শান্ত জলের বুকে লাল শাপলার গালিচা আর কচুরিপানার রক্তাভ নীল ফুলের মধ্যে ঝাঁক বেঁধে ডানা মেলছে অতিথি পাখির দল। পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত পরিবেশ। বাহারি রঙের এসব অতিথি পাখির খুনসুটি আর ছোটাছুটি যে কারও মনকে উদ্বেলিত করে তোলে। শীত মৌসুমের প্রকৃতিতে অপরূপ অতিথি পাখির ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলার দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন জলরঙে আঁকা ছবি। প্রতি শীতে দূর-দূরান্ত থেকে শীতের পাখিরা আসে আমাদের দেশে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ পাখি দেখতে ভিড় করে বিভিন্ন জলাশয়ে। পাখিদের কলকাকলি প্রকৃতির শোভা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। গাছের সবুজ, জলের নীল আর পাখিদের নানা রং মনে যে বর্ণিল আবেশ তৈরি করে তার রেশ রয়ে যায় অনেক দিন। শীতপ্রধান দেশ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে আসা শুরু করেছে। এরা নিরাপদে থাকার জন্য এলেও আমরা তাদের জীবন দুর্বিষহ করে থাকি। আইন আছে, নিষেধাজ্ঞাও আছে। স্থানীয় প্রশাসনও সচেতনতামূলক কথা বলে থাকেন। তারপরেও আমরা পাখি হত্যা ও পাখিদের বিরক্ত করে থাকি।
আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে বাংলাদেশে পাখির সংখ্যা প্রায় ৬৫০ প্রজাতির। এর মধ্যে ৩৬০ প্রজাতি আবাসিক। বাকি ৩০০ প্রজাতি পরিযায়ী ও অন্যান্য। সব পরিযায়ী শীতের সময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির মধ্যে ২৯০টি শীত মৌসুমে আসে ও ১০টি প্রজাতি থেকে যায়। আন্তর্জাতিকভাবে জলচর পাখির জন্য স্বীকৃত ২৮টি জায়গা বাংলাদেশের সীমানায় রয়েছে। এগুলো হলো : বরিশাল বিভাগের চর বারি, চর বাঙ্গের, কালকিনির চর, চর শাহজালাল, টাগরার চর, ডবা চর, গাগোরিয়া চর, চর গাজীপুর, কালুপুর চর, চর মনপুরা, পাতার চর ও উড়ির চর; চট্টগ্রাম বিভাগের চর বারী, বাটা চর, গাউসিয়ার চর, মৌলভীর চর, মুহুরী ড্যাম, মুক্তারিয়া চর, ঢাল চর, নিঝুম দ্বীপ, পতেঙ্গা সৈকত, সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ; সিলেট বিভাগের আইলার বিল, ছাতিধরা বিল, হাইল হাওর বাইক্কা, হাকালুকি হাওর, পানা বিল, রোয়া বিল, শনির বিল ও টাঙ্গুয়ার হাওর। শীত এলেই এসব জলাশয়সহ বিভিন্ন হাওর, বাঁওড়, বিল ও পুকুরের পাড়ে চোখে পড়ে নানান রং-বেরঙের নাম জানা, অজানা পাখি। এদের আমরা অতিখি পাখি বলে থাকি। অখচ ক্ষুদ্র আনন্দের বেআইনি শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয় অতিথি পাখিগুলোর! এই অতিথি পাখিগুলো আমাদের বন্ধু, আমাদের প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ। তাই এ পাখিগুলোকে অচেনা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমাদের বন্ধুসুলভ আচরণ করা দরকার। এই পাখিগুলো রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
অতিথি পাখির বড় আশ্রয়স্থল হচ্ছে চট্টগ্রামের সোনাদিয়া দ্বীপসহ সেখানকার চরাঞ্চল, ভোলার বিভিন্ন চরাঞ্চল আর বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলাঞ্চল। আর সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ আর মৌলবীবাজারের বিভিন্ন জলাশয় আর হাওর-বাঁওড় হচ্ছে অতিথি পাখিদের আর একটি বড় আশ্রয়স্থল। বাসস্থান সংকট, বিষটোপ ব্যবহার করে খাদ্যসংকট ও জীবন বিপন্ন করা, শিকার, পাচার ইত্যাদি কারণে আশঙ্কাজনকহারে আমাদের দেশে শীতে পাখি আসার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ক্যামেরার ক্লিক বা নীরবতা ভঙ্গ করলেও পাখিরা বিরক্তবোধ করে এবং অন্যত্র চলে যায়। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাইক্যার বিল বা অন্যত্র অতিথি পাখি দেখতে গেলেই পাখির খুব কাছে যেতে চাই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যামেরার ক্লিক দিই। একই কারণে ভারতের পাখির অভয়াশ্রম গজলডোবাসহ পশ্চিমবঙ্গের অনেক পাখির আবাসস্থলে পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ থেকে আমাদের সতর্ক হতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ক্যামেরা বা শব্দযন্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজন ছাড়া একেবারেই কমিয়ে আনতে হবে।
শিকারি পাখি, আবাসস্থল ধ্বংস প্রভৃতিই পরিযায়ী পাখির প্রধান শত্রু। আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, খাবারের অনুপযোগী কিংবা মানুষের বসতি হয়েছে। একশ্রেণির লোভী, ব্যাধের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য দুর্লভ প্রজাতির অতিথি পাখি। জালের ফাঁদ পেতে, বিষটোপ এবং ছররা গুলি দিয়ে নির্বিচারে ও নির্মমভাবে এসব অতিথি পাখি শিকার চলছে প্রতিনিয়ত। কেউ শখের বশে আবার কেউ বাজারে বিক্রির জন্য অতিথি পাখিদের দিকে বন্দুকের নল উঁচিয়ে নিষ্ঠুর হাতে ট্রিগার টিপে এবং ফাঁদ পেতে অতিথি পাখিদের জীবন হরণ করে চলেছে। অতিথি পাখিদের বিচরণভূমি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বন-জঙ্গল কেটে উজাড় করে ফেলায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। আবার ফসলি জমিতে কৃত্রিম সার এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে অতিথি পাখিরা বিষে আক্রান্ত কীটপতঙ্গ খেয়ে মারা যাচ্ছে। উপকূলে চিংড়ি চাষের ফলেও অতিথি পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
অতিথি পাখি নিধন এবং বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ জেনেও আইনের ফাঁক গলিয়ে এক শ্রেণির পেশাদার এবং শৌখিন শিকারি কাজগুলো করে চলেছে। বেআইনিভাবেই শিকার করা হয় অতিথি পাখি। যা দ-নীয় ফৌজদারি অপরাধ। ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ও ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে দ-ের বিধান রয়েছে। অতিথি পাখি নিধন বন্ধে আইন থাকলেও মানছেন না কেউ। প্রতি বছর শীত এলেও চলে অতিথি পাখি নিধন। এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মে পশু ও প্রাণীহত্যা চরম পাপের কাজ বলে বিবেচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চড়ুই বা তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণীকে অযথা হত্যা করে, তাকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সে স¤পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।’(নাসায়ি, হাদিস : ৪৩৪৯)।
আইন ও ধর্মীয় বিধান থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে খুব কম। তাই অতিথি পাখি শিকার রোধে প্রচলিত আইন জোরদার করা জরুরি। সেই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকেও তৎপর থাকতে হবে। পাখি শিকার বন্ধের জন্য পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। যে এলাকায় অতিথি পাখির পদচারণা ঘটে সে এলাকায় বিভিন্ন সচেতনানূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। পাখি শিকারিদের নামের তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে। শুধু প্রশাসনের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। সাধারণ জনগণের সচেতনতাই এ উদ্যোগ সফলতার আলো দেখতে পারে। তাই, এ উদ্যোগকে কার্যকর ও সফল করতে সরকার-পরিবেশবাদী সংগঠন/বুদ্ধিজীবী-জনগণ এই ত্রিমুখী আন্তরিকতা দরকার। আমরা পাখির নাচ-গান আর ওড়াউড়ি দেখব এবং উপভোগ করব। তবে সীমার মধ্যে, সতর্ক থেকে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক