সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।’

প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশের ফল যে ভয়াবহ তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ভুগতে থাকা উপকূলীয় জেলাসমূহের সৌন্দর্য দিনদিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণ-প্রকৃতির অনেক আধার নষ্ট হয়ে গেছে। জলাভূমি, খাল-বিল ভরাট করা হয়েছে এবং হচ্ছে। জলবায়ুর শিকার হওয়া উপকূলীয় জেলাসমূহে নজর দেওয়া দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় জেলাসমূহ যদি বছরের পর বছর উপর্যুপরি দুর্যোগের কবলে পড়ে তাহলে এ জনপদ টিকে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না! উপকূলের প্রাণটাই যেন দিনে দিনে মরে যাচ্ছে!

যে কোনো উন্নয়নে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সবসময় বিপরীতভাবে চলছে! প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা করে উন্নয়ন না করলে তথা ভারসাম্য বজায় না থাকলে উন্নয়ন যে টেকসই হয় না তা সর্বদা প্রমাণিত। বন-জলাশয়-প্রকৃতি ধ্বংস কোনো উন্নয়ন কাম্য নয়। এ পৃথিবীটা শুধু বর্তমানের জন্য নয়, প্রতিটি শিশুর টেকসই ভবিষ্যৎ, সুন্দর জীবন ও নির্মল বায়ুর জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণ করতেই হবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘পরিবেশ সুরক্ষা এজন্সি’ (ইপিআই) থেকে প্রকাশিত বিশ^ পরিবেশ সুরক্ষা সূচকে ১৮৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭। পরিবেশগত দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যগত অবস্থা যে দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গড় আয়ু বাড়লেও তা রোগগ্রস্ত আয়ু। জীবন উপভোগ করার আগেই অল্প বয়স থেকে মানুষ রোগশোকে আক্রান্ত হচ্ছে। দুঃখের বিষয়, প্রকৃতি বিনাশের কারণে জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক হুমকি তৈরি হচ্ছে। অনেক উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। আবার অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা ও বন উজাড় করা হচ্ছে। পরিবেশের দূষণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃতির কান্না আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। অথচ প্রকৃতি রক্ষায় আমরা এগিয়ে আসছি না। প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিতে জানে! এ ধরনের প্রকৃতি বিনাশী অসচেতন কাজকর্ম রোধ করতে হবে।

খেয়াল করা দরকার বাংলাদেশ এখন অন্যতম দূষিত বায়ুর দেশ। বায়ুতে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। প্রতি বছর আমাদের কৃষিজমি কমছে। বিদেশি উদ্ভিদ দেশি উদ্ভিদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। দুঃখের বিষয়, দেশি গাছের কদর করতে আমরা ভুলে যাচ্ছি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাড়ছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে প্রকৃতি বিনাশ করা হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ রোধে তথা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে ভূপৃষ্ঠের সামগ্রিক বাস্তুসংস্থান রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। তাই যার যার অবস্থান থেকে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসার বিকল্প নেই। প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে। কেননা লোভ-লালসা আর অর্থের লোভে বৃক্ষ, পাহাড়, কৃষিজমি, বন, কাটতে কাটতে আর মাটি, পানির দূষণ ত্বরান্বিত হতে হতে এমন এক সময় আসবে যখন থাকবে শুধু টাকা, যে টাকা দিয়ে তখন আর নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ফেরত পাওয়া যাবে না।

লেখক : শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত